চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৫ কোটি টাকার জমি বেদখল
jugantor
সুপ্রিমকোর্টের রায়ও উপেক্ষিত
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৫ কোটি টাকার জমি বেদখল
প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন ভুক্তভোগী ১৯ ক্রেতা

  রাজশাহী ব্যুরো  

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের নিমতলায় আনুমানিক ২৫ কোটি টাকা মূল্যের এক একর ৬৫ শতক জমির দখল পাচ্ছেন না ১৯ জন ক্রেতা। তারা জীবনের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে ১৯৯৭ ও ৯৮ সালে বাসাবাড়ি করার জন্য প্লট আকারের এ জমি কিনেছিলেন। জমিটি নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে আদালতে মামলা চলার পর ক্রেতারা ২০২০ সালের ২ জানুয়ারি সুপ্রিমকোর্ট থেকে চূড়ান্ত রায় পান। ততদিনে সংঘবদ্ধ একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন ব্যক্তি প্লটগুলো দখল করে নেন।

প্রশাসনের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেও অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে পারেননি তারা। প্লটগুলো খারিজ করে ক্রেতারাই এখনো ভূমিকর পরিশোধ করে চলেছেন। অথচ জমি তাদের দখলে নেই। ভুক্তভোগী ক্রেতাদের মধ্যে কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবারও আছেন।

সুপ্রিমকোর্টের রায় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জমিটি ছিল হামিদউল্লাহ ওয়াকফ্ এস্টেটের। এর মোতাওয়াল্লি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্যপ্রয়াত অধ্যাপক ড. গাউসুজ্জামান বাংলাদেশ ওয়াকফ্ প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে সর্বোচ্চ মূল্যে ১৯ ব্যক্তির কাছে প্লট আকারে বিক্রি করেন। ক্রেতারা যথারীতি প্লটগুলো কিনে নিজ নিজ নামে খারিজ করে নেন। ১৯৯৮ সালে মোতাওয়াল্লি ড. গাউসুজ্জামানের ভাই কুতুবুল আলম বাদী হয়ে একটি মামলা করেন নিম্ন আদালতে। এতে রায় ১৯ জন ক্রেতা ও মোতাওয়াল্লির বিপক্ষে যায়। ২০০২ সালে মোতাওয়াল্লি ও ক্রেতারা নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন। ২০০৯ সালের ২৬ মে হাইকোর্ট বেঞ্চ নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে ক্রেতাদের পক্ষে রায় দেন। বাদী হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে সিভিল আপিল দায়ের করেন। ২০২০ সালের ২ জানুয়ারি সুপ্রিমকোর্ট হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে বাদীর আপিল খারিজ করে দেন। বাদী কুতুবুল আলম কয়েক বছর আগে ও মোতাওয়াল্লি ড. গাউসুজ্জামান সম্প্রতি মারা গেছেন। গাউসুজ্জামানের মৃত্যুর পর তার ভাই আমিনুজ্জামান মোতাওয়াল্লি হয়েছেন।

জানা গেছে, জমির মামলা চলাকালীন গাউসুজ্জামান শহরের ফকিরপাড়া মহল্লার বেনু শেখ নামে এক ব্যক্তিকে সেখানে নাইটগার্ড হিসেবে রাখেন নির্মাণসামগ্রী পাহারার জন্য। বেনু শেখ মারা গেলে তার ছেলে হিমেল বিশ্বাসকে মানবিক কারণে পাহারাদার রাখা হয়। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে হিমেল বিশ্বাস যুবদল নেতা পরিচয়ে প্লটগুলো অবৈধভাবে বিভিন্ন ব্যক্তিকে দিয়ে দখল করান। পরে সেখানে অস্থায়ী টিনের ছাউনি থেকে সেমিপাকা বাড়ি নির্মাণ করিয়ে হিমেল ভাড়া দেয়। ক্রেতারা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অভিযোগ দিলেও রাজনৈতিক প্রভাবে হিমেলসহ কাউকেই আর উচ্ছেদ করা যায়নি। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিরোধের জেরে ২০১৯ সালের শেষের দিকে হিমেল বিশ্বাস প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন। এরপর তার বোন কবিতা ও বোনজামাই পলাশসহ অনেকে বাড়িগুলোর ভাড়া তুলে ভোগ করছেন।

জমির ক্রেতাদের মধ্যে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল ইসলাম তার স্ত্রী আজিমা ইসলামের নামে এখানে একটি প্লট ক্রয় করেছিলেন। প্লট নং-৪০৭। কিন্তু জীবদ্দশাতে তারা কষ্টার্জিত অর্থে কেনা প্লটে যেতে পারেননি। পৌরসভা থেকে নকশা করলেও বাড়ি করতে পারেননি। বর্তমানে এই মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আমিনুল ইসলাম জনিসহ দুই ভাই বাবার রেখে যাওয়া জায়গাটুকু উদ্ধার করে সেখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই গড়তে চান।

ভুক্তভোগী জমির অপর ক্রেতারা হলেন- ড. শফিকুল ইসলাম, ফিরোজ উল আলম, আব্দুল মোতালিব, অধ্যাপক মহাসিন আলী, আব্দুল মতিন, জালাল উদ্দিন ওরফে সোনা প্রফেসর, মোহাম্মদ বাচ্চু, আফতাব উদ্দিন আনসারী, অধ্যাপক আব্দুস সালাম, অধ্যাপক আব্দুল ওয়াদুদ, তরিকুল ইসলাম, আব্দুর রহমান, ইমরান আলী, আব্দুল বারী, আমিনুল এসপি, ইলিয়াশ উদ্দিন জহুরুল প্রফেসর ও মোজাম্মেল হক।

জানা গেছে, সুপ্রিমকোর্টের রায়সহ ২৫ আগস্ট ক্রেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসকের দপ্তরে আবেদন করেছেন। সেখানে ২২ অবৈধ দখলদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তারা। এদের মধ্যে রয়েছে- শহরের ফকিরপাড়ার জামাল শেখ, আবু হানিফ, মুকুল, আবদুল ওহাব, বসির আহমেদ, আমীর হোসেন, তৌফিকুর, মনিরুল ইসলাম ও আনোয়ার হোসেন। সদর থানা পুলিশ ও জেলা পুলিশ সুপারের কাছেও আবেদন জমা দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি মোজাফফ্র হোসেন শুক্রবার সকালে যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে সুপ্রিমকোর্টের রায় মোতাবেক জেলা প্রশাসন থেকে পুলিশকে চিঠি দিলে পুলিশ অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে পদক্ষেপ নিতে পারবে।

সুপ্রিমকোর্টের রায়ও উপেক্ষিত

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৫ কোটি টাকার জমি বেদখল

প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন ভুক্তভোগী ১৯ ক্রেতা
 রাজশাহী ব্যুরো 
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের নিমতলায় আনুমানিক ২৫ কোটি টাকা মূল্যের এক একর ৬৫ শতক জমির দখল পাচ্ছেন না ১৯ জন ক্রেতা। তারা জীবনের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে ১৯৯৭ ও ৯৮ সালে বাসাবাড়ি করার জন্য প্লট আকারের এ জমি কিনেছিলেন। জমিটি নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে আদালতে মামলা চলার পর ক্রেতারা ২০২০ সালের ২ জানুয়ারি সুপ্রিমকোর্ট থেকে চূড়ান্ত রায় পান। ততদিনে সংঘবদ্ধ একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন ব্যক্তি প্লটগুলো দখল করে নেন।

প্রশাসনের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেও অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে পারেননি তারা। প্লটগুলো খারিজ করে ক্রেতারাই এখনো ভূমিকর পরিশোধ করে চলেছেন। অথচ জমি তাদের দখলে নেই। ভুক্তভোগী ক্রেতাদের মধ্যে কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবারও আছেন।

সুপ্রিমকোর্টের রায় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জমিটি ছিল হামিদউল্লাহ ওয়াকফ্ এস্টেটের। এর মোতাওয়াল্লি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্যপ্রয়াত অধ্যাপক ড. গাউসুজ্জামান বাংলাদেশ ওয়াকফ্ প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে সর্বোচ্চ মূল্যে ১৯ ব্যক্তির কাছে প্লট আকারে বিক্রি করেন। ক্রেতারা যথারীতি প্লটগুলো কিনে নিজ নিজ নামে খারিজ করে নেন। ১৯৯৮ সালে মোতাওয়াল্লি ড. গাউসুজ্জামানের ভাই কুতুবুল আলম বাদী হয়ে একটি মামলা করেন নিম্ন আদালতে। এতে রায় ১৯ জন ক্রেতা ও মোতাওয়াল্লির বিপক্ষে যায়। ২০০২ সালে মোতাওয়াল্লি ও ক্রেতারা নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন। ২০০৯ সালের ২৬ মে হাইকোর্ট বেঞ্চ নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে ক্রেতাদের পক্ষে রায় দেন। বাদী হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে সিভিল আপিল দায়ের করেন। ২০২০ সালের ২ জানুয়ারি সুপ্রিমকোর্ট হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে বাদীর আপিল খারিজ করে দেন। বাদী কুতুবুল আলম কয়েক বছর আগে ও মোতাওয়াল্লি ড. গাউসুজ্জামান সম্প্রতি মারা গেছেন। গাউসুজ্জামানের মৃত্যুর পর তার ভাই আমিনুজ্জামান মোতাওয়াল্লি হয়েছেন।

জানা গেছে, জমির মামলা চলাকালীন গাউসুজ্জামান শহরের ফকিরপাড়া মহল্লার বেনু শেখ নামে এক ব্যক্তিকে সেখানে নাইটগার্ড হিসেবে রাখেন নির্মাণসামগ্রী পাহারার জন্য। বেনু শেখ মারা গেলে তার ছেলে হিমেল বিশ্বাসকে মানবিক কারণে পাহারাদার রাখা হয়। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে হিমেল বিশ্বাস যুবদল নেতা পরিচয়ে প্লটগুলো অবৈধভাবে বিভিন্ন ব্যক্তিকে দিয়ে দখল করান। পরে সেখানে অস্থায়ী টিনের ছাউনি থেকে সেমিপাকা বাড়ি নির্মাণ করিয়ে হিমেল ভাড়া দেয়। ক্রেতারা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অভিযোগ দিলেও রাজনৈতিক প্রভাবে হিমেলসহ কাউকেই আর উচ্ছেদ করা যায়নি। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিরোধের জেরে ২০১৯ সালের শেষের দিকে হিমেল বিশ্বাস প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন। এরপর তার বোন কবিতা ও বোনজামাই পলাশসহ অনেকে বাড়িগুলোর ভাড়া তুলে ভোগ করছেন।

জমির ক্রেতাদের মধ্যে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল ইসলাম তার স্ত্রী আজিমা ইসলামের নামে এখানে একটি প্লট ক্রয় করেছিলেন। প্লট নং-৪০৭। কিন্তু জীবদ্দশাতে তারা কষ্টার্জিত অর্থে কেনা প্লটে যেতে পারেননি। পৌরসভা থেকে নকশা করলেও বাড়ি করতে পারেননি। বর্তমানে এই মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আমিনুল ইসলাম জনিসহ দুই ভাই বাবার রেখে যাওয়া জায়গাটুকু উদ্ধার করে সেখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই গড়তে চান।

ভুক্তভোগী জমির অপর ক্রেতারা হলেন- ড. শফিকুল ইসলাম, ফিরোজ উল আলম, আব্দুল মোতালিব, অধ্যাপক মহাসিন আলী, আব্দুল মতিন, জালাল উদ্দিন ওরফে সোনা প্রফেসর, মোহাম্মদ বাচ্চু, আফতাব উদ্দিন আনসারী, অধ্যাপক আব্দুস সালাম, অধ্যাপক আব্দুল ওয়াদুদ, তরিকুল ইসলাম, আব্দুর রহমান, ইমরান আলী, আব্দুল বারী, আমিনুল এসপি, ইলিয়াশ উদ্দিন জহুরুল প্রফেসর ও মোজাম্মেল হক।

জানা গেছে, সুপ্রিমকোর্টের রায়সহ ২৫ আগস্ট ক্রেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসকের দপ্তরে আবেদন করেছেন। সেখানে ২২ অবৈধ দখলদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তারা। এদের মধ্যে রয়েছে- শহরের ফকিরপাড়ার জামাল শেখ, আবু হানিফ, মুকুল, আবদুল ওহাব, বসির আহমেদ, আমীর হোসেন, তৌফিকুর, মনিরুল ইসলাম ও আনোয়ার হোসেন। সদর থানা পুলিশ ও জেলা পুলিশ সুপারের কাছেও আবেদন জমা দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি মোজাফফ্র হোসেন শুক্রবার সকালে যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে সুপ্রিমকোর্টের রায় মোতাবেক জেলা প্রশাসন থেকে পুলিশকে চিঠি দিলে পুলিশ অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে পদক্ষেপ নিতে পারবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন