রাজশাহীতে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ
jugantor
ভরা মৌসুমে বিপাকে কৃষক
রাজশাহীতে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ

  আনু মোস্তফা, রাজশাহী  

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভরা আমন মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বেড়ে গেছে ইউরিয়া সারের দাম। সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে ৫০ থেকে ১২০ টাকা করে বেড়েছে প্রতি বস্তায়। বিভিন্ন এলাকার কৃষকের অভিযোগ, ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে ইউরিয়ার দাম বাড়িয়েছে। যদিও চার জেলার কৃষি কর্মকর্তারা দাবি করছেন ইউরিয়া সারের দাম বাড়ার অভিযোগ জানা নেই।

রাজশাহী অঞ্চলের জেলাগুলোয় সারের কোনো সংকট নেই বলেও দাবি তাদের। সরকার কৃষকের সুবিধার্থে আমদানি ও বিতরণ পর্যায়ে ৫০ কেজির ইউরিয়ার বস্তায় ৪৫০ টাকা করে ভতুর্কি দিয়ে থাকে। ডিলাররা সরকারের কাছ থেকে ৭০০ টাকা বস্তা কেনেন। জেলা ও অঞ্চল ভেদে প্রতি বস্তা ইউরিয়া ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা বিক্রি বাধ্যতামূলক।

জানা যায়, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলা মিলে রাজশাহী কৃষি অঞ্চল। এ চার জেলায় আমন ও বোরোর আবাদ বেশি বলে ইউরিয়া সারের চাহিদাও বেশি। এ কারণে ভরা মৌসুমে ইউরিয়ার দাম বাড়িয়ে মুনাফা লুটে ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও তানোরের একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডিলাররা সার তুলে খুচরা ব্যবসায়ীদের হাতে দিয়ে দিচ্ছে। আর খুচরা ব্যবসায়ীরা বস্তাপ্রতি ইউরিয়া সারে ৮০ থেকে ১৫০ টাকা করে বেশি নিচ্ছে। তানোরের ইলামদহীর কৃষক শরিফুল ইসলাম এ অভিযোগ করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে আমন আবাদ হয়েছে ৮০ হাজার ৭৮৯ হেক্টর জমিতে। চলতি সেপ্টেম্বরে রাজশাহীতে ইউরিয়ার চাহিদা ৭ হাজার ৬৮৬ টন। এর বিপরীতে বরাদ্দ এসেছে ৪ হাজার ২৭৬ টন। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক কেজেএম আব্দুল আউয়াল যুগান্তরকে বলেন, রাজশাহীতে বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলারের সংখ্যা ৮৯ জন। খুচরা সার ব্যবসায়ীও আছে। রাজশাহীতে চলতি মাসে সারের কোনো ঘাটতি নেই। দাম বেশি নেওয়ার কোনো অভিযোগও তিনি পাননি।

রাজশাহীর গোদাগাড়ীর দিগরাম গ্রামের কৃষক মহিউদ্দিন বলেন, এখন আমনের ভরা মৌসুম। সারের চাহিদা বেশি। ৮০০ টাকার ইউরিয়ার বস্তা এখন ৮৫০ থেকে ৯২০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এলাকার ডিলারদের দোকানে গেলে তারা বলছেন, সার নেই। খুচরা দোকানে যাও। খুচরা সার ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছ থেকে বস্তায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে বেশি নিচ্ছে। কৃষি বিভাগের ব্লক সুপারভাইজারদের কাছে অভিযোগ দিলেও তারা কর্ণপাত করছেন না।

এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এবার ৫৩ হাজার ২৮৭ হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে। চলতি সেপ্টেম্বরে ইউরিয়া সারের ৪ হাজার ২৮৩ টন চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ এসেছে ৩ হাজার ২৩৭ টন। এ জেলায় সার ডিলারের সংখ্যা ৫৮ জন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সার ডিলার সমিতির সভাপতি আকবর হোসেন যুগান্তরকে বলেন, এ জেলায় ইউরিয়া সারের বেশি দাম নেওয়ার কোনো অভিযোগ নেই। ডিলারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তারা যেন নির্ধারিত সরকারি দামে সার বিক্রি করেন। কৃষি বিভাগের উপপরিচালক কৃষিবিদ নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ইউরিয়ার দাম বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে কোথাও কোথাও নন-ইউরিয়া সারের দাম বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। তারা সেটা খতিয়ে দেখছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার নেজারমপুর গ্রামের কৃষক গোলাম মোস্তফার অভিযোগ, ডিলাররা সার দিচ্ছে না। তবে খুচরা সার ব্যবসায়ীরা ইউরিয়ায় বস্তাপ্রতি ৫০ টাকা করে বেশি নিচ্ছেন। টিএসপিসহ অন্যান্য সারের গলাকাটা দাম নিচ্ছে নাচোল বাজারের কিছু খুচরা ও অবৈধ ফড়িয়া ব্যবসায়ী। অন্যদিকে নওগাঁ জেলায় সব ধরনের সারের সংকট যেমন আছে, তেমনই দামও বেশি নেওয়া হচ্ছে কৃষক পর্যায়ে। জানা যায়, নওগাঁ জেলায় চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। আমন মৌসুমে ইউরিয়ার চাহিদা ৩৩ হাজার টন। নওগাঁয় ডিলারের সংখ্যা ১২৭ জন। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এ জেলায় ইউরিয়ার পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। এরপরও নওগাঁ সদরের তিলকপুর ও পাহাড়পুর বাজারে গত এক সপ্তাহে প্রতি বস্তা ইউরিয়া বিক্রি হয়েছে ৮৬০ থেকে ৯২০ টাকা দরে। শিবপুর গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম ও সাইদুর রহমান বলেন, আমন আবাদের মৌসুম শুরুর পর থেকেই ইউরিয়ার দাম বাড়িয়েছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। সরকারি দাম ৮০০ টাকা বস্তা হলেও প্রতি বস্তায় আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত ৫০ থেকে ১২০ টাকা। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও কেন সারের বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে পাহাড়পুর বাজারের খুচরা সার ব্যবসায়ী আবু আক্কাস মণ্ডলের দাবি তারা ডিলারের কাছ থেকে ৮৬০ টাকা করে বস্তা কিনে আনছেন। এর বাইরে পরিবহণ খরচ আছে। এ কারণে তারা বেশি দামে সার বিক্রি করছেন। এই বিষয়ে নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক শামসুল ওয়াদুদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

নাটোর জেলার কোথাও কোথাও ইউরিয়ার বেশি দাম আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক রাকিবুল হাসান যুগান্তরকে জানান, তার জেলায় ৭২ হাজার হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে। আমন মৌসুমে ইউরিয়ার বরাদ্দ রয়েছে ৫ হাজার ৫৮ টন। বিতরণ হয়েছে ৪ হাজার ৫০৫ টন। মজুত রয়েছে ১ হাজার ৯৭৮ টন। উপপরিচালক বলেন, নাটোরের কোথাও বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ তার কাছে নেই।

ভরা মৌসুমে বিপাকে কৃষক

রাজশাহীতে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ

 আনু মোস্তফা, রাজশাহী 
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভরা আমন মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বেড়ে গেছে ইউরিয়া সারের দাম। সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে ৫০ থেকে ১২০ টাকা করে বেড়েছে প্রতি বস্তায়। বিভিন্ন এলাকার কৃষকের অভিযোগ, ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে ইউরিয়ার দাম বাড়িয়েছে। যদিও চার জেলার কৃষি কর্মকর্তারা দাবি করছেন ইউরিয়া সারের দাম বাড়ার অভিযোগ জানা নেই।

রাজশাহী অঞ্চলের জেলাগুলোয় সারের কোনো সংকট নেই বলেও দাবি তাদের। সরকার কৃষকের সুবিধার্থে আমদানি ও বিতরণ পর্যায়ে ৫০ কেজির ইউরিয়ার বস্তায় ৪৫০ টাকা করে ভতুর্কি দিয়ে থাকে। ডিলাররা সরকারের কাছ থেকে ৭০০ টাকা বস্তা কেনেন। জেলা ও অঞ্চল ভেদে প্রতি বস্তা ইউরিয়া ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা বিক্রি বাধ্যতামূলক।

জানা যায়, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলা মিলে রাজশাহী কৃষি অঞ্চল। এ চার জেলায় আমন ও বোরোর আবাদ বেশি বলে ইউরিয়া সারের চাহিদাও বেশি। এ কারণে ভরা মৌসুমে ইউরিয়ার দাম বাড়িয়ে মুনাফা লুটে ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও তানোরের একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডিলাররা সার তুলে খুচরা ব্যবসায়ীদের হাতে দিয়ে দিচ্ছে। আর খুচরা ব্যবসায়ীরা বস্তাপ্রতি ইউরিয়া সারে ৮০ থেকে ১৫০ টাকা করে বেশি নিচ্ছে। তানোরের ইলামদহীর কৃষক শরিফুল ইসলাম এ অভিযোগ করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে আমন আবাদ হয়েছে ৮০ হাজার ৭৮৯ হেক্টর জমিতে। চলতি সেপ্টেম্বরে রাজশাহীতে ইউরিয়ার চাহিদা ৭ হাজার ৬৮৬ টন। এর বিপরীতে বরাদ্দ এসেছে ৪ হাজার ২৭৬ টন। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক কেজেএম আব্দুল আউয়াল যুগান্তরকে বলেন, রাজশাহীতে বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলারের সংখ্যা ৮৯ জন। খুচরা সার ব্যবসায়ীও আছে। রাজশাহীতে চলতি মাসে সারের কোনো ঘাটতি নেই। দাম বেশি নেওয়ার কোনো অভিযোগও তিনি পাননি।

রাজশাহীর গোদাগাড়ীর দিগরাম গ্রামের কৃষক মহিউদ্দিন বলেন, এখন আমনের ভরা মৌসুম। সারের চাহিদা বেশি। ৮০০ টাকার ইউরিয়ার বস্তা এখন ৮৫০ থেকে ৯২০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এলাকার ডিলারদের দোকানে গেলে তারা বলছেন, সার নেই। খুচরা দোকানে যাও। খুচরা সার ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছ থেকে বস্তায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে বেশি নিচ্ছে। কৃষি বিভাগের ব্লক সুপারভাইজারদের কাছে অভিযোগ দিলেও তারা কর্ণপাত করছেন না।

এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এবার ৫৩ হাজার ২৮৭ হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে। চলতি সেপ্টেম্বরে ইউরিয়া সারের ৪ হাজার ২৮৩ টন চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ এসেছে ৩ হাজার ২৩৭ টন। এ জেলায় সার ডিলারের সংখ্যা ৫৮ জন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সার ডিলার সমিতির সভাপতি আকবর হোসেন যুগান্তরকে বলেন, এ জেলায় ইউরিয়া সারের বেশি দাম নেওয়ার কোনো অভিযোগ নেই। ডিলারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তারা যেন নির্ধারিত সরকারি দামে সার বিক্রি করেন। কৃষি বিভাগের উপপরিচালক কৃষিবিদ নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ইউরিয়ার দাম বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে কোথাও কোথাও নন-ইউরিয়া সারের দাম বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। তারা সেটা খতিয়ে দেখছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার নেজারমপুর গ্রামের কৃষক গোলাম মোস্তফার অভিযোগ, ডিলাররা সার দিচ্ছে না। তবে খুচরা সার ব্যবসায়ীরা ইউরিয়ায় বস্তাপ্রতি ৫০ টাকা করে বেশি নিচ্ছেন। টিএসপিসহ অন্যান্য সারের গলাকাটা দাম নিচ্ছে নাচোল বাজারের কিছু খুচরা ও অবৈধ ফড়িয়া ব্যবসায়ী। অন্যদিকে নওগাঁ জেলায় সব ধরনের সারের সংকট যেমন আছে, তেমনই দামও বেশি নেওয়া হচ্ছে কৃষক পর্যায়ে। জানা যায়, নওগাঁ জেলায় চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। আমন মৌসুমে ইউরিয়ার চাহিদা ৩৩ হাজার টন। নওগাঁয় ডিলারের সংখ্যা ১২৭ জন। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এ জেলায় ইউরিয়ার পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। এরপরও নওগাঁ সদরের তিলকপুর ও পাহাড়পুর বাজারে গত এক সপ্তাহে প্রতি বস্তা ইউরিয়া বিক্রি হয়েছে ৮৬০ থেকে ৯২০ টাকা দরে। শিবপুর গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম ও সাইদুর রহমান বলেন, আমন আবাদের মৌসুম শুরুর পর থেকেই ইউরিয়ার দাম বাড়িয়েছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। সরকারি দাম ৮০০ টাকা বস্তা হলেও প্রতি বস্তায় আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত ৫০ থেকে ১২০ টাকা। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও কেন সারের বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে পাহাড়পুর বাজারের খুচরা সার ব্যবসায়ী আবু আক্কাস মণ্ডলের দাবি তারা ডিলারের কাছ থেকে ৮৬০ টাকা করে বস্তা কিনে আনছেন। এর বাইরে পরিবহণ খরচ আছে। এ কারণে তারা বেশি দামে সার বিক্রি করছেন। এই বিষয়ে নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক শামসুল ওয়াদুদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

নাটোর জেলার কোথাও কোথাও ইউরিয়ার বেশি দাম আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক রাকিবুল হাসান যুগান্তরকে জানান, তার জেলায় ৭২ হাজার হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে। আমন মৌসুমে ইউরিয়ার বরাদ্দ রয়েছে ৫ হাজার ৫৮ টন। বিতরণ হয়েছে ৪ হাজার ৫০৫ টন। মজুত রয়েছে ১ হাজার ৯৭৮ টন। উপপরিচালক বলেন, নাটোরের কোথাও বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ তার কাছে নেই।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন