নিম্নমানের বৈদ্যুতিক পণ্যে সয়লাব বাজার
jugantor
পুরান ঢাকার বিভিন্ন ইলেকট্রিক মার্কেট
নিম্নমানের বৈদ্যুতিক পণ্যে সয়লাব বাজার

  ইয়াসিন রহমান  

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পুরান ঢাকার বিভিন্ন ইলেকট্রিক মার্কেটে বিক্রি হচ্ছে নকল ও নিম্নমানের বৈদ্যুতিক পণ্য। এসব পণ্যের কিছু আমদানি করা, আবার কিছু দেশেই তৈরি করা হচ্ছে। কারসাজি করে আসল ব্র্যান্ডের বলে রেপ্লিকা পণ্য পাইকারি ও খুচরা মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব পণ্য কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। পাশাপাশি ভুয়া ওয়ারেন্টি-গ্যারান্টির মাধ্যমেও ঠকানো হচ্ছে ক্রেতাদের।

সরেজমিন গুলিস্তান, পাটুয়াটুলি, নবাবপুর ও চকবাজারের ইলেকট্রিক্যাল পণ্যের মার্কেটগুলোতে নকল ও নিুমানের বৈদ্যুতিক পাখা, পানির পাম্প, বাল্ব, টিউব লাইট, এলইডি লাইট, বৈদ্যুতিক সুইচ, সকেট, কাটআউট, হোল্ডার, রেগুলেটর, মাল্টিপ্লাগ ও বৈদ্যুতিক তারসহ নানা পণ্য বিক্রি করতে দেখা গেছে। গুলিস্তানে সুন্দরবন স্কয়ার সুপার মার্কেটে প্রায় প্রতিটি দোকানেই নিম্নমানের ইলেকট্রিক পণ্য দেখা গেছে। মার্কেটের নিচতলায় মেসার্স রাকিব এন্টারপ্রাইজে নামিদামি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক পাখা বিক্রি করতে দেখা যায়-যার সবই মূলত নিুমানের রেপ্লিকা। কিন্তু ক্রেতাদের এসব পণ্য আসল বলেই বিক্রি করা হচ্ছে।

একই স্থানে হাঁকডাক দিয়ে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এলইডি লাইট। মাইকে ‘৩০০ টাকার লাইট ১৫০ টাকা’ বলে বিক্রি করা হচ্ছে। পাশাপাশি এক বছরের ভুয়া গ্যারান্টিও দেওয়া হচ্ছে। এদিকে ছাড়ের এই হুজুকে অনেক ক্রেতাই ভিড় করেন লাইট কিনতে। এছাড়া কয়েকদিন ব্যবহারের পর নষ্ট লাইট নিয়েও অনেকে হাজির হয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা জায়, ১৫০ টাকায় যেসব এলইডি লাইট বিক্রি হচ্ছে, তা কোনো ধরনের মানদণ্ড নিশ্চিত ছাড়াই এই মার্কেটে কারিগর দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি লাইটে ৫-৬টি ছোট আকারে এলইডি লাইট, একটি নিুমানের আইসি ও মাদারবোর্ড যুক্ত করে ৪০-৫০ টাকা খরচে তৈরি করা হয়। এরপর বিক্রি হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি দরে। কিছুদিন ব্যবহারের পর এসব লাইট নষ্ট হয়ে যায়। এতে ক্রেতার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। পাশাপাশি নিুমানের এসব পণ্যের কারণে বড় ধরনের বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের আশঙ্কাও থাকে।

রাহুল নামে এক ক্রেতা বলেন, ৮ দিন আগে এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় মাইকে ১৫০ টাকায় লাইট বিক্রির অফার শুনে দুটি কিনেছিলাম। সঙ্গে ১ বছরের গ্যারান্টিও ছিল। কিন্তু আট দিন যেতে না যেতে দুইটা লাইটই নষ্ট হয়ে যায়। এখন ওরা বলছে, এই লাইট আমি এখান থেকে কিনি নাই।

আরেক ক্রেতা জাহিদুল হোসেন জানান, সাড়ে চার মাস আগে ৩২০০ টাকা দিয়ে একটি ‘জেএফসি’ (মূলত রেপ্লিকা) বৈদ্যুতিক পাখা কিনেছিলাম। ৪ মাসের গ্যারান্টি ও এক বছরের ওয়ারেন্টি ছিল। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই পাখাটিতে সমস্যা দেখা দেয়। এরপর একদিন হঠাৎ পাখাটি বন্ধ হয়ে যায়। মিস্ত্রিকে দেখালে পাখাটি নকল বলে জানায়। এক বছরের ওয়ারেন্টি থাকলেও বিক্রেতারা পাখাটি বদলে বা ঠিক করে দিচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্রেতা জানান, অনেক সময় পণ্য আসল বলে বিক্রি করতে হয়। কারণ এখানে যেসব পণ্য বিক্রি হয় তা বেশির ভাগই রেপ্লিকা বা বিভিন্ন দেশ থেকে অর্ডার করে বানানো। পাশাপাশি কিছু পণ্য যেমন সুইচ-সকেট, মাল্টিপ্লাগ, চার্জার ফ্যান, এলইডি লাইট ইত্যাদি কারিগর রেখে এখানেই তৈরি করা হয়। তাই ক্রেতাদের বুঝেশুনে দামাদামি করে কিনতে হয়। অনেক সময় এসব পণ্যে কোনো ধরনের সমস্যা হয় না। আবার অনেক পণ্য ব্যবহারের কিছুদিন পর নষ্ট হয়ে যায়।

স্টেডিয়াম ইলেকট্রিক মার্কেটের ব্যবসায়ী আলী আহমদ যুগান্তরকে বলেন, পাটুয়াটুলি ও গুলিস্তানসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে চীন থেকে আমদানি করা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হুবহু নিুমানের বৈদ্যুতিক পাখা বিক্রি হচ্ছে। যা কিছুদিন ভালো সার্ভিস দিলেও পরে নষ্ট হয়ে যায়। পুরান ঢাকায় একাধিক নিুমানের বৈদ্যুতিক তার তৈরির কারখানাও রয়েছে।

পানি তোলার মোটরের বড় বাজার পুরান ঢাকার নবাবপুরে। সরেজমিন দেখা যায়, সেখানে ৮ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের মোটর বিক্রি হচ্ছে। নামি মোটরের সঙ্গে অনেক বেনামি মোটরও বিক্রি হচ্ছে। নবাবপুর রোডে বাক্সে বন্দি মোটর নিয়ে ঘুরছিলেন অরজুন দাস। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, প্রায় ৬ মাস আগে এখানকার একটি দোকান থেকে মোটর কিনেছি। কিন্তু এখন এটি কাজ করছে না। ওয়ারেন্টি ছিল তাই নিয়ে এসেছি। কিন্তু দোকানদার বলছে, যিনি ওয়ারেন্টি দেখেন তিনি শোরুমে আজ নেই। পরে আসতে। ঠিক করার জন্য আবার এক হাজার টাকাও দাবি করছে। বুঝেছি, এটা তাদের ধান্দাবাজি।

এ বিষয়ে বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল যুগান্তরকে বলেন, পুরান ঢাকার এসব ইলেকট্রিক্যাল মার্কেট থেকে পণ্য কিনে প্রতিনিয়ত ঠকছেন ক্রেতা। এখানে কম দামে পণ্য পাওয়া যায়, তাই ক্রেতারাও ভিড় করেন। কিন্তু বিক্রেতারা ক্রেতার সরলতার সুযোগে

নিম্নমানের পণ্য ধরিয়ে দিচ্ছে। এসব মার্কেটে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। তিনি বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ি ভাড়া নিয়ে বৈদ্যুতিক বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরি করা হচ্ছে। আমরা খোঁজ নিয়ে সেখানেও অভিযান পরিচালনা করছি। কয়েকদিন আগেও এমন একটি চক্রকে ধরে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।

পুরান ঢাকার বিভিন্ন ইলেকট্রিক মার্কেট

নিম্নমানের বৈদ্যুতিক পণ্যে সয়লাব বাজার

 ইয়াসিন রহমান 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পুরান ঢাকার বিভিন্ন ইলেকট্রিক মার্কেটে বিক্রি হচ্ছে নকল ও নিম্নমানের বৈদ্যুতিক পণ্য। এসব পণ্যের কিছু আমদানি করা, আবার কিছু দেশেই তৈরি করা হচ্ছে। কারসাজি করে আসল ব্র্যান্ডের বলে রেপ্লিকা পণ্য পাইকারি ও খুচরা মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব পণ্য কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। পাশাপাশি ভুয়া ওয়ারেন্টি-গ্যারান্টির মাধ্যমেও ঠকানো হচ্ছে ক্রেতাদের।

সরেজমিন গুলিস্তান, পাটুয়াটুলি, নবাবপুর ও চকবাজারের ইলেকট্রিক্যাল পণ্যের মার্কেটগুলোতে নকল ও নিুমানের বৈদ্যুতিক পাখা, পানির পাম্প, বাল্ব, টিউব লাইট, এলইডি লাইট, বৈদ্যুতিক সুইচ, সকেট, কাটআউট, হোল্ডার, রেগুলেটর, মাল্টিপ্লাগ ও বৈদ্যুতিক তারসহ নানা পণ্য বিক্রি করতে দেখা গেছে। গুলিস্তানে সুন্দরবন স্কয়ার সুপার মার্কেটে প্রায় প্রতিটি দোকানেই নিম্নমানের ইলেকট্রিক পণ্য দেখা গেছে। মার্কেটের নিচতলায় মেসার্স রাকিব এন্টারপ্রাইজে নামিদামি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক পাখা বিক্রি করতে দেখা যায়-যার সবই মূলত নিুমানের রেপ্লিকা। কিন্তু ক্রেতাদের এসব পণ্য আসল বলেই বিক্রি করা হচ্ছে।

একই স্থানে হাঁকডাক দিয়ে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এলইডি লাইট। মাইকে ‘৩০০ টাকার লাইট ১৫০ টাকা’ বলে বিক্রি করা হচ্ছে। পাশাপাশি এক বছরের ভুয়া গ্যারান্টিও দেওয়া হচ্ছে। এদিকে ছাড়ের এই হুজুকে অনেক ক্রেতাই ভিড় করেন লাইট কিনতে। এছাড়া কয়েকদিন ব্যবহারের পর নষ্ট লাইট নিয়েও অনেকে হাজির হয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা জায়, ১৫০ টাকায় যেসব এলইডি লাইট বিক্রি হচ্ছে, তা কোনো ধরনের মানদণ্ড নিশ্চিত ছাড়াই এই মার্কেটে কারিগর দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি লাইটে ৫-৬টি ছোট আকারে এলইডি লাইট, একটি নিুমানের আইসি ও মাদারবোর্ড যুক্ত করে ৪০-৫০ টাকা খরচে তৈরি করা হয়। এরপর বিক্রি হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি দরে। কিছুদিন ব্যবহারের পর এসব লাইট নষ্ট হয়ে যায়। এতে ক্রেতার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। পাশাপাশি নিুমানের এসব পণ্যের কারণে বড় ধরনের বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের আশঙ্কাও থাকে।

রাহুল নামে এক ক্রেতা বলেন, ৮ দিন আগে এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় মাইকে ১৫০ টাকায় লাইট বিক্রির অফার শুনে দুটি কিনেছিলাম। সঙ্গে ১ বছরের গ্যারান্টিও ছিল। কিন্তু আট দিন যেতে না যেতে দুইটা লাইটই নষ্ট হয়ে যায়। এখন ওরা বলছে, এই লাইট আমি এখান থেকে কিনি নাই।

আরেক ক্রেতা জাহিদুল হোসেন জানান, সাড়ে চার মাস আগে ৩২০০ টাকা দিয়ে একটি ‘জেএফসি’ (মূলত রেপ্লিকা) বৈদ্যুতিক পাখা কিনেছিলাম। ৪ মাসের গ্যারান্টি ও এক বছরের ওয়ারেন্টি ছিল। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই পাখাটিতে সমস্যা দেখা দেয়। এরপর একদিন হঠাৎ পাখাটি বন্ধ হয়ে যায়। মিস্ত্রিকে দেখালে পাখাটি নকল বলে জানায়। এক বছরের ওয়ারেন্টি থাকলেও বিক্রেতারা পাখাটি বদলে বা ঠিক করে দিচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্রেতা জানান, অনেক সময় পণ্য আসল বলে বিক্রি করতে হয়। কারণ এখানে যেসব পণ্য বিক্রি হয় তা বেশির ভাগই রেপ্লিকা বা বিভিন্ন দেশ থেকে অর্ডার করে বানানো। পাশাপাশি কিছু পণ্য যেমন সুইচ-সকেট, মাল্টিপ্লাগ, চার্জার ফ্যান, এলইডি লাইট ইত্যাদি কারিগর রেখে এখানেই তৈরি করা হয়। তাই ক্রেতাদের বুঝেশুনে দামাদামি করে কিনতে হয়। অনেক সময় এসব পণ্যে কোনো ধরনের সমস্যা হয় না। আবার অনেক পণ্য ব্যবহারের কিছুদিন পর নষ্ট হয়ে যায়।

স্টেডিয়াম ইলেকট্রিক মার্কেটের ব্যবসায়ী আলী আহমদ যুগান্তরকে বলেন, পাটুয়াটুলি ও গুলিস্তানসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে চীন থেকে আমদানি করা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হুবহু নিুমানের বৈদ্যুতিক পাখা বিক্রি হচ্ছে। যা কিছুদিন ভালো সার্ভিস দিলেও পরে নষ্ট হয়ে যায়। পুরান ঢাকায় একাধিক নিুমানের বৈদ্যুতিক তার তৈরির কারখানাও রয়েছে।

পানি তোলার মোটরের বড় বাজার পুরান ঢাকার নবাবপুরে। সরেজমিন দেখা যায়, সেখানে ৮ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের মোটর বিক্রি হচ্ছে। নামি মোটরের সঙ্গে অনেক বেনামি মোটরও বিক্রি হচ্ছে। নবাবপুর রোডে বাক্সে বন্দি মোটর নিয়ে ঘুরছিলেন অরজুন দাস। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, প্রায় ৬ মাস আগে এখানকার একটি দোকান থেকে মোটর কিনেছি। কিন্তু এখন এটি কাজ করছে না। ওয়ারেন্টি ছিল তাই নিয়ে এসেছি। কিন্তু দোকানদার বলছে, যিনি ওয়ারেন্টি দেখেন তিনি শোরুমে আজ নেই। পরে আসতে। ঠিক করার জন্য আবার এক হাজার টাকাও দাবি করছে। বুঝেছি, এটা তাদের ধান্দাবাজি।

এ বিষয়ে বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল যুগান্তরকে বলেন, পুরান ঢাকার এসব ইলেকট্রিক্যাল মার্কেট থেকে পণ্য কিনে প্রতিনিয়ত ঠকছেন ক্রেতা। এখানে কম দামে পণ্য পাওয়া যায়, তাই ক্রেতারাও ভিড় করেন। কিন্তু বিক্রেতারা ক্রেতার সরলতার সুযোগে

নিম্নমানের পণ্য ধরিয়ে দিচ্ছে। এসব মার্কেটে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। তিনি বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ি ভাড়া নিয়ে বৈদ্যুতিক বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরি করা হচ্ছে। আমরা খোঁজ নিয়ে সেখানেও অভিযান পরিচালনা করছি। কয়েকদিন আগেও এমন একটি চক্রকে ধরে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন