চরাঞ্চলে শরতের কাশফুলে প্রকৃতিপ্রেমীর ভিড়
jugantor
পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাময় কুড়িগ্রাম
চরাঞ্চলে শরতের কাশফুলে প্রকৃতিপ্রেমীর ভিড়

  আহসান হাবীব নীলু, কুড়িগ্রাম  

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কবি জীবনানন্দ দাশ শরৎ বন্দনায় লিখেছেন, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।’ কবি জসীম উদ্দীন ‘বিরহী নারী’ মননে কবিতায় লিখেছেন-‘গণিতে গণিতে শ্রাবণ কাটিল, আসিল ভাদ্র মাস, বিরহী নারীর নয়নের জলে ভিজিল বুকের বাস।’ কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়, ‘কাশফুল মনে সাদা শিহরণ জাগায়, মন বলে কত সুন্দর প্রকৃতি, স্রষ্টার কি অপার সৃষ্টি।’ এমন শত শত উক্তি রয়েছে কাশফুল নিয়ে। কুড়িগ্রাম চরাঞ্চলে পর্যটন শিল্প বিকাশের অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

প্রকৃতিতে যখন শরৎকাল আসে তখন কাশফুলই জানিয়ে দেয় আগমনী বার্তা। কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলগুলোতে প্রকৃতিতে কাশফুলের রাজত্ব দেখে যে কারোই চোখ-মন জুড়িয়ে আসবে। কৃষকরা এ কাশবন নিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন দেখছে। আর প্রকৃতিপ্রেমীরা ছুটছে অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে। প্রতিদিন প্রকৃতিপ্রেমীদের পদচারণে মুখরিত জেলার চরাঞ্চলগুলো। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য আরও বাড়িয়েছে চরাঞ্চলের বড় বড় ঝাউ গাছগুলো। এসব ঝাউ গাছে লাল, গোলাপি, হলুদসহ বিভিন্ন রঙের ফুল বাড়তি আকর্ষণ বাড়িয়েছে অবহেলিত চরাঞ্চলগুলোতে। কাশফুলের বাতাসে দোল খাওয়ার দৃশ্য যেন মন কাড়বে সবার। প্রতিবছর শরতের এই সময়টাতে চরাঞ্চলে শহরের মানুষের পদাচারণ পড়ে। কখনো কালো মেঘে আবার কখনো সাদা মেঘের আভরণে লুকিয়ে হাসছে সোনালি সূর্য। কেউবা সপরিবারে ঘুরতে আসেন আবার কেউ প্রিয়জনের সঙ্গে এসেছেন সোনালি শরতের মিষ্টি গন্ধের স্বাদ নিতে।

কুড়িগ্রামের সিনিয়র সিটিজেন (সাবেক শিক্ষক, সাংবাদিক ও স্কাউট ব্যক্তিত্ব) জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি সামিউল হক নান্টু জানান, কাশফুলের আদি নিবাস রোমানিয়ায়। কাশফুল মূলত ছন গোত্রীয় এক ধরনের ঘাস। ঘাস জাতীয় উদ্ভিদটি উচ্চতায় সাধারণত ৭-৮ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। গাছটির চিরল পাতার দুই পাশ বেশ ধারালো। কাশবন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না এর রয়েছে নানা ঔষধি গুণও। নদীর ধার, জলাভূমি, চরাঞ্চল, শুকনো এলাকা, পাহাড় কিংবা গ্রামের উঁচু স্থানে কাশের ঝাড় বেড়ে ওঠে। তবে নদীর তীরেই কাশফুল বেশি জš§াতে দেখা যায়। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটনোর পাশাপাশি কৃষকদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করা সম্ভব। কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী আহসান রাফি বলেন, মন খারাপ থাকলে এখানে আসি। কিছুক্ষণ সময় কাটাই। মন ভালো হয়ে যায়। শিক্ষার্থী হেনা বলেন, গ্রামবাংলার অনেক ফুল হারিয়ে গেছে। তবে এখন নদী তীরবর্তী চরে কাশবন দেখে আসলেই মনটা ভালো হয়ে যায়। উলিপুর উপজেলার মোল্লারহাট চরের পাখি আক্তার বলেন, চরের মধ্যে কাশফুল আর ওলা (ঝাউ) গাছের বহু রঙের ফুল দেখতে অনেক মানুষ আসে। এই কাশিয়া দিয়ে আমরা ঘরের বেড়া, ছাউনি, ঝাড়ু বানাই। আর ওলা গাছ কেটে খড়ির (জ্বালানি) কাজে ব্যবহার করি এবং সেগুলো বিক্রি করে বাড়তি আয় সংসারের কাজে লাগানো হয়। নজরুল ইসলাম বলেন, চরের মধ্যে এই কাশিয়া অনেক কাজে লাগে। বন্যার সময় নদীর স্রোত কমায়। কাশিয়া গরুকে খাওয়ানো যায়। পানের বরজের জন্য এই কাশিয়া রাজশাহী, খুলনা, বরিশালসহ দেশের অনেক স্থানে চলে যায় নৌকা ও সড়ক পথে। মজিবর রহমান বলেন, চরের পরিত্যক্ত বালু জমিতে একাই হয় কাশিয়া। এর জন্য কোনো টাকা-পয়সা খরচ করে আবাদ করা লাগে না। কার্তিক মাসে এই কাশিয়া কাটা হয়। এক বিঘা জমিতে প্রায় ১৫শ থেকে দু’হাজার কাশিয়ার আটি হয়। কাশিয়া কেটে ১৪ ইঞ্চি করে আটি বেঁধে ১০-১২ টাকা করে বিক্রি হয়। গড়ে প্রতি বিঘা জমি থেকে কাশিয়া থেকে ১০-১২ হাজার টাকা আসে। কার্তিক মাসে চরের অভাব দেখা দেয়। কাশিয়া বিক্রি করে যে টাকা আসে তাতে কার্তিক মাসের অভাব পার হয়ে যায় এখানকার মানুষের।

কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর মির্জা নাসির উদ্দিন বলেন, কাশফুল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, ঔষধি গুণও রয়েছে। মানুষের পিত্তথলিতে পাথর, শরীরে কোথায় ফোড়ার সৃষ্টি হলে তার ব্যথা উপশমে কাশফুলের মূল ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কাশ আমাদের পরিচিত উদ্ভিদ হলেও এর আদি নিবাস রোমানিয়ায়। এর ইংরেজি নাম ক্যাটকিন এবং বৈজ্ঞানিক নাম হলো স্যাকরারাম এসপোটেনিয়াম।

পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাময় কুড়িগ্রাম

চরাঞ্চলে শরতের কাশফুলে প্রকৃতিপ্রেমীর ভিড়

 আহসান হাবীব নীলু, কুড়িগ্রাম 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কবি জীবনানন্দ দাশ শরৎ বন্দনায় লিখেছেন, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।’ কবি জসীম উদ্দীন ‘বিরহী নারী’ মননে কবিতায় লিখেছেন-‘গণিতে গণিতে শ্রাবণ কাটিল, আসিল ভাদ্র মাস, বিরহী নারীর নয়নের জলে ভিজিল বুকের বাস।’ কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়, ‘কাশফুল মনে সাদা শিহরণ জাগায়, মন বলে কত সুন্দর প্রকৃতি, স্রষ্টার কি অপার সৃষ্টি।’ এমন শত শত উক্তি রয়েছে কাশফুল নিয়ে। কুড়িগ্রাম চরাঞ্চলে পর্যটন শিল্প বিকাশের অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

প্রকৃতিতে যখন শরৎকাল আসে তখন কাশফুলই জানিয়ে দেয় আগমনী বার্তা। কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলগুলোতে প্রকৃতিতে কাশফুলের রাজত্ব দেখে যে কারোই চোখ-মন জুড়িয়ে আসবে। কৃষকরা এ কাশবন নিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন দেখছে। আর প্রকৃতিপ্রেমীরা ছুটছে অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে। প্রতিদিন প্রকৃতিপ্রেমীদের পদচারণে মুখরিত জেলার চরাঞ্চলগুলো। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য আরও বাড়িয়েছে চরাঞ্চলের বড় বড় ঝাউ গাছগুলো। এসব ঝাউ গাছে লাল, গোলাপি, হলুদসহ বিভিন্ন রঙের ফুল বাড়তি আকর্ষণ বাড়িয়েছে অবহেলিত চরাঞ্চলগুলোতে। কাশফুলের বাতাসে দোল খাওয়ার দৃশ্য যেন মন কাড়বে সবার। প্রতিবছর শরতের এই সময়টাতে চরাঞ্চলে শহরের মানুষের পদাচারণ পড়ে। কখনো কালো মেঘে আবার কখনো সাদা মেঘের আভরণে লুকিয়ে হাসছে সোনালি সূর্য। কেউবা সপরিবারে ঘুরতে আসেন আবার কেউ প্রিয়জনের সঙ্গে এসেছেন সোনালি শরতের মিষ্টি গন্ধের স্বাদ নিতে।

কুড়িগ্রামের সিনিয়র সিটিজেন (সাবেক শিক্ষক, সাংবাদিক ও স্কাউট ব্যক্তিত্ব) জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি সামিউল হক নান্টু জানান, কাশফুলের আদি নিবাস রোমানিয়ায়। কাশফুল মূলত ছন গোত্রীয় এক ধরনের ঘাস। ঘাস জাতীয় উদ্ভিদটি উচ্চতায় সাধারণত ৭-৮ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। গাছটির চিরল পাতার দুই পাশ বেশ ধারালো। কাশবন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না এর রয়েছে নানা ঔষধি গুণও। নদীর ধার, জলাভূমি, চরাঞ্চল, শুকনো এলাকা, পাহাড় কিংবা গ্রামের উঁচু স্থানে কাশের ঝাড় বেড়ে ওঠে। তবে নদীর তীরেই কাশফুল বেশি জš§াতে দেখা যায়। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটনোর পাশাপাশি কৃষকদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করা সম্ভব। কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী আহসান রাফি বলেন, মন খারাপ থাকলে এখানে আসি। কিছুক্ষণ সময় কাটাই। মন ভালো হয়ে যায়। শিক্ষার্থী হেনা বলেন, গ্রামবাংলার অনেক ফুল হারিয়ে গেছে। তবে এখন নদী তীরবর্তী চরে কাশবন দেখে আসলেই মনটা ভালো হয়ে যায়। উলিপুর উপজেলার মোল্লারহাট চরের পাখি আক্তার বলেন, চরের মধ্যে কাশফুল আর ওলা (ঝাউ) গাছের বহু রঙের ফুল দেখতে অনেক মানুষ আসে। এই কাশিয়া দিয়ে আমরা ঘরের বেড়া, ছাউনি, ঝাড়ু বানাই। আর ওলা গাছ কেটে খড়ির (জ্বালানি) কাজে ব্যবহার করি এবং সেগুলো বিক্রি করে বাড়তি আয় সংসারের কাজে লাগানো হয়। নজরুল ইসলাম বলেন, চরের মধ্যে এই কাশিয়া অনেক কাজে লাগে। বন্যার সময় নদীর স্রোত কমায়। কাশিয়া গরুকে খাওয়ানো যায়। পানের বরজের জন্য এই কাশিয়া রাজশাহী, খুলনা, বরিশালসহ দেশের অনেক স্থানে চলে যায় নৌকা ও সড়ক পথে। মজিবর রহমান বলেন, চরের পরিত্যক্ত বালু জমিতে একাই হয় কাশিয়া। এর জন্য কোনো টাকা-পয়সা খরচ করে আবাদ করা লাগে না। কার্তিক মাসে এই কাশিয়া কাটা হয়। এক বিঘা জমিতে প্রায় ১৫শ থেকে দু’হাজার কাশিয়ার আটি হয়। কাশিয়া কেটে ১৪ ইঞ্চি করে আটি বেঁধে ১০-১২ টাকা করে বিক্রি হয়। গড়ে প্রতি বিঘা জমি থেকে কাশিয়া থেকে ১০-১২ হাজার টাকা আসে। কার্তিক মাসে চরের অভাব দেখা দেয়। কাশিয়া বিক্রি করে যে টাকা আসে তাতে কার্তিক মাসের অভাব পার হয়ে যায় এখানকার মানুষের।

কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর মির্জা নাসির উদ্দিন বলেন, কাশফুল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, ঔষধি গুণও রয়েছে। মানুষের পিত্তথলিতে পাথর, শরীরে কোথায় ফোড়ার সৃষ্টি হলে তার ব্যথা উপশমে কাশফুলের মূল ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কাশ আমাদের পরিচিত উদ্ভিদ হলেও এর আদি নিবাস রোমানিয়ায়। এর ইংরেজি নাম ক্যাটকিন এবং বৈজ্ঞানিক নাম হলো স্যাকরারাম এসপোটেনিয়াম।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন