রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছেন স্থানীয়রাও
jugantor
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছেন স্থানীয়রাও

  বাহরাম খান, কক্সবাজার থেকে ফিরে  

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভূগর্ভস্থ বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার কমাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কক্সবাজারে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ স্থানীয় জনগণের প্রাত্যহিক ব্যবহারে বিশুদ্ধ পানির চাহিদা মেটাতে বেশ কিছু পানি শোধনাগারের কাজ চলছে। এ ধরনের কয়েকটি থেকে পানি সরবরাহ শুরু হয়েছে। সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার একাধিক রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সরেজমিন গিয়ে এ চিত্র দেখা গেছে।

টেকনাফের নোয়াপাড়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাহাড়ের মাঝে পুকুরের মতো একটি জলাশয় ছিল। সেটিকে পরিকল্পিতভাবে পানি শোধনাগারে রূপান্তর করা হয়েছে। ছয় একর জমির ওপর নির্মিত এই শোধনাগারে বর্ষা মৌসুমে সর্বোচ্চ দুই কোটি লিটার পানি জমার ব্যবস্থা আছে। এর পাশে প্রতি ঘণ্টায় দুই লাখ লিটার পানি ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে বিশুদ্ধ করা হচ্ছে। এখান থেকে পানি সরবরাহ পাওয়া রোহিঙ্গা নারী সাবিনা ইসলাম যুগান্তরকে জানান, আগে পাহাড়ের নিচে থেকে পানি আনতে কষ্ট হতো। পানিও ভালো ছিল না। এখন মেশিনের সাহায্যে পানি আসায় তারা ভালো পানি পাচ্ছেন। অন্য দিকে টেকনাফের উনচিপ্রাংয়ে প্রতি ঘণ্টায় এক লাখ লিটার পানি ডিজেলচালিত জেনারেটর এবং সোলার বিদ্যুতের সাহায্যে ৩০ হাজার লিটার পানি বিশুদ্ধ করা হচ্ছে।

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী এলাকায় দেশের অন্যতম বড় পানি শোধনাগার নির্মাণকাজ চলছে। নাফ নদীর পানি পরিশোধন করে স্থানীয় জনগণ ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হবে। প্রথম পর্যায়ে ৫০ একর জমির ওপর পানি শোধনাগারসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণকাজ চলছে। এতে দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পানি বিশুদ্ধের পর সরবরাহ করা যাবে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, এখানে বর্ষার সময় বৃষ্টির পানি এবং মে-জুন মাসে নাফ নদীর উপরিভাগ থেকে মিষ্টি পানি সংগ্রহ করা হবে।

বাকখালী নদীর পানি বিশুদ্ধ করে কক্সবাজার পৌরবাসীর মাঝে সরবরাহের লক্ষ্যে আলাদা শোধনাগার হচ্ছে। বাকখালী তীরের এই শোধনাগারে প্রতি ঘণ্টায় ১০ লাখ লিটার পানি বিশুদ্ধ করা সম্ভব হবে। এতে কক্সবাজারের পাঁচ লাখ পৌরবাসী সুপেয় পানি পাবেন। এই প্রকল্পে ৪০ লাখ লিটার পানির ধারণক্ষমতাসম্পন্ন স্থাপনা নির্মাণকাজ চলছে।

‘ইমার্জেন্সি এসিট্যান্স প্রজেক্ট (ইএপি)’-এর অধীনে কক্সবাজারে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার বিভাগের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। সরকারের সঙ্গে আর্থিক সহযোগিতায় রয়েছে এডিবিসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও ময়মনসিংহসহ অনেক এলাকায় ভূমির উপরের পানি বিশুদ্ধ করে মানুষের ব্যবহার উপযোগী করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কক্সবাজারসহ লবণাক্তপ্রবণ এলাকাতে এই উদ্যোগ বড় আকারে নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রী জানান, এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সরকার এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে। ইএপি প্রকল্পের পরিচালক আব্দুল হালিম খান যুগান্তরকে বলেন, সব মানুষের কাছে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছাতে সরকার ঐকান্তিক চেষ্টা করছে। নিজ দেশ থেকে অধিকারবঞ্চিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীও সরকারের দৃষ্টির বাইরে থাকছে না। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সুপেয় পানির চাহিদার মোট ৭০ ভাগই বৃষ্টি, ঝর্ণা, নদী ও পুকুর থেকে সংগ্রহ করা।

মল এবং গৃহস্থালি আবর্জনা থেকে পানি-বিদ্যুৎ : জরুরি সহায়তার লক্ষ্যে পরিচালিত ইএপি প্রকল্পের অধীনে মানুষের মলমূত্র, রান্নাঘরের আবর্জনা এবং প্লাস্টিক জাতীয় আবর্জনা থেকে বিদ্যুৎ, পানি ও ছাই উৎপাদনের একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি ‘ওমনি প্রসেসর’ হিসাবে পরিচিত। এই বর্জ্য শোধনাগারে প্রতিদিন মানুষের মলমূত্র ছয় হাজার কেজি, রান্নারঘরের আবর্জনা, যেমন- শাকসবজির উচ্ছিষ্ট পাঁচ হাজার কেজি এবং প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্য থাকবে পাঁচশ কেজি। অর্থাৎ প্রতিদিন দেড় টন বর্জ্য থেকে ৬০-৭০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এই বিদ্যুৎ দিয়েই প্ল্যান্টটি পরিচালিত হবে। এখান থেকে অন্তত ১২০০ লিটার উন্নত মানের বিশুদ্ধ পানি উৎপাদন হবে। এই পানি ব্যাটারিসহ বিভিন্ন ধরনের বিশেষ কাজে লাগানো যাবে। একই সঙ্গে প্রতিদিন এক থেকে দেড় টন ছাই উৎপাদন হবে, যা দিয়ে মাটি ভরাট বা বিভিন্ন ঢালু জায়গার প্রটেকশনের কাজে লাগানো যাবে।

ইএপি প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিশ্বের তিনটি দেশে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষামূলক এই উদ্যোগে আমরা সফল হলে বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশাল পরিবর্তন আসবে, যা পরিবেশ রক্ষায় অনেক বড় অবদান রাখবে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছেন স্থানীয়রাও

 বাহরাম খান, কক্সবাজার থেকে ফিরে 
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভূগর্ভস্থ বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার কমাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কক্সবাজারে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ স্থানীয় জনগণের প্রাত্যহিক ব্যবহারে বিশুদ্ধ পানির চাহিদা মেটাতে বেশ কিছু পানি শোধনাগারের কাজ চলছে। এ ধরনের কয়েকটি থেকে পানি সরবরাহ শুরু হয়েছে। সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার একাধিক রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সরেজমিন গিয়ে এ চিত্র দেখা গেছে।

টেকনাফের নোয়াপাড়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাহাড়ের মাঝে পুকুরের মতো একটি জলাশয় ছিল। সেটিকে পরিকল্পিতভাবে পানি শোধনাগারে রূপান্তর করা হয়েছে। ছয় একর জমির ওপর নির্মিত এই শোধনাগারে বর্ষা মৌসুমে সর্বোচ্চ দুই কোটি লিটার পানি জমার ব্যবস্থা আছে। এর পাশে প্রতি ঘণ্টায় দুই লাখ লিটার পানি ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে বিশুদ্ধ করা হচ্ছে। এখান থেকে পানি সরবরাহ পাওয়া রোহিঙ্গা নারী সাবিনা ইসলাম যুগান্তরকে জানান, আগে পাহাড়ের নিচে থেকে পানি আনতে কষ্ট হতো। পানিও ভালো ছিল না। এখন মেশিনের সাহায্যে পানি আসায় তারা ভালো পানি পাচ্ছেন। অন্য দিকে টেকনাফের উনচিপ্রাংয়ে প্রতি ঘণ্টায় এক লাখ লিটার পানি ডিজেলচালিত জেনারেটর এবং সোলার বিদ্যুতের সাহায্যে ৩০ হাজার লিটার পানি বিশুদ্ধ করা হচ্ছে।

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী এলাকায় দেশের অন্যতম বড় পানি শোধনাগার নির্মাণকাজ চলছে। নাফ নদীর পানি পরিশোধন করে স্থানীয় জনগণ ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হবে। প্রথম পর্যায়ে ৫০ একর জমির ওপর পানি শোধনাগারসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণকাজ চলছে। এতে দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পানি বিশুদ্ধের পর সরবরাহ করা যাবে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, এখানে বর্ষার সময় বৃষ্টির পানি এবং মে-জুন মাসে নাফ নদীর উপরিভাগ থেকে মিষ্টি পানি সংগ্রহ করা হবে।

বাকখালী নদীর পানি বিশুদ্ধ করে কক্সবাজার পৌরবাসীর মাঝে সরবরাহের লক্ষ্যে আলাদা শোধনাগার হচ্ছে। বাকখালী তীরের এই শোধনাগারে প্রতি ঘণ্টায় ১০ লাখ লিটার পানি বিশুদ্ধ করা সম্ভব হবে। এতে কক্সবাজারের পাঁচ লাখ পৌরবাসী সুপেয় পানি পাবেন। এই প্রকল্পে ৪০ লাখ লিটার পানির ধারণক্ষমতাসম্পন্ন স্থাপনা নির্মাণকাজ চলছে।

‘ইমার্জেন্সি এসিট্যান্স প্রজেক্ট (ইএপি)’-এর অধীনে কক্সবাজারে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার বিভাগের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। সরকারের সঙ্গে আর্থিক সহযোগিতায় রয়েছে এডিবিসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও ময়মনসিংহসহ অনেক এলাকায় ভূমির উপরের পানি বিশুদ্ধ করে মানুষের ব্যবহার উপযোগী করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কক্সবাজারসহ লবণাক্তপ্রবণ এলাকাতে এই উদ্যোগ বড় আকারে নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রী জানান, এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সরকার এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে। ইএপি প্রকল্পের পরিচালক আব্দুল হালিম খান যুগান্তরকে বলেন, সব মানুষের কাছে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছাতে সরকার ঐকান্তিক চেষ্টা করছে। নিজ দেশ থেকে অধিকারবঞ্চিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীও সরকারের দৃষ্টির বাইরে থাকছে না। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সুপেয় পানির চাহিদার মোট ৭০ ভাগই বৃষ্টি, ঝর্ণা, নদী ও পুকুর থেকে সংগ্রহ করা।

মল এবং গৃহস্থালি আবর্জনা থেকে পানি-বিদ্যুৎ : জরুরি সহায়তার লক্ষ্যে পরিচালিত ইএপি প্রকল্পের অধীনে মানুষের মলমূত্র, রান্নাঘরের আবর্জনা এবং প্লাস্টিক জাতীয় আবর্জনা থেকে বিদ্যুৎ, পানি ও ছাই উৎপাদনের একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি ‘ওমনি প্রসেসর’ হিসাবে পরিচিত। এই বর্জ্য শোধনাগারে প্রতিদিন মানুষের মলমূত্র ছয় হাজার কেজি, রান্নারঘরের আবর্জনা, যেমন- শাকসবজির উচ্ছিষ্ট পাঁচ হাজার কেজি এবং প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্য থাকবে পাঁচশ কেজি। অর্থাৎ প্রতিদিন দেড় টন বর্জ্য থেকে ৬০-৭০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এই বিদ্যুৎ দিয়েই প্ল্যান্টটি পরিচালিত হবে। এখান থেকে অন্তত ১২০০ লিটার উন্নত মানের বিশুদ্ধ পানি উৎপাদন হবে। এই পানি ব্যাটারিসহ বিভিন্ন ধরনের বিশেষ কাজে লাগানো যাবে। একই সঙ্গে প্রতিদিন এক থেকে দেড় টন ছাই উৎপাদন হবে, যা দিয়ে মাটি ভরাট বা বিভিন্ন ঢালু জায়গার প্রটেকশনের কাজে লাগানো যাবে।

ইএপি প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিশ্বের তিনটি দেশে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষামূলক এই উদ্যোগে আমরা সফল হলে বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশাল পরিবর্তন আসবে, যা পরিবেশ রক্ষায় অনেক বড় অবদান রাখবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন