নোয়াখালীর সড়কে অনিবন্ধিত ১৫ হাজার সিএনজির দাপট
jugantor
নোয়াখালীর সড়কে অনিবন্ধিত ১৫ হাজার সিএনজির দাপট
নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ আড়াই বছর * মাসে কোটি টাকার চাঁদাবাজি

  মনিরুজ্জামান চৌধুরী, নোয়াখালী  

১৫ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধান সড়কে বহু আগে থেকেই তিন চাকার যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আছে। নোয়াখালী জেলা শহরের প্রধান সড়ক, নয়টি উপজেলার উপ-প্রধান সড়ক এবং জেলা-উপজেলার শাখা সড়কগুলোতে ১৩ হাজার ৪৩৮টি নিবন্ধিত সিএনজি চালিত থ্রি-হুইলার অটোরিকশার পাশাপাশি দিন-রাত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অনিবন্ধিত আরও ১৫ হাজারের বেশি সিএনজিচালিত অটোরিকশা।

পরিবহণ খাতের শুধু সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকেই মাসে চাঁদাবাজি হয় ১০ কোটি টাকার বেশি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সোনাপুর, মাইজদী, চৌরাস্তাসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো থাকে সিএনজিচালিত অটোরিকশার দখলে। এসব সড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে মঙ্গলবার সকাল থেকে প্রধান সড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা দিয়ে শহরের প্রধান সড়কে মাইকিং করে ট্রাফিক বিভাগ।

নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় গত আড়াই বছরে এসব সিএনজিচালিত থ্রি-হুইলার অটোরিকশা থেকে শত কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। আবার জেলার প্রত্যেকটি মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড। ওইসব স্ট্যান্ডের শ্র্রমিক-মালিক নেতারা নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা সমিতি গড়ে তোলে ভর্তি থেকে শুরু করে জিবি, লাইনম্যান, পৌর টোল ও পুলিশের নামে মাসিক চাঁদাসহ কোটি টাকার চাঁদাবাজি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যার ফলে নিবন্ধিত কিংবা অনিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা সড়কে চলতে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকছে না।

অনুসন্ধানে গেলে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক কামরুল ইসলাম, আলা উদ্দিন, নুরুল আমিন বলেন- আমরা যা ইনকাম করি, তার বেশিরভাগই রাস্তায় রাস্তায় যায়। প্রতিদিন সোনাপুর জিরোপয়েন্টে এসেই প্রতিটি নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক শ্রমিক-মালিক সংগঠনকে জিবি বাবদ দিতে হয় ৪০ টাকা, জিরোপয়েন্টের লাইনম্যানকে ১০ টাকা, পৌর টোল বাবদ ১০ টাকা। সোনাপুর থেকে মাইজদী এসেই লাইনম্যানকে ১০ টাকা, বেগমগঞ্জ চৌরাস্তায় টোল বাবদ ১৫ টাকা, লাইনম্যানকে দিতে হয় ২০ টাকা। এছাড়া প্রধান সড়ক থেকে শাখা সড়কে ডুকলেই চাঁদা দিতে হয়। এভাবে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ১০০ থেকে ১৫০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। এটা হলো চালকের হিসাব। মাস শেষে পুলিশের নাম ভাঙিয়ে সংগঠনের নেতারা সোনাপুরে প্রতিটি অনিবন্ধিত সিএনজি থেকে ৩০০ টাকা, নিবন্ধিত সিএনজি থেকে ২০০ টাকা, মাইজদীতে ২০০ টাকা ও বেগমগঞ্জ চৌরাস্তায় ২০০ টাকা করে মাসিক চাঁদা আদায় করে।

সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিক আরিফুল ইসলাম বলেন, চার বছর আগে তিনি একটি সিএনজি কিনেছেন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে রেজিস্ট্রেশনের জন্য বিআরটিএ নোয়াখালী অফিসে যোগাযোগ করলে জানা গেছে সিএনজি রেজিস্ট্রেশন বন্ধ। আর রেজিস্ট্রেশন করা হয়নি। সাড়ে তিন হাজার টাকার বিনিময়ে সোনাপুর সিএনজি মালিক সমিতিতে ভর্তির পর সড়কে চলছে সিএনজিটি। মাঝে মধ্যে পুলিশ ধরলে টাকা দিয়ে বা তদবির করে ছাড়িয়ে আনি। তিনি বলেন, রেজিস্ট্রেশন করেও বা লাভ কি? রাস্তায় চলতে সব সিএনজির খরচ একই। মাসের শেষে সময়মতো মান্থলি (মাসিক চাঁদা) দিয়ে দিলে আর সমস্যা হয় না।

নোয়াখালী ট্রাফিক বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক (টিআই) মো. বখতিয়ার উদ্দীন বলেন, অনিবন্ধিত ও নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হওয়া সিএনজি চালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান চলছে এবং মাইকিং এর মাধ্যমে সতর্ক করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, জেলায় ২০ থেকে ২৫ হাজার সিএনজি চালিত অটোরিকশা রয়েছে। যার কারণে যানজট নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে। চলতি বছরের ২০ মে আমি এই জেলায় যোগদানের পর সড়কে এ যান থেকে সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) নোয়াখালীর সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. নাজমুল হাসান বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। সড়কের অবস্থানের দিক বিবেচনায় জেলা পরিবহণ কমিটির সিদ্ধান্ত না হওয়াতে ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে সিএনজি চালিত অটোরিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে সিএনজিচালিত অটোরিকশার বৈধতার ক্ষেত্রে অন্যান্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

নোয়াখালীর সড়কে অনিবন্ধিত ১৫ হাজার সিএনজির দাপট

নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ আড়াই বছর * মাসে কোটি টাকার চাঁদাবাজি
 মনিরুজ্জামান চৌধুরী, নোয়াখালী 
১৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধান সড়কে বহু আগে থেকেই তিন চাকার যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আছে। নোয়াখালী জেলা শহরের প্রধান সড়ক, নয়টি উপজেলার উপ-প্রধান সড়ক এবং জেলা-উপজেলার শাখা সড়কগুলোতে ১৩ হাজার ৪৩৮টি নিবন্ধিত সিএনজি চালিত থ্রি-হুইলার অটোরিকশার পাশাপাশি দিন-রাত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অনিবন্ধিত আরও ১৫ হাজারের বেশি সিএনজিচালিত অটোরিকশা।

পরিবহণ খাতের শুধু সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকেই মাসে চাঁদাবাজি হয় ১০ কোটি টাকার বেশি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সোনাপুর, মাইজদী, চৌরাস্তাসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো থাকে সিএনজিচালিত অটোরিকশার দখলে। এসব সড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে মঙ্গলবার সকাল থেকে প্রধান সড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা দিয়ে শহরের প্রধান সড়কে মাইকিং করে ট্রাফিক বিভাগ।

নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় গত আড়াই বছরে এসব সিএনজিচালিত থ্রি-হুইলার অটোরিকশা থেকে শত কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। আবার জেলার প্রত্যেকটি মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড। ওইসব স্ট্যান্ডের শ্র্রমিক-মালিক নেতারা নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা সমিতি গড়ে তোলে ভর্তি থেকে শুরু করে জিবি, লাইনম্যান, পৌর টোল ও পুলিশের নামে মাসিক চাঁদাসহ কোটি টাকার চাঁদাবাজি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যার ফলে নিবন্ধিত কিংবা অনিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা সড়কে চলতে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকছে না।

অনুসন্ধানে গেলে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক কামরুল ইসলাম, আলা উদ্দিন, নুরুল আমিন বলেন- আমরা যা ইনকাম করি, তার বেশিরভাগই রাস্তায় রাস্তায় যায়। প্রতিদিন সোনাপুর জিরোপয়েন্টে এসেই প্রতিটি নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক শ্রমিক-মালিক সংগঠনকে জিবি বাবদ দিতে হয় ৪০ টাকা, জিরোপয়েন্টের লাইনম্যানকে ১০ টাকা, পৌর টোল বাবদ ১০ টাকা। সোনাপুর থেকে মাইজদী এসেই লাইনম্যানকে ১০ টাকা, বেগমগঞ্জ চৌরাস্তায় টোল বাবদ ১৫ টাকা, লাইনম্যানকে দিতে হয় ২০ টাকা। এছাড়া প্রধান সড়ক থেকে শাখা সড়কে ডুকলেই চাঁদা দিতে হয়। এভাবে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ১০০ থেকে ১৫০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। এটা হলো চালকের হিসাব। মাস শেষে পুলিশের নাম ভাঙিয়ে সংগঠনের নেতারা সোনাপুরে প্রতিটি অনিবন্ধিত সিএনজি থেকে ৩০০ টাকা, নিবন্ধিত সিএনজি থেকে ২০০ টাকা, মাইজদীতে ২০০ টাকা ও বেগমগঞ্জ চৌরাস্তায় ২০০ টাকা করে মাসিক চাঁদা আদায় করে।

সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিক আরিফুল ইসলাম বলেন, চার বছর আগে তিনি একটি সিএনজি কিনেছেন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে রেজিস্ট্রেশনের জন্য বিআরটিএ নোয়াখালী অফিসে যোগাযোগ করলে জানা গেছে সিএনজি রেজিস্ট্রেশন বন্ধ। আর রেজিস্ট্রেশন করা হয়নি। সাড়ে তিন হাজার টাকার বিনিময়ে সোনাপুর সিএনজি মালিক সমিতিতে ভর্তির পর সড়কে চলছে সিএনজিটি। মাঝে মধ্যে পুলিশ ধরলে টাকা দিয়ে বা তদবির করে ছাড়িয়ে আনি। তিনি বলেন, রেজিস্ট্রেশন করেও বা লাভ কি? রাস্তায় চলতে সব সিএনজির খরচ একই। মাসের শেষে সময়মতো মান্থলি (মাসিক চাঁদা) দিয়ে দিলে আর সমস্যা হয় না।

নোয়াখালী ট্রাফিক বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক (টিআই) মো. বখতিয়ার উদ্দীন বলেন, অনিবন্ধিত ও নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হওয়া সিএনজি চালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান চলছে এবং মাইকিং এর মাধ্যমে সতর্ক করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, জেলায় ২০ থেকে ২৫ হাজার সিএনজি চালিত অটোরিকশা রয়েছে। যার কারণে যানজট নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে। চলতি বছরের ২০ মে আমি এই জেলায় যোগদানের পর সড়কে এ যান থেকে সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) নোয়াখালীর সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. নাজমুল হাসান বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। সড়কের অবস্থানের দিক বিবেচনায় জেলা পরিবহণ কমিটির সিদ্ধান্ত না হওয়াতে ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে সিএনজি চালিত অটোরিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে সিএনজিচালিত অটোরিকশার বৈধতার ক্ষেত্রে অন্যান্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন