গহনা তৈরির গ্রাম ১৫০ বছরের পুরোনো ভাকুর্তা বাজার
jugantor
গহনা তৈরির গ্রাম ১৫০ বছরের পুরোনো ভাকুর্তা বাজার
‘সাজিয়েই আনন্দিত যারা’

  মতিউর রহমান ভান্ডারী, সাভার  

১৫ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৫০ বছরের পুরোনো গ্রাম ভাকুর্তা বাজার। শত বছরের ঐতিহ্য পিতৃপুরুষের পেশাকে আগলে রাখা একটি জনপদের নাম। ঢাকা শহরের কোলাহল পেরিয়ে মাত্র ১৫ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসে নামলেই কানে আসবে গহনা তৈরির কারিগরদের হাতুরের ঠুংঠাং শব্দ। অন্যকে অলঙ্কৃত করেই যাদের আনন্দ। নিজের জীবনের চিত্রটা সুখকর না হলেও তারা এই পেশা আগলে রেখেছেন জীবিকা ও পিতৃপুরুষের টানে।

শুধু দেশে নয়, এখানকার গহনা দেশের চাহিদা মিটিয়ে সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও যাচ্ছে। মূলত উৎসব ও বিশেষ কোনো দিবস কেন্দ্র করে এর চাহিদা বেড়ে যায়। জানা যায়, ’৮০-এর দশকে এই বাজারে শুধুই সোনা ও রুপার গয়না তৈরি হতো। কিন্তু কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও উপযুক্ত মজুরি না পাওয়াসহ নানা কারণে ’৯০-এর দশকের পর থেকে কারিগররা সোনা ও রুপার অলঙ্কার তৈরি থেকে সরে আসেন। এখন বেশির ভাগ কারিগর ঝুঁকে পড়েছেন ইমিটেশনের গয়না তৈরির দিকে। তামার ব্যবহার বেশি হলেও পিতল ও দস্তা দিয়েও গয়না তৈরি করেন এই কারিগররা।

ভাকুর্তা ইউনিয়নের ভাকুর্তা, কান্দিভাকুর্তা, হিন্দুভাকুর্তা, মোগরাকান্দা, মুশুরীখোলা, ডোমরাকান্দা, বাহেরচর, ঝাউচর, লুটের চর, চুনার চর, চাপড়া ও চাইরা গ্রামের প্রায় আট হাজার নারী-পুরুষ গহনা তৈরির কাজে যুক্ত। সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে হাতের ছোঁয়ায় তৈরি করেন গলার হার, হাতের চুড়ি, কানের দুল, ঝুমকা, চেন, পায়েল ও নূপুরসহ বিভিন্ন ডিজাইনের গহনা। এখানকার তৈরি গহনার চাহিদা বাংলাদেশজুড়েই বিদ্যমান। এ ছাড়া ঢাকা শহরের বড় বড় প্রতিটি শপিংমলে এখানকার তৈরি করা গহনা শোভা ছড়াচ্ছে। অন্যকে সাজিয়েই যেন তাদের আনন্দ। কথা হয়, হিন্দুভাকুর্তা গ্রামের আনন্দ সরকারের সঙ্গে। কয়েক প্রজন্ম ধরে গহনা তৈরির কাজ করছেন তিনি। তিনি জানান, গহনা তৈরির কাজটি আগে হিন্দুরা করতেন। এখন মুসলমানরাও এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন। গহনা তৈরিতে লাভ কেমন জানতে চাইলে আনন্দ সরকার বলেন, দাম ডিজাইন ও আকারের ওপর নির্ভর করে। ৩০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত। দামের হেরফের হয়। তবে পাইকাররা বড় বড় মার্কেটে দুই গুণ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তিন গুণ পর্যন্ত বেশি মূল্যে বিক্রি করেন। আবু সিদ্দিক জানান, গহনা তৈরির কাঁচামাল তামা কিনে আনা হয় ঢাকার তাঁতিবাজার থেকে। এ ছাড়া কিছু গহনার কাঁচামাল বগুড়া ও ভারত থেকে আনা হয়। নিজেদের দক্ষতা ও পরিশ্রম দিয়ে কাজ করেন অধিকাংশ কারিগর। তবে, দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করে আয় হয় মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।

ভাকুর্তা গহনা সমিতির সভাপতি দুলাল রাজবংশী জানান, বিদেশি তৈরি নিুমানের ইমিটেশনের গহনার একচেটিয়া প্রবেশে, হাতে তৈরি গহনার বাজার নষ্ট করছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঋণ সুবিধা না থাকাও অনেক বড় একটা সমস্যা। আরও জানান, এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় আট হাজার কারিগর ও তাদের পরিবারকে বাঁচাতে হলে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শত বছরের এই পেশাজীবী কারিগরদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ শুরু করেছে বেসরকারি সংস্থা সোশ্যাল আপলিফটমেন্ট সোসাইটি (সাস)। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক হামিদা বেগম জানান, ভাকুর্তার জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের সমস্যা থেকে উত্তরণ ও এ ব্যাবসা প্রসারে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় ভাকুর্তায় সাসটেইনেবল এন্টারপ্রাইজ প্রজেক্টের আওতায় স্বাস্থ্যসম্মত ও কর্মবান্ধব ইমিটেশন জুয়েলারি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের মাধ্যমে উদ্যোক্তা ও কারিগরদের আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজাইন প্রচলনের মাধ্যমে পণ্যের মান উন্নয়ন, কারিগরি জ্ঞান ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা হচ্ছে। এলাকায় বিদ্যমান ভ্যালু চেইনের সমস্যা ও পরিবেশগত সমস্যা বিবেচনা করে আধুনিক মেশিনারিজ সুবিধাসহ কমনসার্ভিস সেন্টার স্থাপনে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করা হবে।

সাস বাস্তবায়নাধীন ইমিটেশন জুয়েলারি প্রকল্প পরিদর্শনে এসে পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. নমিতা হালদার এনডিসি বলেন, গহনা কারিগরদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করা হয়েছে। সভায় জুয়েলারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা প্রসারে পরামর্শের পাশাপাশি বিভিন্ন উৎসাহ দেওয়া হয়। পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করলে অতিদ্রুত তাদের দুঃখ লাঘব হবে।

গহনা তৈরির গ্রাম ১৫০ বছরের পুরোনো ভাকুর্তা বাজার

‘সাজিয়েই আনন্দিত যারা’
 মতিউর রহমান ভান্ডারী, সাভার 
১৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৫০ বছরের পুরোনো গ্রাম ভাকুর্তা বাজার। শত বছরের ঐতিহ্য পিতৃপুরুষের পেশাকে আগলে রাখা একটি জনপদের নাম। ঢাকা শহরের কোলাহল পেরিয়ে মাত্র ১৫ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসে নামলেই কানে আসবে গহনা তৈরির কারিগরদের হাতুরের ঠুংঠাং শব্দ। অন্যকে অলঙ্কৃত করেই যাদের আনন্দ। নিজের জীবনের চিত্রটা সুখকর না হলেও তারা এই পেশা আগলে রেখেছেন জীবিকা ও পিতৃপুরুষের টানে।

শুধু দেশে নয়, এখানকার গহনা দেশের চাহিদা মিটিয়ে সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও যাচ্ছে। মূলত উৎসব ও বিশেষ কোনো দিবস কেন্দ্র করে এর চাহিদা বেড়ে যায়। জানা যায়, ’৮০-এর দশকে এই বাজারে শুধুই সোনা ও রুপার গয়না তৈরি হতো। কিন্তু কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও উপযুক্ত মজুরি না পাওয়াসহ নানা কারণে ’৯০-এর দশকের পর থেকে কারিগররা সোনা ও রুপার অলঙ্কার তৈরি থেকে সরে আসেন। এখন বেশির ভাগ কারিগর ঝুঁকে পড়েছেন ইমিটেশনের গয়না তৈরির দিকে। তামার ব্যবহার বেশি হলেও পিতল ও দস্তা দিয়েও গয়না তৈরি করেন এই কারিগররা।

ভাকুর্তা ইউনিয়নের ভাকুর্তা, কান্দিভাকুর্তা, হিন্দুভাকুর্তা, মোগরাকান্দা, মুশুরীখোলা, ডোমরাকান্দা, বাহেরচর, ঝাউচর, লুটের চর, চুনার চর, চাপড়া ও চাইরা গ্রামের প্রায় আট হাজার নারী-পুরুষ গহনা তৈরির কাজে যুক্ত। সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে হাতের ছোঁয়ায় তৈরি করেন গলার হার, হাতের চুড়ি, কানের দুল, ঝুমকা, চেন, পায়েল ও নূপুরসহ বিভিন্ন ডিজাইনের গহনা। এখানকার তৈরি গহনার চাহিদা বাংলাদেশজুড়েই বিদ্যমান। এ ছাড়া ঢাকা শহরের বড় বড় প্রতিটি শপিংমলে এখানকার তৈরি করা গহনা শোভা ছড়াচ্ছে। অন্যকে সাজিয়েই যেন তাদের আনন্দ। কথা হয়, হিন্দুভাকুর্তা গ্রামের আনন্দ সরকারের সঙ্গে। কয়েক প্রজন্ম ধরে গহনা তৈরির কাজ করছেন তিনি। তিনি জানান, গহনা তৈরির কাজটি আগে হিন্দুরা করতেন। এখন মুসলমানরাও এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন। গহনা তৈরিতে লাভ কেমন জানতে চাইলে আনন্দ সরকার বলেন, দাম ডিজাইন ও আকারের ওপর নির্ভর করে। ৩০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত। দামের হেরফের হয়। তবে পাইকাররা বড় বড় মার্কেটে দুই গুণ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তিন গুণ পর্যন্ত বেশি মূল্যে বিক্রি করেন। আবু সিদ্দিক জানান, গহনা তৈরির কাঁচামাল তামা কিনে আনা হয় ঢাকার তাঁতিবাজার থেকে। এ ছাড়া কিছু গহনার কাঁচামাল বগুড়া ও ভারত থেকে আনা হয়। নিজেদের দক্ষতা ও পরিশ্রম দিয়ে কাজ করেন অধিকাংশ কারিগর। তবে, দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করে আয় হয় মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।

ভাকুর্তা গহনা সমিতির সভাপতি দুলাল রাজবংশী জানান, বিদেশি তৈরি নিুমানের ইমিটেশনের গহনার একচেটিয়া প্রবেশে, হাতে তৈরি গহনার বাজার নষ্ট করছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঋণ সুবিধা না থাকাও অনেক বড় একটা সমস্যা। আরও জানান, এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় আট হাজার কারিগর ও তাদের পরিবারকে বাঁচাতে হলে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শত বছরের এই পেশাজীবী কারিগরদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ শুরু করেছে বেসরকারি সংস্থা সোশ্যাল আপলিফটমেন্ট সোসাইটি (সাস)। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক হামিদা বেগম জানান, ভাকুর্তার জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের সমস্যা থেকে উত্তরণ ও এ ব্যাবসা প্রসারে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় ভাকুর্তায় সাসটেইনেবল এন্টারপ্রাইজ প্রজেক্টের আওতায় স্বাস্থ্যসম্মত ও কর্মবান্ধব ইমিটেশন জুয়েলারি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের মাধ্যমে উদ্যোক্তা ও কারিগরদের আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজাইন প্রচলনের মাধ্যমে পণ্যের মান উন্নয়ন, কারিগরি জ্ঞান ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা হচ্ছে। এলাকায় বিদ্যমান ভ্যালু চেইনের সমস্যা ও পরিবেশগত সমস্যা বিবেচনা করে আধুনিক মেশিনারিজ সুবিধাসহ কমনসার্ভিস সেন্টার স্থাপনে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করা হবে।

সাস বাস্তবায়নাধীন ইমিটেশন জুয়েলারি প্রকল্প পরিদর্শনে এসে পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. নমিতা হালদার এনডিসি বলেন, গহনা কারিগরদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করা হয়েছে। সভায় জুয়েলারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা প্রসারে পরামর্শের পাশাপাশি বিভিন্ন উৎসাহ দেওয়া হয়। পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করলে অতিদ্রুত তাদের দুঃখ লাঘব হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন