আমদানিতে বাড়ছে চাপ রপ্তানিতে সুবাতাস
jugantor
করোনার পর ঘুরে দাঁড়াচ্ছে অর্থনীতি
আমদানিতে বাড়ছে চাপ রপ্তানিতে সুবাতাস
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে গত তিন মাসে বাজারে ছাড়া হয়েছে ১৩০ কোটি ডলার * ব্যাংকে নগদ ডলার সর্বোচ্চ ৯০ টাকা, খোলাবাজারে ৯২-৯৩ টাকা * এক মাসে রেমিট্যান্স কমেছে ২০ শতাংশ

  হামিদ বিশ্বাস  

২০ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার সংক্রমণ কমায় বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ফলে সারা বিশ্বের মতো দেশেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে ব্যাপকভাবে। এতে অর্থনীতির চাহিদা বেড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি আয়। অন্যদিকে বিদেশে নতুন জনশক্তি রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। করোনার কারণে ফেরত আসা শ্রমিকরা বিদেশে যেতে না পারার কারণে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে। এতে ডলারের ওপর চাপ পড়েছে। টাকার বিপরীতে বেড়ে গেছে ডলারের দাম। বাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলারের জোগান বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, করোনার পর দীর্ঘ সময় কম আমদানির পর এখন বাড়তে শুরু করেছে। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের আগস্টে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৭৩ শতাংশ। অতীতে এক মাসে এত বেশি হারে আমদানি বাড়েনি। গত অর্থবছরের আগস্টে আমদানি ব্যয় কমেছিল সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪৬ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে কমেছিল ১৪ শতাংশ। করোনার কারণে ২০২০ সালের মার্চ থেকে অক্টোবর এবং চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত আমদানি ব্যয় কমেছিল। করোনার পর এখন বিশ্বে অর্থনীতির সব দুয়ার খুলে দেওয়ায় বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের চাহিদা বেড়ে গেছে। এজন্য রপ্তানির পণ্য তৈরি করতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এছাড়া শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির পরিমাণও বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায়ও আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এছাড়া করোনার কারণে প্রায় দেড় বছর আমদানি ব্যয় পরিশোধ স্থগিত থাকায় ওইসব দেনাও একসঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে। সরবরাহ ঋণ বা সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট ও বায়ার্স ক্রেডিটের মাধ্যমে আমদানি করা পণ্যের কিস্তিও এখন পরিশোধ করতে হচ্ছে। এসব মিলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, করোনার কারণে অনেক দিন আমদানি স্থবির ছিল। তারপর একটু ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিছু কিছু শিল্প ভালো করছে। এর মধ্যে বড় শিল্প যেমন ওষুধ, সিমেন্ট, স্টিল, টেক্সটাইল। এসব প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সে কারণে কাঁচামাল আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছে। এদের ব্যবসা ভালো হচ্ছে। এছাড়া ডলারের দাম বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার সরবরাহ করেও দাম কমাতে পারছে না। এ ক্ষেত্রে অনেকে মনে করতে পারে যে, ডলারের দাম আরও বেড়ে গেলে আমদানি খরচ আরও বেড়ে যেতে পারে। সে কারণে এখন আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার পেছনে ওভার ইনভয়েসিং বা আন্ডার ইনভয়েসিং হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এনবিআর এ কাজটি করতে পারে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, বিদেশের বাজার ও পর্যটন খুলে যাওয়ায় রপ্তানির চাহিদা বেড়েছে। ক্রেতাদের শোরুম খালি। এজন্য ক্রেতারা এখন জাহাজের পরিবর্তে বিমানে পণ্য পাঠানোর অনুরোধ করছেন। জাহাজে যেতে ১ থেকে ৩ মাস সময় লেগে যায়। বিমানে ৭ দিনের মধ্যে ক্রেতারা পণ্য পেয়ে যাচ্ছে। চাহিদার কারণে এখন কাঁচামাল আমদানি বাড়ছে। একই সঙ্গে অনেকে কারখানা সম্প্রসারণের কাজেও হাত দিয়েছেন। এসব মিলে আমদানি বেড়েছে।

সূত্র জানায়, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করায় পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। এজন্য বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিও বাড়ছে। গত সেপ্টেম্বরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৮ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই মাসে হয়েছিল সাড়ে ৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে হয়েছিল আড়াই শতাংশ। আগামীতে রপ্তানি আয় আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা বিশ্বে রপ্তানির পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। এজন্য উদ্যোক্তারা প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। রপ্তানি বৃদ্ধির কারণে ব্যাক টু ব্যাক এলসির আওতায় কাঁচামাল আমদানির পরিমাণ বেড়েছে।

গত অর্থবছরজুড়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছিল। চলতি অর্থবছরে টানা তিন মাস রেমিট্যান্স কমেছে। গত জুলাই-সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স কমেছে শূন্য দশমিক ১৯ শতাংশ। কেবল সেপ্টেম্বরে কমেছে ১৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ। গত অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে বেড়েছিল ৪৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই সেপ্টেম্বরে বেড়েছিল ৪৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। পুরো অর্থবছরে রেমিট্যান্স বেড়েছিল ৩৬ দশমিক ১০ শতাংশ। রেমিট্যান্সের বিপরীতে সরকারিভাবে ২ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো ব্যাংক আরও এক শতাংশ বাড়িয়ে ৩ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে। তবে অচিরেই প্রবাসীরা নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

সূত্র জানায়, করোনার পর বিদেশ ভ্রমণ ও চিকিৎসায় বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের হারও বেড়েছে। এসব কারণে সার্বিকভাবে বাজারে ডলারের চাহিদা বেড়েছে। এতে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকে ড্রাফট আকারে ডলার বিক্রি হচ্ছে ৮৫ থেকে ৮৬ টাকা করে। ব্যাংকে নগদ ডলার বিক্রি হচ্ছে ৮৯ থেকে ৯০ টাকা করে। এর মধ্যে মিডল্যান্ড ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক নগদ ডলার ৯০ টাকা করে বিক্রি করে। অগ্রণী ব্যাংক ৮৯ টাকা ৩০ পয়সা করে বিক্রি করছে। বিশেষ করে ভ্রমণ ও চিকিৎসা খাতে নগদ ডলারের চাহিদা বাড়ায় ব্যাংকে এর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এছাড়া হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে প্রচুর ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। এ কারণে বাজারে ডলারের চাহিদা বেড়েছে। খোলাবাজারে ডলারের দাম আরও বেশি। রোববার খোলাবাজারে প্রতি ডলারের দাম গড়ে ৯২ থেকে ৯৩ টাকা করে বিক্রি হয়েছে। কখনো কখনো এর দাম ৯৫ টাকায় উঠেছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। গত কয়েক মাসে শিপিং কস্ট বেড়েছে ৭৩ শতাংশ। এর বাইরে করোনার গতি কিছুটা কমায় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার গতিশীল হয়েছে। এছাড়া ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের শঙ্কাকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা ভালো নয়, পাশাপাশি দুঃসময়ে রেমিট্যান্স বাড়লেও সুসময়ে কমছে। এটাও আশঙ্কার একটি কারণ। এসব মিলে বাজারের ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে ডলারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে টাকার মান কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে রিজার্ভ ভালো হওয়াটা ইতিবাচক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, মূলত আগস্ট থেকেই আমদানির কারণে ডলারের চাহিদা বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বাজারে ডলারের জোগান বাড়িয়েছে। গত আগস্টে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ছেড়েছে ৩০ কোটি ৫০ লাখ ডলার। সেপ্টেম্বরে এর পরিমাণ দ্বিগুণ করে বাজারে ছাড়া হয়েছে ৬৪ কোটি ১০ লাখ ডলার। গত ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ছাড়া হয়েছে ৩৬ কোটি ডলার। আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত রিজার্ভ থেকে বাজারে ছাড়া হয়েছে ১৩০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি। শুধু চলতি অক্টোবরেই ৭০ কোটি ডলারের চাহিদার কথা ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) নিরাপদ মান অনুযায়ী একটি দেশের কমপক্ষে তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমান রিজার্ভ থাকতে হয়। সে হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ অনেক বেশি নিরাপদ।

প্রতি মাসে আমদানি ব্যয় মেটাতে গড়ে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলারের প্রয়োজন হয়। এ হিসাবে আলোচ্য রিজার্ভ দিয়ে ৯ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। ফলে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

করোনার পর ঘুরে দাঁড়াচ্ছে অর্থনীতি

আমদানিতে বাড়ছে চাপ রপ্তানিতে সুবাতাস

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে গত তিন মাসে বাজারে ছাড়া হয়েছে ১৩০ কোটি ডলার * ব্যাংকে নগদ ডলার সর্বোচ্চ ৯০ টাকা, খোলাবাজারে ৯২-৯৩ টাকা * এক মাসে রেমিট্যান্স কমেছে ২০ শতাংশ
 হামিদ বিশ্বাস 
২০ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার সংক্রমণ কমায় বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ফলে সারা বিশ্বের মতো দেশেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে ব্যাপকভাবে। এতে অর্থনীতির চাহিদা বেড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি আয়। অন্যদিকে বিদেশে নতুন জনশক্তি রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। করোনার কারণে ফেরত আসা শ্রমিকরা বিদেশে যেতে না পারার কারণে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে। এতে ডলারের ওপর চাপ পড়েছে। টাকার বিপরীতে বেড়ে গেছে ডলারের দাম। বাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলারের জোগান বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, করোনার পর দীর্ঘ সময় কম আমদানির পর এখন বাড়তে শুরু করেছে। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের আগস্টে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৭৩ শতাংশ। অতীতে এক মাসে এত বেশি হারে আমদানি বাড়েনি। গত অর্থবছরের আগস্টে আমদানি ব্যয় কমেছিল সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪৬ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে কমেছিল ১৪ শতাংশ। করোনার কারণে ২০২০ সালের মার্চ থেকে অক্টোবর এবং চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত আমদানি ব্যয় কমেছিল। করোনার পর এখন বিশ্বে অর্থনীতির সব দুয়ার খুলে দেওয়ায় বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের চাহিদা বেড়ে গেছে। এজন্য রপ্তানির পণ্য তৈরি করতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এছাড়া শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির পরিমাণও বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায়ও আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এছাড়া করোনার কারণে প্রায় দেড় বছর আমদানি ব্যয় পরিশোধ স্থগিত থাকায় ওইসব দেনাও একসঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে। সরবরাহ ঋণ বা সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট ও বায়ার্স ক্রেডিটের মাধ্যমে আমদানি করা পণ্যের কিস্তিও এখন পরিশোধ করতে হচ্ছে। এসব মিলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, করোনার কারণে অনেক দিন আমদানি স্থবির ছিল। তারপর একটু ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিছু কিছু শিল্প ভালো করছে। এর মধ্যে বড় শিল্প যেমন ওষুধ, সিমেন্ট, স্টিল, টেক্সটাইল। এসব প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সে কারণে কাঁচামাল আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছে। এদের ব্যবসা ভালো হচ্ছে। এছাড়া ডলারের দাম বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার সরবরাহ করেও দাম কমাতে পারছে না। এ ক্ষেত্রে অনেকে মনে করতে পারে যে, ডলারের দাম আরও বেড়ে গেলে আমদানি খরচ আরও বেড়ে যেতে পারে। সে কারণে এখন আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার পেছনে ওভার ইনভয়েসিং বা আন্ডার ইনভয়েসিং হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এনবিআর এ কাজটি করতে পারে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, বিদেশের বাজার ও পর্যটন খুলে যাওয়ায় রপ্তানির চাহিদা বেড়েছে। ক্রেতাদের শোরুম খালি। এজন্য ক্রেতারা এখন জাহাজের পরিবর্তে বিমানে পণ্য পাঠানোর অনুরোধ করছেন। জাহাজে যেতে ১ থেকে ৩ মাস সময় লেগে যায়। বিমানে ৭ দিনের মধ্যে ক্রেতারা পণ্য পেয়ে যাচ্ছে। চাহিদার কারণে এখন কাঁচামাল আমদানি বাড়ছে। একই সঙ্গে অনেকে কারখানা সম্প্রসারণের কাজেও হাত দিয়েছেন। এসব মিলে আমদানি বেড়েছে।

সূত্র জানায়, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করায় পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। এজন্য বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিও বাড়ছে। গত সেপ্টেম্বরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৮ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই মাসে হয়েছিল সাড়ে ৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে হয়েছিল আড়াই শতাংশ। আগামীতে রপ্তানি আয় আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা বিশ্বে রপ্তানির পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। এজন্য উদ্যোক্তারা প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। রপ্তানি বৃদ্ধির কারণে ব্যাক টু ব্যাক এলসির আওতায় কাঁচামাল আমদানির পরিমাণ বেড়েছে।

গত অর্থবছরজুড়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছিল। চলতি অর্থবছরে টানা তিন মাস রেমিট্যান্স কমেছে। গত জুলাই-সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স কমেছে শূন্য দশমিক ১৯ শতাংশ। কেবল সেপ্টেম্বরে কমেছে ১৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ। গত অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে বেড়েছিল ৪৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই সেপ্টেম্বরে বেড়েছিল ৪৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। পুরো অর্থবছরে রেমিট্যান্স বেড়েছিল ৩৬ দশমিক ১০ শতাংশ। রেমিট্যান্সের বিপরীতে সরকারিভাবে ২ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো ব্যাংক আরও এক শতাংশ বাড়িয়ে ৩ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে। তবে অচিরেই প্রবাসীরা নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

সূত্র জানায়, করোনার পর বিদেশ ভ্রমণ ও চিকিৎসায় বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের হারও বেড়েছে। এসব কারণে সার্বিকভাবে বাজারে ডলারের চাহিদা বেড়েছে। এতে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকে ড্রাফট আকারে ডলার বিক্রি হচ্ছে ৮৫ থেকে ৮৬ টাকা করে। ব্যাংকে নগদ ডলার বিক্রি হচ্ছে ৮৯ থেকে ৯০ টাকা করে। এর মধ্যে মিডল্যান্ড ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক নগদ ডলার ৯০ টাকা করে বিক্রি করে। অগ্রণী ব্যাংক ৮৯ টাকা ৩০ পয়সা করে বিক্রি করছে। বিশেষ করে ভ্রমণ ও চিকিৎসা খাতে নগদ ডলারের চাহিদা বাড়ায় ব্যাংকে এর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এছাড়া হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে প্রচুর ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। এ কারণে বাজারে ডলারের চাহিদা বেড়েছে। খোলাবাজারে ডলারের দাম আরও বেশি। রোববার খোলাবাজারে প্রতি ডলারের দাম গড়ে ৯২ থেকে ৯৩ টাকা করে বিক্রি হয়েছে। কখনো কখনো এর দাম ৯৫ টাকায় উঠেছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। গত কয়েক মাসে শিপিং কস্ট বেড়েছে ৭৩ শতাংশ। এর বাইরে করোনার গতি কিছুটা কমায় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার গতিশীল হয়েছে। এছাড়া ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের শঙ্কাকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা ভালো নয়, পাশাপাশি দুঃসময়ে রেমিট্যান্স বাড়লেও সুসময়ে কমছে। এটাও আশঙ্কার একটি কারণ। এসব মিলে বাজারের ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে ডলারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে টাকার মান কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে রিজার্ভ ভালো হওয়াটা ইতিবাচক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, মূলত আগস্ট থেকেই আমদানির কারণে ডলারের চাহিদা বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বাজারে ডলারের জোগান বাড়িয়েছে। গত আগস্টে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ছেড়েছে ৩০ কোটি ৫০ লাখ ডলার। সেপ্টেম্বরে এর পরিমাণ দ্বিগুণ করে বাজারে ছাড়া হয়েছে ৬৪ কোটি ১০ লাখ ডলার। গত ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ছাড়া হয়েছে ৩৬ কোটি ডলার। আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত রিজার্ভ থেকে বাজারে ছাড়া হয়েছে ১৩০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি। শুধু চলতি অক্টোবরেই ৭০ কোটি ডলারের চাহিদার কথা ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) নিরাপদ মান অনুযায়ী একটি দেশের কমপক্ষে তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমান রিজার্ভ থাকতে হয়। সে হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ অনেক বেশি নিরাপদ।

প্রতি মাসে আমদানি ব্যয় মেটাতে গড়ে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলারের প্রয়োজন হয়। এ হিসাবে আলোচ্য রিজার্ভ দিয়ে ৯ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। ফলে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন