কিশোর লাভলুর রোবোটিক্স হ্যান্ড আবিষ্কার
jugantor
কিশোর লাভলুর রোবোটিক্স হ্যান্ড আবিষ্কার

  আবু তালেব, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম)  

২৪ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কিশোর লাভলুর রোবোটিক্স হ্যান্ড আবিষ্কার

অবিকল সুস্থ মানুষের হাতের মতো নড়াচড়া করছে কব্জি থেকে শুরু করে আঙুলগুলো। ইচ্ছেমতো, যে কোনো দিকে ঘোরানো যাচ্ছে, করা যাচ্ছে মুষ্টিবদ্ধও।

এমন কি হাতে বোতল নিয়ে পানি খেতে মুখে তুলে দিচ্ছে। এটি আসল হাত কিংবা আঙুল নয়। এটি চট্টগ্রামের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ইলেকট্রনিক্স ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অধ্যয়নরত ১৯ বছর বয়সি জয় বড়ুয়া লাভলু নামের এক কিশোরের তৈরি করা ‘রোবোটিক্স হ্যান্ড বা রোবোটিক হাত’।

যা তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় সাড়া ফেলে দিয়েছে। মূলত অঙ্গহীন মানুষের সুবিধার্থে স্নায়ুতন্ত্রকে ব্যবহার করে এ রোবোটিক্স অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরি করছে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার ১১ নম্বর ফতেপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বড়ুয়া পাড়া এলাকার ভাড়া বাসায় বসবাসকারী ক্ষুদ্র ফার্নিচার ব্যবসায়ী রবি বড়ুয়ার সন্তান লাভলু। সম্ভবনাময় কিশোর লাভলু দুই ভাইয়ের মধ্যে কনিষ্ঠ।

সরেজমিনে শনিবার বেলা ১১টার দিকে লাভলুর ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা গেছে, চার কক্ষ বিশিষ্ট ঘরের একটি ছোট্ট কক্ষকে ল্যাব বানিয়ে আপন মনে কাজ করছে লাভলু। যন্ত্রপাতি রক্ষার জন্য জানালাটি বন্ধ থাকায় সে গরমে ঘামছে।

কখনো ল্যাপটপ থেকে কোড নিয়ে সেট করছে রোবোটিক্স হ্যান্ডে, আবার জোড়াতালি দেয়া হচ্ছে ক্যাবলগুলোতে। এভাবে সে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে রোবোটিক্স হ্যান্ড তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

স্নায়বিক আবেদনে সাড়া দিতে সক্ষম এমন রোবোটিক্স হ্যান্ড তথা কৃত্রিম হাত তৈরির গল্প বলতে গিয়ে জয় বড়ুয়া লাভলু জানিয়েছে, ২০১৭ সালের দিকে হাত তৈরির বিষয়টা তার মাথায় আসে। তখন এসএসসি শেষ করেছিল মাত্র। শুরুতে মা-বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ কিনেছে। অধিকাংশ যন্ত্রাংশ দেশে পাওয়া যায় না বলে চড়া দামে বিদেশ থেকে এনেছে। তার কৃত্রিম হাতের চারটা প্রজেক্ট আছে।

খুদে বিজ্ঞানী লাভলু বলেন, যারা বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটে কাজ করেন কিংবা বিভিন্ন লোহা ফ্যাক্টরিতে এবং নানারকম বিপজ্জনক কাজ করার সময় এ রোবোটিক্স ওয়্যারলেস হাত ব্যবহার করতে পারবেন, যেটা কন্ট্রোল করা হবে মানুষের হাতের সঙ্গে লাগানো একটি ট্রান্সমিটার হাতের সাহায্য।

এর ফলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে শ্রমিকরা তাদের হাতকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারবেন। এরমধ্যে যারা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার, তাদের জন্য এটা খুবই উপকারী হতে পারে। মাত্র ১৫ হাজার টাকা খরচ পড়েছে হাতটি তৈরি করতে।

তবে পরিবারে কিছুটা আর্থিক অনটন থাকায় ইচ্ছা থাকলেও এই কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না; এজন্য পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন।

এ ব্যাপারে তার পরিবারের সদস্যরা সব সময় তাকে উৎসাহ দেন, কাজে সহযোগিতা করেন বলে লাভলু জানায়। পাশাপাশি তার পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাশা সে একদিন বড় বিজ্ঞানী হবে। তাকে নিয়ে মা-বাবা কিছুটা উদ্বিগ্ন থাকতেন।

বিদ্যুতায়িত হয়ে কারও মারা যাওয়ার কথা শুনলেই তাকে ইলেকট্রিক্যাল সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন। এছাড়া আরেকটা মজার ব্যাপার হচ্ছে-প্রথমদিকে আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীরা বিদ্রূপ করতেন। এসব দিয়ে কী হবে, শুধু শুধু টাকা খরচ কেন। এখন তাদের বেশিরভাগই অনুপ্রেরণা দেন।

লাভলুর ইচ্ছা, ডিপ্লোমা শেষ করে ঢাকা প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢুয়েট) রোবোটিক্স সম্পর্কিত কোনো বিষয়ে পড়াশোনা করার।

ভবিষ্যতে সে একটি বড় রোবোটিক্স প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে, যেখানে নানারকম উন্নত প্রযুক্তি আর সব রোবোটিক্স বিষয়ে গবেষণা হবে এবং নতুন প্রজন্মকে সে সম্পর্কে ধারণা দেয়া হবে। সেই লক্ষ্যে লাভলু বাংলাদেশ রোবট সায়েন্স অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার নামে একটি অরগানাইজেশন চালু করে, সেখানে সে স্কুল শিক্ষার্থীদের নিয়ে রোবোটিক্স সম্পর্কে নানা রকম ধারণা দিচ্ছে।

লাভলুর গর্বিত মা-বাবা রবি বড়ুয়া ও রীনা বড়ুয়ার প্রত্যাশা লাভলু বড় হয়ে একদিন বিজ্ঞানী হবে। তারা ছেলের জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা চান।

হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. শাহিদুল আলম বলেন, যাদের হাত অথবা হাতের কব্জি নেই, তাদের জন্য এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

কিশোর লাভলুর রোবোটিক্স হ্যান্ড আবিষ্কার

 আবু তালেব, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) 
২৪ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
কিশোর লাভলুর রোবোটিক্স হ্যান্ড আবিষ্কার
ছবি: যুগান্তর

অবিকল সুস্থ মানুষের হাতের মতো নড়াচড়া করছে কব্জি থেকে শুরু করে আঙুলগুলো। ইচ্ছেমতো, যে কোনো দিকে ঘোরানো যাচ্ছে, করা যাচ্ছে মুষ্টিবদ্ধও।

এমন কি হাতে বোতল নিয়ে পানি খেতে মুখে তুলে দিচ্ছে। এটি আসল হাত কিংবা আঙুল নয়। এটি চট্টগ্রামের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ইলেকট্রনিক্স ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অধ্যয়নরত ১৯ বছর বয়সি জয় বড়ুয়া লাভলু নামের এক কিশোরের তৈরি করা ‘রোবোটিক্স হ্যান্ড বা রোবোটিক হাত’।

যা তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় সাড়া ফেলে দিয়েছে। মূলত অঙ্গহীন মানুষের সুবিধার্থে স্নায়ুতন্ত্রকে ব্যবহার করে এ রোবোটিক্স অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরি করছে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার ১১ নম্বর ফতেপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বড়ুয়া পাড়া এলাকার ভাড়া বাসায় বসবাসকারী ক্ষুদ্র ফার্নিচার ব্যবসায়ী রবি বড়ুয়ার সন্তান লাভলু। সম্ভবনাময় কিশোর লাভলু দুই ভাইয়ের মধ্যে কনিষ্ঠ।

সরেজমিনে শনিবার বেলা ১১টার দিকে লাভলুর ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা গেছে, চার কক্ষ বিশিষ্ট ঘরের একটি ছোট্ট কক্ষকে ল্যাব বানিয়ে আপন মনে কাজ করছে লাভলু। যন্ত্রপাতি রক্ষার জন্য জানালাটি বন্ধ থাকায় সে গরমে ঘামছে।

কখনো ল্যাপটপ থেকে কোড নিয়ে সেট করছে রোবোটিক্স হ্যান্ডে, আবার জোড়াতালি দেয়া হচ্ছে ক্যাবলগুলোতে। এভাবে সে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে রোবোটিক্স হ্যান্ড তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

স্নায়বিক আবেদনে সাড়া দিতে সক্ষম এমন রোবোটিক্স হ্যান্ড তথা কৃত্রিম হাত তৈরির গল্প বলতে গিয়ে জয় বড়ুয়া লাভলু জানিয়েছে, ২০১৭ সালের দিকে হাত তৈরির বিষয়টা তার মাথায় আসে। তখন এসএসসি শেষ করেছিল মাত্র। শুরুতে মা-বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ কিনেছে। অধিকাংশ যন্ত্রাংশ দেশে পাওয়া যায় না বলে চড়া দামে বিদেশ থেকে এনেছে। তার কৃত্রিম হাতের চারটা প্রজেক্ট আছে।

খুদে বিজ্ঞানী লাভলু বলেন, যারা বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটে কাজ করেন কিংবা বিভিন্ন লোহা ফ্যাক্টরিতে এবং নানারকম বিপজ্জনক কাজ করার সময় এ রোবোটিক্স ওয়্যারলেস হাত ব্যবহার করতে পারবেন, যেটা কন্ট্রোল করা হবে মানুষের হাতের সঙ্গে লাগানো একটি ট্রান্সমিটার হাতের সাহায্য।

এর ফলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে শ্রমিকরা তাদের হাতকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারবেন। এরমধ্যে যারা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার, তাদের জন্য এটা খুবই উপকারী হতে পারে। মাত্র ১৫ হাজার টাকা খরচ পড়েছে হাতটি তৈরি করতে।

তবে পরিবারে কিছুটা আর্থিক অনটন থাকায় ইচ্ছা থাকলেও এই কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না; এজন্য পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন।

এ ব্যাপারে তার পরিবারের সদস্যরা সব সময় তাকে উৎসাহ দেন, কাজে সহযোগিতা করেন বলে লাভলু জানায়। পাশাপাশি তার পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাশা সে একদিন বড় বিজ্ঞানী হবে। তাকে নিয়ে মা-বাবা কিছুটা উদ্বিগ্ন থাকতেন।

বিদ্যুতায়িত হয়ে কারও মারা যাওয়ার কথা শুনলেই তাকে ইলেকট্রিক্যাল সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন। এছাড়া আরেকটা মজার ব্যাপার হচ্ছে-প্রথমদিকে আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীরা বিদ্রূপ করতেন। এসব দিয়ে কী হবে, শুধু শুধু টাকা খরচ কেন। এখন তাদের বেশিরভাগই অনুপ্রেরণা দেন।

লাভলুর ইচ্ছা, ডিপ্লোমা শেষ করে ঢাকা প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢুয়েট) রোবোটিক্স সম্পর্কিত কোনো বিষয়ে পড়াশোনা করার।

ভবিষ্যতে সে একটি বড় রোবোটিক্স প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে, যেখানে নানারকম উন্নত প্রযুক্তি আর সব রোবোটিক্স বিষয়ে গবেষণা হবে এবং নতুন প্রজন্মকে সে সম্পর্কে ধারণা দেয়া হবে। সেই লক্ষ্যে লাভলু বাংলাদেশ রোবট সায়েন্স অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার নামে একটি অরগানাইজেশন চালু করে, সেখানে সে স্কুল শিক্ষার্থীদের নিয়ে রোবোটিক্স সম্পর্কে নানা রকম ধারণা দিচ্ছে।

লাভলুর গর্বিত মা-বাবা রবি বড়ুয়া ও রীনা বড়ুয়ার প্রত্যাশা লাভলু বড় হয়ে একদিন বিজ্ঞানী হবে। তারা ছেলের জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা চান।

হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. শাহিদুল আলম বলেন, যাদের হাত অথবা হাতের কব্জি নেই, তাদের জন্য এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন