শেষ দিনে ব্রিফিংয়ে দু’পক্ষের বিষোদগার

জঙ্গিবাদ ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নিয়ে দোষারোপ

  খুলনা ব্যুরো ১৪ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে প্রধান দু’দলের মেয়র প্রার্থী
খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে প্রধান দু’দলের মেয়র প্রার্থী

খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে প্রচারণার শেষ দিনেও প্রধান দু’দলের মেয়র প্রার্থীদের পক্ষ থেকে একে অন্যের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের অভিযোগ তোলেন।

বিএনপি মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু রোববার সকালে প্রতিদিনের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সরকারি দলের বিরুদ্ধে ভোটের আগের রাতে বোমাবাজি করে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং নেতাকর্মীদের ওপর আরও কঠিন আঘাত তথা তার ভাষায় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেকের প্রধান সমন্বয়কারী ও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এসএম কামাল হোসেন প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন যে, ‘নজরুল ইসলাম মঞ্জু নিজেই জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষক।

মঞ্জু সাধারণ জনগণকে হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন। ২০০১-০৬ সাল পর্যন্ত খুলনা ছিল সন্ত্রাসের জনপদ। আর ওই সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু।

গণগ্রেফতার ও পুলিশি হয়রানির প্রতিবাদে রোববার সকাল সাড়ে ৮টায় নগরীর মিয়াপাড়ায় নিজ বাসভবনে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, সরকার কেসিসির ভবিষ্যৎ নগর পিতা নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।

কেসিসি নির্বাচন সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি পরীক্ষা হলেও ইতিমধ্যেই তারা ফেল করেছে।

মেয়র প্রার্থী হিসেবে তিনি ভোট ডাকাতির আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল। জনগণ ও ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনাও ছিল।

কিন্তু সরকার একটি ভোট ডাকাতির নির্বাচনের আয়োজনে সবকিছুই ভেস্তে যেতে বসেছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের অতি উৎসাহী ভূমিকা এবং নির্বাচন কমিশনের নির্লিপ্ততা ভোট ডাকাতির নির্বাচনের আয়োজনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।’

নগরীর খালিশপুর, দৌলতপুর, টুটপাড়া, লবণচরা ও বানিয়াখামারসহ বিভিন্ন এলাকায় ভোট ডাকাতির আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই চরমপন্থী-সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীরা এসব এলাকায় মোটরসাইকেলে মহড়া দিচ্ছে। আগে থেকেই ব্যালট বাক্স ধরে রাখা, ভোটের আগের রাতে বোমাবাজি করে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং নেতাকর্মীর ওপর আরও কঠিন আঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যরা মহানায়কের ভূমিকা পালন করছেন। সরকার বিএনপিকে বাইরে রেখে এক দলীয় নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে নজরুল ইসলাম মঞ্জু কেসিসির শতভাগ ভোট কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনকে উদ্দেশ করে বলেন, এখনও সময় আছে ঘুরে দাঁড়ানোর। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে এখনই সব ভোট কেন্দ্রে সেনাবাহিনী এবং প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করুন।

তিনি বলেন, মেয়র প্রার্থী হিসেবে তিনি নিজেও শঙ্কামুক্ত নন। শনিবার রাতেও হাজার হাজার কর্মীর বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালিয়েছে।

নতুন করে আরও ১১ জনসহ দু’শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নির্বাচনী এজেন্ট এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির দায়িত্বশীল সিনিয়র নেতাদেরও গ্রেফতার করা হচ্ছে। এতে গোটা নগরীতে আতঙ্ক ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তিনি এবং তার দলের নেতাকর্মীরা গত ১০ দিনে ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘ধানের শীষের পোলিং এজেন্টদের ভয় দেখানো হচ্ছে। এখন মহিলা পুলিশকে বাড়ি বাড়ি পাঠিয়ে নেতাকর্মীদের পরিবারের নারী সদস্যদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। এজন্য সরকার, পুলিশ এবং নির্বাচন কমিশনকে জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। সাংবাদিকদের একটি অংশ আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারণায় নামায় তিনি ‘জাতির বিবেকদের কাছে এ ধরনের রাজনৈতিক পক্ষপাত কাক্সিক্ষত নয়’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

প্রেস ব্রিফিংয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-প্রচার সম্পাদক কৃষিবিদ শামীমুর রহমান শামীম, বিজেপির মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট লতিফুর রহমান লাবু, জেপি (জাফর) মহানগর সভাপতি মোস্তফা কামাল, জামায়াতের মহানগর শাখার সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শাহ আলম, নগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফকরুল আলম, খেলাফত মজলিসের মাওলানা নাসির উদ্দিন, মুসলীম লীগের অ্যাডভোকেট আক্তার জাহান রুকু, বিজেপির নগর সাধারণ সম্পাদক সিরাজউদ্দিন সেন্টুসহ দলীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেকের প্রধান সমন্বয়কারী ও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এসএম কামাল হোসেন বলেন, ‘বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু থেকে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছেন। মঞ্জুর নির্বাচনে একজন ব্যবসায়ী কালো টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।

বিভিন্ন বস্তিতে কালো টাকা ছড়িয়ে ভোট কেনার চেষ্টা ও অপপ্রচার করছেন।’ রোববার দুপুরে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ অভিযোগ করেন।

এসএম কামাল আরও বলেন, ‘বিএনপি প্রার্থী মঞ্জু সাধারণ জনগণকে হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন। ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত খুলনা ছিল সন্ত্রাসীর জনপদ। আর ওই সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এছাড়া কয়েকদিন আগে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে মেয়র প্রার্থী মঞ্জু নিজেকে জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষক বলে দাবি করেছেন। সম্প্রতি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মঞ্জু বলেন, আমার জঙ্গি চেহারা কেউ দেখেননি। আমি কি করতে পারি সে সম্পর্কে আপনাদের কোনো ধারণাই নেই।’

এসএম কামাল আরও বলেন, জামায়াত মানে জঙ্গি। আর জঙ্গি মানেই জামায়াত। যারা জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে জড়িত তাদের গ্রেফতার করা হোক।

নজরুল ইসলাম মঞ্জু জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষক। খুলনার মানুষ তালুকদার আবদুল খালেকের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। খুলনায় নৌকার গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। নৌকার এ গণজোয়ার দেখে মঞ্জু কেসিসি নির্বাচনে তার পরাজয়ের গ্লানি মেনে না নিতে পাগলের প্রলাপ বকছেন। তিনি তার ভাষায় সিটি নির্বাচনে জঙ্গিদের অপপ্রভাবের আশঙ্কা ব্যক্ত করেন।

গণমাধ্যম কর্মীদের প্রশ্নের উত্তরে কামাল বলেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সেনাবাহিনী মাঠে নামবে কি নামবে না- এটা নির্বাচন কমিশনের ব্যাপার।

এ ব্যাপারে সরকারের কোনো হাত নেই। প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও রাজশাহীর সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট শেখ হারুনুর রশীদ, নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক কাজি আমিনুল হক, অ্যাডভোকেট সুজিত অধিকারী, কামরুজ্জামান জামাল, অ্যাডভোকেট ফরিদ আহমেদ, মুন্সি মাহবুব আলম সোহাগ, অধ্যাপক মিজানুর রহমান মিজান প্রমুখ।

অপরদিকে মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেকের নৌকা প্রতীকের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে দুপুর ১টায় দলীয় কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করেছে সম্মিলিত নাগরিক সমাজ, খুলনা ও জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন নেতারা।

প্রেস ব্রিফিংয়ে সম্মিলিত নাগরিক সমাজ, খুলনার আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মো. সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক একজন যোগ্য, সৎ ও কর্মঠ লোক। তিনি মেয়র নির্বাচিত হলে খুলনার ব্যাপক উন্নয়ন হবে।

পাল্টে যাবে খুলনার চেহারা। তিনি বলেন, খুলনার সামগ্রিক উন্নয়নে তালুকদার আবদুল খালেকের বিকল্প নেই। খুলনার মানুষ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা চান। দলবাজি নয় খুলনাবাসীকে নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কালো টাকার ছড়াছড়ির অভিযোগ দু’দলের : ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি জানান, খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে ভোট কেনা ও সন্ত্রাসাী লালন-পালনে নগরীতে কালো টাকার ছড়াছড়ির অভিযোগ করেছে বড় দু’দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। দু’দলের নেতারা জানান, নগরীর সহস্রাধিক বস্তি, শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক, দিন-মজুর ও নিু আয়ের মানুষদের ভোট কেনার জন্য কালো টাকা ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা নগরীর কয়েকটি আবাসিক হোটেল ও বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে বড় অংকের টাকার লেনদেন করেছে বলে একটি সূত্রে জানা যায়। আজ (সোমবার) রাতে এ টাকা বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেয়া হতে পারে। এমন আশঙ্কা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ।

কালো টাকার ছড়াছড়ির বিষয়ে আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক বলেন, বিএনপির অনেক ব্যবসায়ী খুলনায় আছেন। তারা কালো টাকা ছড়াতে পারেন। আমরা বিষয়টি কড়াভাবে দেখছি। আমাদের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেয়া আছে। কালো টাকা পেলে তাদের টাকাসহ ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেয়ার নির্দেশ দেয়া রয়েছে।

অপরদিকে বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রচুর কালো টাকা নগরীতে এসেছে বলে খবর আছে।

বস্তিবাসী ও নিম্নবিত্ত মানুষকে ভোট কেনার জন্য কালো টাকার ব্যবহার করা হবে। সরকারি দল প্রশাসনকে হাত করতেও নানা কৌশল অবলম্বন করছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

দু’প্রার্থীর অভিযোগ সম্পর্কে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি সোনালী সেন যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের অভিযোগের তথ্য পাননি। তবে প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হয়েছে।

ঘটনাপ্রবাহ : খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter