মূলধন ঘাটতি ১৩ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা
jugantor
বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বিকেবি ও রাকাবের বৈঠক আজ
মূলধন ঘাটতি ১৩ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা
কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ * রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের খেলাপি ১৯.২৯ শতাংশ

  হামিদ বিশ্বাস  

২৩ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। বিপুল অঙ্কের এই ঘাটতি নিয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সরকারি বিশেষায়িত কৃষি ব্যাংক দুটি। অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার কারণে দুই ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ বাড়ছে। ঋণ আদায়ে নেই তেমন অগ্রগতি। খেলাপির কারণেই নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

একই সঙ্গে মূলধন সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বছরের পর বছর ধরে লোকসান গুনে আসছে অনেক শাখা। ব্যাংক দুটির আর্থিক প্রতিবেদন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। এ অবস্থায় আর্থিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় উভয় ব্যাংকের সঙ্গে আজ বৈঠক করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শিরীন আখতার যুগান্তরকে বলেন, এখন যে মূলধন ঘাটতি আছে, তা অনেক পুরোনো। ধীরে ধীরে সমাধানের চেষ্টা করছি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে বিশেষ আইনে প্রতিষ্ঠা করা হয় বিকেবি ও রাকাব। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে আসায় উভয় ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণ কাঙ্ক্ষিত হারে আদায় হচ্ছে না। ফলে খেলাপি ঋণ বেড়ে প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এতে লোকসান বৃদ্ধিসহ নানা সংকট দেখা দিয়েছে উভয় ব্যাংকে। মূলধন ঘাটতিতে পুরো ব্যাংক খাতের শীর্ষে আছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি)। এছাড়া খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রভিশন ঘাটতিও রয়েছে। দুর্যোগসহ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কৃষকদের সহায়তায় সরকারি সিদ্ধান্তে কৃষিঋণ ও সুদ মওকুফ করে বিকেবি। এতে কৃষক স্বস্তি পেলেও স্বস্তিতে নেই ব্যাংক। বড় অঙ্কের মূলধন ঘাটতিতে পড়ায় ব্যাংকটি এখন গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী ঋণ দিতে পারছে না। এছাড়া কৃষকদের অর্থায়নকারী ব্যাংক হলেও হঠাৎ করে ২০১০ সালে বিকেবি শিল্প খাতে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ শুরু করে। পোশাকশিল্প, কোল্ডস্টোরেজসহ আরও কিছু বড় শিল্পে ঋণ দেয়। এই ঋণের পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এসব ঋণ সময়মতো আদায় না হওয়ায় ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অনেক বেড়ে গেছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের বড় অংশই শিল্প খাতের।

সারা দেশে ব্যাংকটির শাখা রয়েছে ১০৩৮টি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বিকেবি ঋণ বিতরণ করেছে ২৫ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৪০৫ কোটি টাকা বা ৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ খেলাপি ঋণ। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ২১ কোটি টাকা। বিকেবির মূলধন ঘাটতি দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। জুন প্রান্তিকে বেশ কিছু ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মূলধন রাখায় ব্যাংক খাতে ১৫ হাজার ৩৫ কোটি টাকার উদ্বৃত্ত দেখা দিয়েছে। ওই সময়ে বিকেবির মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা।

এদিকে রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চলের কৃষকদের জন্য গঠিত হয় বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)। খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত ব্যাংকটির নড়বড়ে অবস্থা। আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় দেড় শতাধিক শাখা লোকসান গুনছে। ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাকাবের ৩৮৩টি শাখা আছে। এর মধ্যে শহরে ৫০টি আর পল্লী শাখা ৩৩৩টি। এসবের মধ্যে ১৫১টি শাখাই লোকসান দিচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা লাভের পর টানা চার বছর লোকসান গুনছে রাকাব। গেল ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫৮১ কোটি ৪১ লাখ টাকা আয় করে। এর বিপরীতে ব্যয় করে ৫৮৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ফলে লোকসান গুনতে হয় ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাকাবের বিতরণ করা ঋণের অঙ্ক ৬ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৯ দশমিক ২৯ শতাংশ বা এক হাজার ২১২ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি রয়েছে ১ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। জানতে চাইলে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ইসমাইল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, গত বছর খেলাপি ঋণ ছিল ২৯%, এবার তা ১৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। ধীরে ধীরে আরও উন্নতি হবে।

প্রসঙ্গত, ব্যাংকের আর্থিক সূচক ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে সরকারি ব্যাংকগুলো। এমওইউতে খেলাপি ঋণ আদায়, আয় বাড়ানোসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বিকেবি ও রাকাবের বৈঠক আজ

মূলধন ঘাটতি ১৩ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা

কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ * রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের খেলাপি ১৯.২৯ শতাংশ
 হামিদ বিশ্বাস 
২৩ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। বিপুল অঙ্কের এই ঘাটতি নিয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সরকারি বিশেষায়িত কৃষি ব্যাংক দুটি। অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার কারণে দুই ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ বাড়ছে। ঋণ আদায়ে নেই তেমন অগ্রগতি। খেলাপির কারণেই নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

একই সঙ্গে মূলধন সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বছরের পর বছর ধরে লোকসান গুনে আসছে অনেক শাখা। ব্যাংক দুটির আর্থিক প্রতিবেদন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। এ অবস্থায় আর্থিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় উভয় ব্যাংকের সঙ্গে আজ বৈঠক করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শিরীন আখতার যুগান্তরকে বলেন, এখন যে মূলধন ঘাটতি আছে, তা অনেক পুরোনো। ধীরে ধীরে সমাধানের চেষ্টা করছি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে বিশেষ আইনে প্রতিষ্ঠা করা হয় বিকেবি ও রাকাব। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে আসায় উভয় ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণ কাঙ্ক্ষিত হারে আদায় হচ্ছে না। ফলে খেলাপি ঋণ বেড়ে প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এতে লোকসান বৃদ্ধিসহ নানা সংকট দেখা দিয়েছে উভয় ব্যাংকে। মূলধন ঘাটতিতে পুরো ব্যাংক খাতের শীর্ষে আছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি)। এছাড়া খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রভিশন ঘাটতিও রয়েছে। দুর্যোগসহ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কৃষকদের সহায়তায় সরকারি সিদ্ধান্তে কৃষিঋণ ও সুদ মওকুফ করে বিকেবি। এতে কৃষক স্বস্তি পেলেও স্বস্তিতে নেই ব্যাংক। বড় অঙ্কের মূলধন ঘাটতিতে পড়ায় ব্যাংকটি এখন গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী ঋণ দিতে পারছে না। এছাড়া কৃষকদের অর্থায়নকারী ব্যাংক হলেও হঠাৎ করে ২০১০ সালে বিকেবি শিল্প খাতে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ শুরু করে। পোশাকশিল্প, কোল্ডস্টোরেজসহ আরও কিছু বড় শিল্পে ঋণ দেয়। এই ঋণের পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এসব ঋণ সময়মতো আদায় না হওয়ায় ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অনেক বেড়ে গেছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের বড় অংশই শিল্প খাতের।

সারা দেশে ব্যাংকটির শাখা রয়েছে ১০৩৮টি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বিকেবি ঋণ বিতরণ করেছে ২৫ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৪০৫ কোটি টাকা বা ৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ খেলাপি ঋণ। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ২১ কোটি টাকা। বিকেবির মূলধন ঘাটতি দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। জুন প্রান্তিকে বেশ কিছু ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মূলধন রাখায় ব্যাংক খাতে ১৫ হাজার ৩৫ কোটি টাকার উদ্বৃত্ত দেখা দিয়েছে। ওই সময়ে বিকেবির মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা।

এদিকে রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চলের কৃষকদের জন্য গঠিত হয় বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)। খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত ব্যাংকটির নড়বড়ে অবস্থা। আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় দেড় শতাধিক শাখা লোকসান গুনছে। ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাকাবের ৩৮৩টি শাখা আছে। এর মধ্যে শহরে ৫০টি আর পল্লী শাখা ৩৩৩টি। এসবের মধ্যে ১৫১টি শাখাই লোকসান দিচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা লাভের পর টানা চার বছর লোকসান গুনছে রাকাব। গেল ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫৮১ কোটি ৪১ লাখ টাকা আয় করে। এর বিপরীতে ব্যয় করে ৫৮৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ফলে লোকসান গুনতে হয় ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাকাবের বিতরণ করা ঋণের অঙ্ক ৬ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৯ দশমিক ২৯ শতাংশ বা এক হাজার ২১২ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি রয়েছে ১ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। জানতে চাইলে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ইসমাইল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, গত বছর খেলাপি ঋণ ছিল ২৯%, এবার তা ১৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। ধীরে ধীরে আরও উন্নতি হবে।

প্রসঙ্গত, ব্যাংকের আর্থিক সূচক ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে সরকারি ব্যাংকগুলো। এমওইউতে খেলাপি ঋণ আদায়, আয় বাড়ানোসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন নেই।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন