রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া এখন আতঙ্কের নগরী
jugantor
নির্বাচনে পরাজয়ের প্রতিশোধ
রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া এখন আতঙ্কের নগরী

  রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি  

০২ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সদস্য (মেম্বর) পদে একজন প্রার্থী পরাজিত হওয়ায় এলাকায় সন্ত্রাসের রামরাজত্ব কায়েম হয়ে গেছে। হামলা, পালটা হামলা, এমনকি প্রতিপক্ষের বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলেও কার্যত কাজ হচ্ছে না। বসানো হয়েছে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প। কিন্তু টানা ২০ দিন ধরে সংঘাত-সহিংসতা অব্যাহত আছে। বহিরাগত সন্ত্রাসীরাও যুক্ত হয়েছে।

ঘটনাস্থল রাজধানীর সন্নিকটে রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নাওড়া গ্রাম। সন্ত্রাসী হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। নির্বাচন পরবর্তী এ ধরনের অব্যাহত সহিংসতার ঘটনায় জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন এলাকার সাধারণ মানুষ। ভুক্তভোগীদের অনেকে গ্রেপ্তার ও হামলার ভয়ে ঘরছাড়া হয়েছেন।

১১ নভেম্বর কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানকার ১নং ওয়ার্ড থেকে ইউপি সদস্য পদে নির্বাচন করে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন রূপগঞ্জের মোশারফ। যিনি এলাকায় চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং মোশা বাহিনীর প্রধান হিসাবে বেশি পরিচিত। তবে নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। পরাজয়ের বদলা নিতে গ্রামে একের পর এক তাণ্ডব চালাচ্ছেন।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (গ-অঞ্চল) আবির হোসেন বলেন, ‘নাওড়া গ্রামের শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার স্বার্থে পুলিশ, র‌্যাব এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাত-দিন কাজ করছে। প্রতিটি ঘটনায় মামলা রুজু হয়েছে। নাওড়ায় একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্পও স্থাপন করেছি। আমরা সংঘাত থামানোর সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা যুগান্তরকে জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গাজী গোলাম দস্তগীর (বীরপ্রতীক) সরাসরি মোশারফের পক্ষ নেওয়ায় তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। গত ২০ দিন ধরে টানা সংঘাত-সংঘর্ষ চলছে কায়েতপাড়ার নাওড়া গ্রামে। গ্রামবাসীও মোশারফের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছেন সর্বাত্মক প্রতিরোধ। সবশেষ মঙ্গলবার রাতে মোশা বাহিনীর সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয় গ্রামবাসীর। এ সময় মোশা বাহিনীর দুটি বাড়িসহ গ্রামের আরও ৪টি বাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। মোশা বাহিনীর হামলায় আহত হন অন্তত ১২ জন। এসব ঘটনা পরিদর্শনে বুধবার সকালে ঘটনাস্থলে যান বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। এ সময় তিনি সরাসরি মোশারফ এবং তার পালিত লোকজনের ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়িঘর পরিদর্শন করে ক্ষতিপূরণ দেন। তবে গ্রামের অনেকে অনুরোধ করলেও তিনি মোশারফের প্রতিপক্ষ গ্রুপের যারা হামলা ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের বাড়িঘর পরিদর্শন করেননি। অভিযোগ উঠেছে, রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের অনুসারীরা মোশারফের প্রতিপক্ষ গ্রুপ হওয়ায় মন্ত্রী তাদের খোঁজখবর নেওয়া ও সহায়তা দিতে যাননি। মন্ত্রীর এমন আচরণে ভুক্তভোগী পরিবার এবং এলাকার সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

এলাকাবাসী জানান, রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ দুই ধারায় বিভক্ত। এর পক্ষে মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী এবং তার ছেলে গাজী গোলাম মর্তুজা পাপ্পা এবং অন্য পক্ষের নেতৃত্ব দেন রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম। কিন্তু রফিকুল ইসলামকে কোণঠাসা করতে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। এজন্য মন্ত্রীর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ইন্ধন রয়েছে বলে অনেকে দাবি করেন। অবশ্য বিপরীত দিকে অভিযোগের তীর এলাকার মিজানুর রহমানের দিকে। যার নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী গ্রুপও রয়েছে। যাকে সমর্থন দিয়ে আসছেন রফিকুল ইসলাম। তবে এলাকার সচেতন সাধারণ মানুষ মনে করেন, সৃষ্ট সংকট নিরসনে সরকারি দলের উচ্চ পর্যায় থেকে একটা সম্মানজনক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী এই বিরোধ সহসা বন্ধ হবে না। এ বিষয়ে তারা সংশ্লিষ্ট মহলের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এদিকে কার্যকর কোনো সমাধান না হওয়ায় গত ২০ দিনেও থামেনি কায়েতপাড়ার নাওড়া গ্রামের সংঘাত। এলাকাটি রীতিমতো এখন আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে। ভয়ে অন্য এলাকার লোকজনও বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া যাচ্ছেন না। হামলা ও গ্রেফতার আতঙ্কে অনেকে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

নির্বাচনে পরাজয়ের প্রতিশোধ

রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া এখন আতঙ্কের নগরী

 রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি 
০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সদস্য (মেম্বর) পদে একজন প্রার্থী পরাজিত হওয়ায় এলাকায় সন্ত্রাসের রামরাজত্ব কায়েম হয়ে গেছে। হামলা, পালটা হামলা, এমনকি প্রতিপক্ষের বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলেও কার্যত কাজ হচ্ছে না। বসানো হয়েছে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প। কিন্তু টানা ২০ দিন ধরে সংঘাত-সহিংসতা অব্যাহত আছে। বহিরাগত সন্ত্রাসীরাও যুক্ত হয়েছে।

ঘটনাস্থল রাজধানীর সন্নিকটে রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নাওড়া গ্রাম। সন্ত্রাসী হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। নির্বাচন পরবর্তী এ ধরনের অব্যাহত সহিংসতার ঘটনায় জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন এলাকার সাধারণ মানুষ। ভুক্তভোগীদের অনেকে গ্রেপ্তার ও হামলার ভয়ে ঘরছাড়া হয়েছেন।

১১ নভেম্বর কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানকার ১নং ওয়ার্ড থেকে ইউপি সদস্য পদে নির্বাচন করে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন রূপগঞ্জের মোশারফ। যিনি এলাকায় চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং মোশা বাহিনীর প্রধান হিসাবে বেশি পরিচিত। তবে নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। পরাজয়ের বদলা নিতে গ্রামে একের পর এক তাণ্ডব চালাচ্ছেন।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (গ-অঞ্চল) আবির হোসেন বলেন, ‘নাওড়া গ্রামের শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার স্বার্থে পুলিশ, র‌্যাব এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাত-দিন কাজ করছে। প্রতিটি ঘটনায় মামলা রুজু হয়েছে। নাওড়ায় একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্পও স্থাপন করেছি। আমরা সংঘাত থামানোর সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা যুগান্তরকে জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গাজী গোলাম দস্তগীর (বীরপ্রতীক) সরাসরি মোশারফের পক্ষ নেওয়ায় তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। গত ২০ দিন ধরে টানা সংঘাত-সংঘর্ষ চলছে কায়েতপাড়ার নাওড়া গ্রামে। গ্রামবাসীও মোশারফের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছেন সর্বাত্মক প্রতিরোধ। সবশেষ মঙ্গলবার রাতে মোশা বাহিনীর সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয় গ্রামবাসীর। এ সময় মোশা বাহিনীর দুটি বাড়িসহ গ্রামের আরও ৪টি বাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। মোশা বাহিনীর হামলায় আহত হন অন্তত ১২ জন। এসব ঘটনা পরিদর্শনে বুধবার সকালে ঘটনাস্থলে যান বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। এ সময় তিনি সরাসরি মোশারফ এবং তার পালিত লোকজনের ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়িঘর পরিদর্শন করে ক্ষতিপূরণ দেন। তবে গ্রামের অনেকে অনুরোধ করলেও তিনি মোশারফের প্রতিপক্ষ গ্রুপের যারা হামলা ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের বাড়িঘর পরিদর্শন করেননি। অভিযোগ উঠেছে, রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের অনুসারীরা মোশারফের প্রতিপক্ষ গ্রুপ হওয়ায় মন্ত্রী তাদের খোঁজখবর নেওয়া ও সহায়তা দিতে যাননি। মন্ত্রীর এমন আচরণে ভুক্তভোগী পরিবার এবং এলাকার সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

এলাকাবাসী জানান, রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ দুই ধারায় বিভক্ত। এর পক্ষে মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী এবং তার ছেলে গাজী গোলাম মর্তুজা পাপ্পা এবং অন্য পক্ষের নেতৃত্ব দেন রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম। কিন্তু রফিকুল ইসলামকে কোণঠাসা করতে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। এজন্য মন্ত্রীর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ইন্ধন রয়েছে বলে অনেকে দাবি করেন। অবশ্য বিপরীত দিকে অভিযোগের তীর এলাকার মিজানুর রহমানের দিকে। যার নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী গ্রুপও রয়েছে। যাকে সমর্থন দিয়ে আসছেন রফিকুল ইসলাম। তবে এলাকার সচেতন সাধারণ মানুষ মনে করেন, সৃষ্ট সংকট নিরসনে সরকারি দলের উচ্চ পর্যায় থেকে একটা সম্মানজনক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী এই বিরোধ সহসা বন্ধ হবে না। এ বিষয়ে তারা সংশ্লিষ্ট মহলের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এদিকে কার্যকর কোনো সমাধান না হওয়ায় গত ২০ দিনেও থামেনি কায়েতপাড়ার নাওড়া গ্রামের সংঘাত। এলাকাটি রীতিমতো এখন আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে। ভয়ে অন্য এলাকার লোকজনও বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া যাচ্ছেন না। হামলা ও গ্রেফতার আতঙ্কে অনেকে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন