এক যুগ পর চট্টগ্রাম থেকে বরিশালে জাহাজ
jugantor
এক যুগ পর চট্টগ্রাম থেকে বরিশালে জাহাজ

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল  

০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বরিশালের মানুষের কাছে শুক্রবারের ভোরটা ছিল একটু অন্যরকম। প্রায় এক যুগের প্রতীক্ষার পর এদিন সকালে চট্টগ্রাম থেকে বরিশালে আসে বিআইডব্লিউটিসির যাত্রীবাহী জাহাজ ‘এমভি তাজউদ্দিন’। এ জাহাজ আসায় এখানকার সাধারণ মানুষসহ ব্যবসায়ী নেতারা নতুন সম্ভাবনার আলো দেখছেন। যদিও এটি চট্টগ্রাম-বরিশাল রুটে যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল শুরুর পরীক্ষামূলক যাত্রা।

এ যাত্রায় এমভি তাজউদ্দিনকে নানা জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এরপরও বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ নতুন আশায় বুক বাঁধছেন। এ সার্ভিস চালু হলে যাত্রাপথের ঝক্কি আর দুর্ভোগ এড়িয়ে সহজে বরিশাল থেকে চট্টগ্রামে যেতে পারবেন দক্ষিণাঞ্চলের ১১ জেলার মানুষ। একইসঙ্গে পণ্য পরিবহণের জটিলতারও লাঘব হবে। বিআইডব্লিউটিএ ও টিসির কর্মকর্তারা বলছেন, পরীক্ষামূলক যাত্রার নানাদিক বিশ্লেষণ করে জাহাজ চলাচলের সময়সূচি ও ভাড়া নির্ধারণ করা হবে। সবকিছু চূড়ান্ত করে বরিশাল-চট্টগ্রাম রুটে নিয়মিত জাহাজ চলাচল এ মাসেই শুরু হবে বলে তারা আশা করছেন।

জানা যায়, ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শিপিং করপোরেশন পশ্চিম জার্মানি থেকে সংগ্রহ করা চারটি জাহাজের মাধ্যমে বরিশাল-নারায়ণগঞ্জ-চট্টগ্রাম রুটে উপকূলীয় সার্ভিস চালু করে। পরে অবশ্য এটি চট্টগ্রাম-হাতিয়া-সন্দ্বীপ-বরিশাল রুটে চলাচল করত। ৪৬ বছর আগে পশ্চিম জার্মানি থেকে সংগ্রহ করা চারটি জাহাজ দিয়ে চলেছে সার্ভিস। পুরনো জাহাজের নানা জটিলতা আর জাহাজ সংকটে ২০১০ সালে জনপ্রিয় রুটটি বন্ধ হয়ে যায়। সার্ভিসটি টিকিয়ে রাখতে নতুন জাহাজ কেনারও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

চট্টগ্রাম-বরিশাল জাহাজ সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামে যাওয়ার ক্ষেত্রে চরম বিপাকে পড়েন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। ঢাকা অথবা চাঁদপুর হয়ে চট্টগ্রাম যেতে সময় লাগছে দেড় থেকে দু’দিন। শরীয়তপুরের হরিণা এবং ভোলার ইলিশা ফেরি পার হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও লাগছে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা সময়। এছাড়া বারবার যানবাহন বদল করায় মানুষকে দুর্ভোগও পোহাতে হয়।

টিসির কর্মকর্তারা শুরু থেকে বলে আসছেন- চট্টগ্রাম থেকে বরিশালে ১২ ঘণ্টায় জাহাজ আসবে। কিন্তু প্রস্তুতিমূলক যাত্রায় বিপত্তি দেখা দেয়। বৃহস্পতিবার সকালে সাড়ে ৯টায় চট্টগ্রাম থেকে ছাড়ার প্রায় ২০ ঘণ্টা পর শুক্রবার ভোর ৫ টায় বরিশালে পৌঁছে জাহাজ। এ জাহাজে বরিশালে আসেন টিসির চট্টগ্রাম অফিসের ডিজিএম গোপাল মজুমদার। তার সঙ্গে ছিলেন টিএ ও টিসির বাণিজ্য, মেরিন ও প্রকৌশল শাখার কর্মকর্তারা। বিলম্ব হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে গোপাল মজুমদার বলেন, হাতিয়া ঘাটে যাত্রী ওঠানামায় দেরি হয়েছে। এছাড়া ভোলার ইলিশা ঘাটের ভাটিতে চর গজারিয়ার মেঘনায় নাব্য সংকটে দুই দফায় প্রায় ৪ ঘণ্টা জাহাজ নোঙ্গর করে রাখতে হয়েছে। ৪০ মিনিট পর চট্টগ্রাম থেকে জাহাজ ছাড়ে। এসব বিষয় হিসাব করলে পৌনে ৩শ কিলোমিটার পথ পেরুতে জাহাজের সময় লেগেছে ১৪ ঘণ্টার সামান্য বেশি। ১২ ঘণ্টায় পাড়ি দেওয়ার কথা, সেখানে ২ ঘণ্টা বেশি লাগার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি ছিল ট্রায়াল রান। প্রথম যাত্রায় ক্যাপ্টেনসহ অন্যসব ক্র খুব সাবধানে জাহাজ চালিয়েছেন। এছাড়া আমরা কোনো তাড়াহুড়ো করিনি। পথের নানা সমস্যা ও সুবিধা-অসুবিধার বিষয়গুলোর দিকেও খেয়াল রাখতে হয়েছে আমাদের। যাতে পূর্ণমাত্রায় সার্ভিসটি শুরু হলে যাত্রীদের কোনো রকম জটিলতা না হয়।

অবশ্য জাহাজে থাকা কয়েকজনের কাছ থেকে ভিন্ন খবর অবশ্য মিলেছে। চট্টগ্রাম থেকে ৬৫০ যাত্রী জাহাজে উঠলেও তাদের সিংহভাগই নেমে যায় হাতিয়া ঘাটে। এ ঘাটে জাহাজ ভেড়ানোর কোনো উপায় নেই। তীর থেকে বেশ খানিকটা দূরে নোঙ্গর করে জাহাজ। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় যাত্রী ওঠানামা করা হয়। এ ঘাটে আড়াই ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে। এছাড়া ১৯৭ ফুট দীর্ঘ ও ৩৯ দশমিক ৩৬ ফিট দৈর্ঘ্যরে সমুদ্রগামী জাহাজ এমভি তাজউদ্দিনের ইঞ্জিনের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নৌপথে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৮ দশমিক ৫২ কিলোমিটার গতিতে চলার সক্ষমতা রয়েছে তাজউদ্দিনের। যদিও সর্বোচ্চ গতিতে সার্বক্ষণিকভাবে জাহাজ চালানো সম্ভব নয়। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ঘাট থেকে ছাড়ার কিছুক্ষণ পরই সমুদ্রে নামে জাহাজ। এরপর থেকে ভোলার মেঘনা মোহনায় পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত পুরোটাই সমুদ্র পথ।

বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) আশিকুজ্জামান বলেন, মাত্র তো জাহাজ ট্রায়াল রানে গেল। শুক্রবার রাত ১০টায় এটির আবার বরিশাল থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে আসার কথা। রাউন্ড ট্রিপ শেষ হওয়ার পর জাহাজে থাকা টিএ-টিসির কর্মকর্তারা প্রতিবেদন দেবেন। তাদের সেই প্রতিবেদন বিশ্লেষণের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আশা করছি চলতি মাসেই এ রুটে যাত্রী পরিবহণ শুরু করতে পারব।

বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, সার্ভিসটি চালু হলে পর্যটকরাও সমুদ্র যাত্রায় যাবেন। এছাড়া সড়কপথে পণ্য পরিবহণে বর্তমানে যে দুর্ভোগ ও অতিরিক্ত ব্যয় সেটিও লাঘব হবে। এ সার্ভিসের জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।

এক যুগ পর চট্টগ্রাম থেকে বরিশালে জাহাজ

 আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল 
০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বরিশালের মানুষের কাছে শুক্রবারের ভোরটা ছিল একটু অন্যরকম। প্রায় এক যুগের প্রতীক্ষার পর এদিন সকালে চট্টগ্রাম থেকে বরিশালে আসে বিআইডব্লিউটিসির যাত্রীবাহী জাহাজ ‘এমভি তাজউদ্দিন’। এ জাহাজ আসায় এখানকার সাধারণ মানুষসহ ব্যবসায়ী নেতারা নতুন সম্ভাবনার আলো দেখছেন। যদিও এটি চট্টগ্রাম-বরিশাল রুটে যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল শুরুর পরীক্ষামূলক যাত্রা।

এ যাত্রায় এমভি তাজউদ্দিনকে নানা জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এরপরও বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ নতুন আশায় বুক বাঁধছেন। এ সার্ভিস চালু হলে যাত্রাপথের ঝক্কি আর দুর্ভোগ এড়িয়ে সহজে বরিশাল থেকে চট্টগ্রামে যেতে পারবেন দক্ষিণাঞ্চলের ১১ জেলার মানুষ। একইসঙ্গে পণ্য পরিবহণের জটিলতারও লাঘব হবে। বিআইডব্লিউটিএ ও টিসির কর্মকর্তারা বলছেন, পরীক্ষামূলক যাত্রার নানাদিক বিশ্লেষণ করে জাহাজ চলাচলের সময়সূচি ও ভাড়া নির্ধারণ করা হবে। সবকিছু চূড়ান্ত করে বরিশাল-চট্টগ্রাম রুটে নিয়মিত জাহাজ চলাচল এ মাসেই শুরু হবে বলে তারা আশা করছেন।

জানা যায়, ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শিপিং করপোরেশন পশ্চিম জার্মানি থেকে সংগ্রহ করা চারটি জাহাজের মাধ্যমে বরিশাল-নারায়ণগঞ্জ-চট্টগ্রাম রুটে উপকূলীয় সার্ভিস চালু করে। পরে অবশ্য এটি চট্টগ্রাম-হাতিয়া-সন্দ্বীপ-বরিশাল রুটে চলাচল করত। ৪৬ বছর আগে পশ্চিম জার্মানি থেকে সংগ্রহ করা চারটি জাহাজ দিয়ে চলেছে সার্ভিস। পুরনো জাহাজের নানা জটিলতা আর জাহাজ সংকটে ২০১০ সালে জনপ্রিয় রুটটি বন্ধ হয়ে যায়। সার্ভিসটি টিকিয়ে রাখতে নতুন জাহাজ কেনারও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

চট্টগ্রাম-বরিশাল জাহাজ সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামে যাওয়ার ক্ষেত্রে চরম বিপাকে পড়েন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। ঢাকা অথবা চাঁদপুর হয়ে চট্টগ্রাম যেতে সময় লাগছে দেড় থেকে দু’দিন। শরীয়তপুরের হরিণা এবং ভোলার ইলিশা ফেরি পার হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও লাগছে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা সময়। এছাড়া বারবার যানবাহন বদল করায় মানুষকে দুর্ভোগও পোহাতে হয়।

টিসির কর্মকর্তারা শুরু থেকে বলে আসছেন- চট্টগ্রাম থেকে বরিশালে ১২ ঘণ্টায় জাহাজ আসবে। কিন্তু প্রস্তুতিমূলক যাত্রায় বিপত্তি দেখা দেয়। বৃহস্পতিবার সকালে সাড়ে ৯টায় চট্টগ্রাম থেকে ছাড়ার প্রায় ২০ ঘণ্টা পর শুক্রবার ভোর ৫ টায় বরিশালে পৌঁছে জাহাজ। এ জাহাজে বরিশালে আসেন টিসির চট্টগ্রাম অফিসের ডিজিএম গোপাল মজুমদার। তার সঙ্গে ছিলেন টিএ ও টিসির বাণিজ্য, মেরিন ও প্রকৌশল শাখার কর্মকর্তারা। বিলম্ব হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে গোপাল মজুমদার বলেন, হাতিয়া ঘাটে যাত্রী ওঠানামায় দেরি হয়েছে। এছাড়া ভোলার ইলিশা ঘাটের ভাটিতে চর গজারিয়ার মেঘনায় নাব্য সংকটে দুই দফায় প্রায় ৪ ঘণ্টা জাহাজ নোঙ্গর করে রাখতে হয়েছে। ৪০ মিনিট পর চট্টগ্রাম থেকে জাহাজ ছাড়ে। এসব বিষয় হিসাব করলে পৌনে ৩শ কিলোমিটার পথ পেরুতে জাহাজের সময় লেগেছে ১৪ ঘণ্টার সামান্য বেশি। ১২ ঘণ্টায় পাড়ি দেওয়ার কথা, সেখানে ২ ঘণ্টা বেশি লাগার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি ছিল ট্রায়াল রান। প্রথম যাত্রায় ক্যাপ্টেনসহ অন্যসব ক্র খুব সাবধানে জাহাজ চালিয়েছেন। এছাড়া আমরা কোনো তাড়াহুড়ো করিনি। পথের নানা সমস্যা ও সুবিধা-অসুবিধার বিষয়গুলোর দিকেও খেয়াল রাখতে হয়েছে আমাদের। যাতে পূর্ণমাত্রায় সার্ভিসটি শুরু হলে যাত্রীদের কোনো রকম জটিলতা না হয়।

অবশ্য জাহাজে থাকা কয়েকজনের কাছ থেকে ভিন্ন খবর অবশ্য মিলেছে। চট্টগ্রাম থেকে ৬৫০ যাত্রী জাহাজে উঠলেও তাদের সিংহভাগই নেমে যায় হাতিয়া ঘাটে। এ ঘাটে জাহাজ ভেড়ানোর কোনো উপায় নেই। তীর থেকে বেশ খানিকটা দূরে নোঙ্গর করে জাহাজ। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় যাত্রী ওঠানামা করা হয়। এ ঘাটে আড়াই ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে। এছাড়া ১৯৭ ফুট দীর্ঘ ও ৩৯ দশমিক ৩৬ ফিট দৈর্ঘ্যরে সমুদ্রগামী জাহাজ এমভি তাজউদ্দিনের ইঞ্জিনের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নৌপথে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৮ দশমিক ৫২ কিলোমিটার গতিতে চলার সক্ষমতা রয়েছে তাজউদ্দিনের। যদিও সর্বোচ্চ গতিতে সার্বক্ষণিকভাবে জাহাজ চালানো সম্ভব নয়। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ঘাট থেকে ছাড়ার কিছুক্ষণ পরই সমুদ্রে নামে জাহাজ। এরপর থেকে ভোলার মেঘনা মোহনায় পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত পুরোটাই সমুদ্র পথ।

বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) আশিকুজ্জামান বলেন, মাত্র তো জাহাজ ট্রায়াল রানে গেল। শুক্রবার রাত ১০টায় এটির আবার বরিশাল থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে আসার কথা। রাউন্ড ট্রিপ শেষ হওয়ার পর জাহাজে থাকা টিএ-টিসির কর্মকর্তারা প্রতিবেদন দেবেন। তাদের সেই প্রতিবেদন বিশ্লেষণের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আশা করছি চলতি মাসেই এ রুটে যাত্রী পরিবহণ শুরু করতে পারব।

বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, সার্ভিসটি চালু হলে পর্যটকরাও সমুদ্র যাত্রায় যাবেন। এছাড়া সড়কপথে পণ্য পরিবহণে বর্তমানে যে দুর্ভোগ ও অতিরিক্ত ব্যয় সেটিও লাঘব হবে। এ সার্ভিসের জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন