অর্থ আর রক্ত সংগ্রহের অভাব

চিকিৎসা না নিয়েই ফিরছে ৭০ শতাংশ শিশু

আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে : চিকিৎসক মাত্র ২২ জন * সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন ক্যান্সারে মেয়েহারা এক ডাক্তার

  শিপন হাবীব ১৯ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থ আর রক্ত সংগ্রহের অভাব
ঢামেক হাসপাতালে ক্যান্সার আক্রান্ত শিমুকে দেখছেন ডাক্তার ছবি: যুগান্তর

ডা. মুহম্মদ সাখাওয়াত হোসেন ও ডা. আজমেরী জামান দম্পতি এখন বড়ই একা। ২০১৫ সালের ৫ ডিসেম্বর একমাত্র মেয়ে মায়িশা মাহজাবীন (৯) ক্যান্সারে মারা গেছে।

অনেক চিকিৎসার পরও মারণব্যাধি ক্যান্সার তাদের মেয়েকে বাঁচতে দেয়নি। হারানো মেয়ের স্মৃতি নিয়ে তারা এখন ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। দেশ-বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় মূল্যবান ওষুধ কিনে দিচ্ছেন। কন্যাকে যেন খোঁজে পাচ্ছেন আক্রান্ত শিশুদের মাঝে। শুধু মাহজাবীন নয়, আক্রান্ত অনেক শিশুকেই বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশের শিশু ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা জাতীয় গাইড লাইন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর নতুন করে ১৪ থেকে ১৫ হাজার শিশু বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। বর্তমানে ২ লাখেরও বেশি ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু রয়েছে।

তাদের ৯০ শতাংশই চিকিৎসার আওতার বাইরে। এর মূল কারণ, অর্থ আর রক্ত সংগ্রহের অভাব। একই সঙ্গে প্রায় ৩ বছরব্যাপী চিকিৎসা চালানোর কারণ। এ তিন কারণে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুর মধ্যে ৭০ শতাংশ শিশুর অভিভাবকই সন্তানকে চিকিৎসা না করিয়ে একপ্রকার গোপনে পালিয়ে যান।

দেশে শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা খুবই কম। একই সঙ্গে চিকিৎসার অবকাঠামো নেই বললেই চলে। ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশে শিশু ক্যান্সার চিকিৎসক রয়েছে মাত্র ২২ জন।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের বাঁচাতে পর্যাপ্ত অবকাঠামো, লোকবল, বিনামূল্যে ওষুধ প্রদানসহ চিকিৎসক বাড়ানো অতিজরুরি। সময় এসেছে শুধু ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল, ইন্সটিটিউট নির্মাণের।

গত এক সপ্তাহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতাল ইন্সটিটিউট পেডিয়াট্রিক হেমোটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগ ঘুরে দেখা যায়, ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের নিদারুণ যন্ত্রণা আর কষ্টের দৃশ্য।

এদিকে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন বারডেমের হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মুহম্মদ সাখাওয়াত হোসেন। তিনি ঢামেক হাসপাতালে বিনামূল্যে ওষুধ দিচ্ছেন।

ঢামেক হাসপাতাল শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. একেএম আমিরুল মোরশেদ খসরু যুগান্তরকে জানান, প্রতিবছরই ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। জানালেন, ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের বাঁচাতে শিশু ক্যান্সার হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউট তৈরির স্বপ্ন আছে।

ভারত-সিঙ্গাপুরের চেয়ে দেশে এর চিকিৎসা ভালো হয়। কিন্তু বাংলাদেশে শুধু অর্থ ও রক্ত সংগ্রহের অভাবে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা না করিয়ে ৭০ শতাংশ অভিভাবক শিশুদের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালে এসব চিকিৎসায় প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা খরচ হয়।

বেসরকারি পর্যায়ে এ চিকিৎসায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। কখনও কখনও অর্ধলাখ। ডা. সাখাওয়াত হোসেন আক্রান্ত রোগীদের ওষুধ দিচ্ছে, এটি অনেক বড় একটি সহযোগিতা।

‘পেডিয়াট্রিক অনকোলজি ন্যাশনাল ডাটাবেজ’ (পিওএনডি) নথিপত্র সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে ১৫ হাজারেরও বেশি শিশু নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। তবে ক্যান্সারে শিশু মৃত্যুর স্পষ্ট হিসাব নেই। ঢামেক হাসপাতালে ২০১৭ সালে ৯৯৫ জন ভর্তি হয়। ২০১৬ সালে ছিল ৬৬২ জন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৭ সালে ৫১২ জন শিশু ভর্তি হয়।

চলতি বছরের ১৬ মে পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে ৫৩৫ জন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান শিশু ক্যান্সার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. আফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, গত ৫ বছর আগেও বাংলাদেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদের ৯০ শতাংশই মারা যেত। একই সময়ে উন্নত রাষ্ট্রে ক্যান্সারে আক্রান্ত ৯০ শতাংশ শিশুই চিকিৎসায় সুস্থ হয়েছেন।

শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবণতা ব্লাড ক্যান্সারের, এরপরে রয়েছে ব্রেন টিউমার, বোন টিউমার ইত্যাদি। দেশে বর্তমানে চিকিৎসায় ৭৫ শতাংশ রোগী সুস্থ হলেও বাকি ২৫ শতাংশ রোগীকে সুস্থ করা সম্ভব হয়নি।

শিশুর ক্যান্সারের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে অবকাঠামো বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসক খুবই জরুরি। তাদের হাসপাতালে মাত্র ৩১টি সিট আছে। সিটের অভাবে রোগীদের ভর্তি করানো যায় না।

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মমতাজ বেগম যুগান্তরকে জানান, চিকিৎসায় শিশুর ক্যান্সার ভালো হয়। সরকারিভাবে চিকিৎসা করা হলেও অনেক ব্যয় হয়। ব্যয় কমিয়ে আনা প্রয়োজন। খাবারে ফরমালিন কিংবা ভেজাল পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।

পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক সূত্রে জানা গেছে, ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের মাত্র ৫ শতাংশ বংশগত সূত্রে জিন মারফত ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশ কিন্তু জন্ম পরবর্তীতে পারিপার্শ্বিক কারণে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। যার অন্যতম কারণ হচ্ছে ভেজাল খাদ্যদ্রব্য।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter