সড়কপথে কড়াকড়ি

মাদক পাচারের নিরাপদ রুট এখন ট্রেন

প্রকাশ : ২৭ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম ব্যুরো

উদয়ন এক্সপ্রেস

গত ১০ মে সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামমুখী উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের গার্ডরুম থেকে উদ্ধার করা হয় ৪১ কেজি ৮০০ গ্রাম গাঁজা। এ সময় মিজানুর রহমান নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতার মিজানুর রহমান আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে বলেছেন, এসব গাঁজা কুমিল্লার শশীদল এলাকা থেকে কিনে বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে ট্রেনে করে চট্টগ্রামে আসেন।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার মিজান বলেন, সড়ক পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়াকড়ি বেশি। তাই তার মতো মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে মাদক পাচারে নিরাপদ রুট এখন ট্রেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সড়ক পথে একাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেকপোস্টসহ নানা কড়াকড়ির কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা ট্রেনকে নিরাপদ হিসেবে বেছে নিয়েছে।

ট্রেনে চট্টগ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে ইয়াবা। আসছে গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইনসহ নানা ধরনের মাদক। মাঝে-মধ্যে মাদকসহ কেউ কেউ ধরা পড়লেও অধিকাংশরাই নিরাপদে গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছে মাদক।

চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার ওসি শহিদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, প্রতি মাসে চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানায় ৮ থেকে ১০টি মামলা হয়। এর বেশিরভাগই মাদক উদ্ধার সংক্রান্ত মামলা। ট্রেনে মাদক পাচার রোধে রেলওয়ে পুলিশ সতর্ক আছে।

রেলওয়ে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের মতে- ট্রেনে মাদক পাচারে ৩০ থেকে ৩৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত। এর মধ্যে আখাউড়া স্টেশন থেকে মাদক পাচারে জড়িত সোহাগ, আবুল হোসেন এবং শশীদল স্টেশন থেকে খোরশেদ আলম, তালশহর স্টেশন থেকে নাসির ও তার স্ত্রী এবং কসবা স্টেশন থেকে কুদ্দুস।

চট্টগ্রাম স্টেশনে আমিনুল, ইমরান, মিজান ও কায়সারসহ আছে একাধিক ব্যক্তি ও গ্রুপ। এদের মধ্যে কেউ ফেনসিডিল, কেউ ইয়াবা আবার কেউ গাঁজা, হেরোইন, চোলাই মদ ও বিদেশি মদ পাচারের সঙ্গে জড়িত।

তবে চট্টগ্রাম স্টেশনে দীর্ঘদিন ধরে এসবের সমন্বয় করছে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য গিয়াস উদ্দিন মৃধা নামে এক ব্যক্তি। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে ট্রেনে করে মাদক পাচারে সতর্ক থাকে মাদক কারবারিরা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়াতে রেলের কতিপয় কর্মচারীর সহায়তায় ট্রেনে বিভিন্ন গোপনীয় জায়গায় লুকিয়ে পাচার করা হচ্ছে মাদক। বিভিন্ন স্টেশন থেকে মাদকদ্রব্য তোলার পর ট্রেনের ছাদের হোসপাইপের ভেতর, ট্রেনের টয়লেটের দেয়ালের ফাঁকে, ইঞ্জিন রুমের ভেতর এবং গার্ডরুমসহ বিভিন্ন স্থানে বিশেষ কায়দায় মাদক লুকিয়ে পাচার করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বেশিরভাগ মাদক পাচার হয় লোকাল ট্রেনে। এর মধ্যে আছে- চট্টলা এক্সপ্রেস, কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, জালালাবাদ এক্সপ্রেস, বিজয় এক্সপ্রেস, মেঘনা এক্সপ্রেস, ঢাকা মেইল ও সাগরিকা এক্সপ্রেস।

পুলিশ জানায়, এসব ট্রেনে বিনা টিকিটে যেমন যাত্রী পরিবহন বেশি, তেমনি কোনো যাত্রী কি মালামাল নিয়ে ট্রেনে উঠেছে তা দেখারও পর্যাপ্ত জনবল থাকে না। যার কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা মর্জিমাফিক উঠে তাদের পছন্দের স্থানে পৌঁছে দিচ্ছে মাদক।

অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রেনে আনা মাদক অধিকাংশই রেললাইনের পাশে থাকা বস্তিগুলোতে নামিয়ে দেয়া হয়। আর এসব বস্তির পাশে মাদক বহনকারী ট্রেনটি এলেই গতি কমিয়ে দেয়া হয়।

আর এ সুযোগে বহনকারীরা মাদক নামিয়ে ফেলে। চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে সীতাকুণ্ড পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশে শতাধিক বস্তি রয়েছে। যার অধিকাংশই ব্যবহার হচ্ছে মাদক ব্যবসার স্পট হিসেবে।

নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সড়ক পথে পুলিশ-র‌্যাবের চেকপোস্ট আছে সন্দেহ হলে গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি করা হয়। ট্রেনে সেটা পারা যায় না।

যার কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা ট্রেনে পাচারের দিকে ঝুঁকছে। এ বিষয়ে পুলিশ সতর্ক আছে।