সুইপার থেকে কোটিপতি

মানিকগঞ্জে মাদকের টাকায় হবিউল্লাহর রাজপ্রাসাদ

প্রকাশ : ৩১ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মতিউর রহমান, মানিকগঞ্জ

সুইপার হবিউল্লাহর রাজপ্রাসাদ

সুইপার থেকে কোটিপতি বনেছেন মাদক ব্যবসায়ী হাবিবুল্লাহ ওরফে হবিউল্লাহ। দুই হাতে টাকা কামিয়েছেন। শ্বশুরবাড়ি মানিকগঞ্জের গড়পাড়ায় গড়ে তুলেছেন প্রাসাদোপম বাড়ি।

সোমবার সরেজমিন ওই বাড়িটি পরিদর্শন করেছি। মূল ফটক অতিক্রম করে প্রবেশ দরজা নক করতেই দরজা খুলল হবিউল্লাহর বড় ছেলে রাব্বি। তিনতলা ভবনের নিচতলায় বসলাম।

ঘরের মেঝেতে মার্বেল পাথর বসানো। রুমের ডেকোরেশন দৃষ্টিনন্দন। এলেন হবিউল্লাহর স্ত্রী রওশনারা বেগম।

স্বামী কোথায় আছেন, চানতে চাইলে অকপটে বললেন মাদক (ইয়াবা) মামলায় কারাগারে। তবে তার দাবি হবিকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানো হয়েছে। সে ভালো হয়ে গেছে, মাদক ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছে। পুরনো অভ্যাস গাঁজা সেবন করে মাত্র। বাড়ির ছাদে বসে একা একা চলত গাঁজা সেবন। কেজিদরে কিনে আনত গাঁজা। তিনতলার ছাদে তিনি গড়ে তুলেছেন আরেক স্বর্গ।

হবিউল্লাহ সম্পর্কে জানতে চাইলে আরও বলেন, এক সময় তার স্বামী সিটি কর্পোরেশনের সুইপার ছিল। তবে কোন সিটি কর্পোরেশনে তা বলতে পারেননি। চাকরির সুবাদে গাঁজা সেবন, ব্যবসায় জড়ানো। দুহাতে টাকা রোজগার। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি হবিউল্লাহকে।

হবিউল্লাহর স্ত্রী জানাল তারা সপরিবারে থাকত গাজীপুরের টঙ্গী ও সাভারের আশুলিয়া এলাকায়। হবিউল্লাহ অশিক্ষিত। ফাইভ পাসও করেননি। প্রায় ৬-৭ বছর আগে আশুলিয়া থেকে সপরিবারে চলে আসেন মায়ের বাড়ি গড়পাড়া গ্রামে। তার সুন্দর বাড়ি করাটাই কাল হয়েছে।

তার দাবি বাড়ি করার পর থেকে প্রতিবেশীরা তাদের এই ভালো মেনে নিতে পারছে না। নানান ষড়যন্ত্র করছে তাদের বিরুদ্ধে। তাকে জিজ্ঞেস করা হল বাড়ি করার টাকার উৎস কী? উত্তর এড়িয়ে যান তিনি। বলেন, তার স্বামী এক সময় কামাই করে জমিজমা করেন, তা বিক্রি করে এখন চলছে তাদের সংসার।

জানা গেল, হবিউল্লাহর দৃশ্যমান কোনো আয়-রোজগার নেই। একমাত্র মাদক ব্যবসায় চলে তার সংসার। মাদকের টাকায় গড়া এই সুরম্য অট্টালিকা।

বড় ছেলে রাব্বি ক্লাস নাইনে পড়ছে। মেজ ছেলে জেলার অভিজাত মুন্নু ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ইংরেজি ভার্সনে ৫ম শ্রেণীতে পড়ে। তার পেছনে মাসে খরচ ১৫-১৬ হাজার টাকার মতো। ছোট ছেলে সানির বয়স ৫ বছর। রওশনারা জানান, পরিবারে তার সঙ্গে মা, শাশুড়ি ও তার ভাতিজি থাকেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, হবিউল্লার ছিল ওপরমহলে চলাফেরা। তার এসব অপকর্মের প্রশ্রয় দিতেন সরকারদলীয় একাধিক নেতা। কথা হয় মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও গড়পাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আফসার উদ্দিন সরকারের সঙ্গে।

তিনি জানান, পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর তিনি জানতে পেরেছেন হবিউল্লাহ একজন বড় মাপের মাদক ব্যবসায়ী। তার আসল বাড়ি গাজীপুর জেলায়। এখানে ৬-৭ বছর আগে জায়গা কিনে প্রাসাদসম বাড়িটি করেছেন।

মানিকগঞ্জে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ইন্সপেক্টর সাইফুল ইসলাম জানান, জেলার টপমোস্ট মাদক ব্যবসায়ীদের একজন হবিউল্লাহ। মাদকের টাকায় তার এই বাড়িটি গড়া। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পক্ষে তার বিরুদ্ধে মানিকগঞ্জ ও গাজীপুরে একাধিক মামলা করা হয়েছে।

এদিকে মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশের এএসপি (ডিএসবি) হামিদুর রহমান সিদ্দিকী শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী হাবিবুল্লাহ সম্পর্কে জানান, সর্বশেষ তিনি ৩ কেজি গাঁজাসহ আটক হয়ে জেলহাজতে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে। যার সবগুলোই মাদকের।

এ ব্যাপারে কথা হয় মানিকগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি জানান, মাদকসহ হবিউল্লাহকে আটক করেছেন তারা। আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর না হওয়ায় জেলহাজতে প্রেরণ করায় তার শেল্টারদাতা ও তার মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে কতজন সহযোগী আছে তা জানা সম্ভব হয়নি।