ইনফিনিটি-ব্রাইট ফিউচারের রমরমা এমএলএম বাণিজ্য
jugantor
নতুন মোড়কে সেই ‘হায় হায় কোম্পানি’
ইনফিনিটি-ব্রাইট ফিউচারের রমরমা এমএলএম বাণিজ্য

  কায়েস আহমেদ সেলিম  

১৬ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নানা কারণে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। কারণ এই বিপণন পদ্ধতি হাজারো মানুষকে পথে বসিয়েছে। গত ২২ বছরে এমএলএমের নামে বহু ভুয়া প্রতিষ্ঠানের ডালপালা ছড়ায় বাংলাদেশে। এসব প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় মার্কেটিং প্ল্যান আর মোটিভেশনের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারানো মানুষের সংখ্যা কয়েক লাখ হবে। ১৯৯৯ সালের দিকে শ্রীলংকান নাগরিক নভরত্নম শ্রী নারায়না থাস নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে প্রথম বাংলাদেশে এমএলএম ব্যবসার শুরু হয়। আর বাংলাদেশে এমএলএমের জনক বলা হয় ডেসটিনির মালিক রফিকুল আমিনকে। তিনি এমএলএম প্রতারণা মামলায় বর্তমানে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসাবে জেলে রয়েছেন। তার অনুসারীদের অনেকেই এখন এই ব্যবসায় জড়িত।

প্রতারণার নয়া ফাঁদ ‘ইনফিনিটি মার্কেটিং লিমিটেড’ : ইনফিনিটি মার্কেটিং লিমিটেডের সিইও সিরাজুল আমিন রুমেল। যিনি রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে বিভিন্ন কোম্পানির মানহীন পণ্য বেচাকেনার নামে এমএলএম ব্যবসা করছেন। তার বিরুদ্ধে মানব পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে। র‌্যাবের হাতে একবার গ্রেফতার হয়ে ৬ মাস জেলও খেটেছেন রুমেল। তার বিরুদ্ধে একাধিকবার বিভিন্ন টেলিভিশন ও প্রিন্ট মিডিয়ায় সংবাদ প্রচার হলেও তিনি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বীরদর্পে চালিয়ে যাচ্ছেন অবৈধ কর্মকাণ্ড।

প্রতারক রুমেল সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে তা বাঁধাই করে অফিসের দেওয়ালে টানিয়ে রেখে নিজেকে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসাবে জাহির করেন। বিভিন্ন জায়গায় নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছের লোক পরিচয় দিয়ে থাকেন। নানান অভিযোগে তার নামে সারা দেশে অন্তত ২০টি মামলা রয়েছে।

সরেজমিন ইনফিনিটির গুলশান-১ এ জব্বার টাওয়ারে গিয়ে দেখা যায়, পুরো অফিস লোকে লোকারণ্য। রাজকীয় অফিস। ভেতরে থাইগ্লাসে আবদ্ধ করা রুম। ভেতরে সাজিয়ে রাখা ডেস্ক। কয়েকটি ডেস্ক ঘিরে নারী-পুরুষের ভিড়। চলছে কথার ফিসফাস। মনে হতে পারে কোনো গোপন মিটিং। কোট-টাই পরা ফিটফাট লোকজন একের পর এক আসছেন আর যাচ্ছেন। কারও হাতে ব্যাগ, খাকি খাম আবার বাজার করার ব্যাগ। অবাক করার বিষয় হলো এসব থেকে বেরিয়ে আসে শুধু টাকা। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই এখানে কী হচ্ছে? সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরার নজরদারি। সামনে বড় করে লেখা ‘ইনফিনিটি মার্কেটিং লিমিটেড’। বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর ব্যবসার আড়ালে অভিনব পদ্ধতিতে এখানে চলছে এমএলএম প্রতারণা। অল্প সময়ে কমিশনের মাধ্যমে কোটিপতি বানানোর কথা বলে গ্রামের বেকার ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে টাকা। সরকারদলীয় কয়েকজন এবং স্থানীয় প্রশাসনের মদদে বীরদর্পে চলছে এই কার্যক্রম। রয়েছে সাবেক প্রভাবশালী একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার আশীর্বাদ। আর প্রতারিতদের দমন করতে রাখা হয়েছে বিভিন্ন বাহিনীর সুঠাম দেহের অধিকারী কিছু অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক। ‘গ্রাহক’ শিকারে ব্যবহার করা হচ্ছে বন্ধ হয়ে যাওয়া ডেসটিনি, ইউনি পে টু’র প্রশিক্ষিত প্রতারক এবং সুন্দরী রমণী। এ ব্যাপারে রুমেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এর আগে যমুনা টেলিভিশনে রিপোর্ট করেছিল তাতে কী হয়েছে আমাদের? এসব নিউজফিউজে কিছু হয় না।

হাউজিং ব্যবসার নামে এমএলএম : এদিকে নামসর্বস্ব কয়েকটি ব্যবসা দেখিয়ে বড় লিমিটেড কোম্পানি খুলে এমএলএম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং) পদ্ধতিতে প্রতারণা বাণিজ্য শুরু করেছে একটি চক্র। প্রতিষ্ঠানের নাম ‘ব্রাইট ফিউচার হোল্ডিংস লিমিটেড’। ইতোমধ্যে প্রায় শত কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। যেসব ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলে প্রতিষ্ঠানটি মানুষের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছে, তার কোনোটিই প্রতিষ্ঠিত বা ব্যবসাসফল নয়।

নাম গোপন রাখার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানান, এই প্রতিষ্ঠানটি যারা শুরু করেন, ৭ বছর আগেও তারা ছিলেন একপ্রকার পথের ভিখারি। মানুষের কাছ থেকে সাহায্য কিংবা ধার নিয়ে সংসার চালাতে হয়েছে তাদের। কিন্তু এখন তারা আলিশান অফিসে বসছেন। থাকছেন অভিজাত বাড়িতে। চড়ছেন দামি গাড়িতে। আর মানুষকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখাচ্ছেন গাড়ি-বাড়ি-প্রতিষ্ঠানের মালিক বানিয়ে দেওয়ার।

ব্রাইট ফিউচার হোল্ডিংস লিমিটেডের মূল উদ্যোক্তা আক্তার হোসেন। তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে আছেন। বিলুপ্ত হওয়া ডেসটিনির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এই আক্তার হোসেন। অসংখ্য মানুষকে ডেসটিনিতে বিনিয়োগ করিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। ডেসটিনি বন্ধ হওয়ার পর নিজেই এমএলএম ব্যবসার ফাঁদ পেতে বসেন তিনি। একটির পর একটি প্রতিষ্ঠান খুলে মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে সুযোগমতো অফিস গুটিয়ে লাপাত্তা হয়ে যান। এরপর নতুন প্ল্যানে নতুন অফিস নিয়ে আবার প্রতারণার কার্যক্রম শুরু করেন। প্রথমে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেন মিষ্টি ভাষা, অভিজাত চালচলন এবং কিছু সময়ের জন্য লেনদেন ঠিক রেখে। যখন বিনিয়োগ করা অর্থের পরিমাণ বেড়ে যায়, হঠাৎ সব ফেলে উধাও হয়ে যান।

টাকা হাতানোর জন্য তার নতুন ফাঁদ ‘ব্রাইট ফিউচার হোল্ডিংস লিমিটেড’। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে নিজ নামেই ট্রেড লাইসেন্সও নিয়েছেন। তবে এমএলএম পদ্ধতিতে ব্যবসা করার কোনো কাগজপত্র নেই তার। আক্তার হোসেন মূল মালিক হলেও অফিসিয়াল কার্যক্রম পরিচালনা করেন আলাউদ্দিন। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা অফিসে নতুন আসা ব্যক্তিদের প্রথমে পুরো মার্কেটিং প্ল্যান বুঝিয়ে বলেন। শেষে নেওয়া হয় সুমন নামে আরেকজনের সামনে। তিনি সর্বশেষ ব্রিফিং দেন। মিথ্যা আশ্বাসগুলো উপস্থাপন করে নতুনদের ফাঁদে ফেলেন তিনি।

পরিচয় গোপন রেখে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম দেখতে গিয়ে জানা যায়, প্রতিদিন প্রায় কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয় এখানে। টাকা জমা নেওয়া, লভ্যাংশ দেওয়া, এমন ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার সামান্যতম বৈধতা না থাকলেও রাজধানী ঢাকার উত্তরাতে প্রকাশ্যেই চলছে এমন কার্যক্রম। তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা দেখে যে কেউ আঁচ করতে পারবে, নতুন মোড়কে সেই পুরোনো ‘হায় হায় কোম্পানি’ চালু হয়েছে। তারপরও এই প্রতিষ্ঠানে সরল বিশ্বাসে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করছেন অনেকে। এর মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের সংখ্যা বেশি। লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ঘরে বসেই পাওয়া যাবে ১২ শতাংশ সুদ। আর ১০ লাখ বিনিয়োগেই প্রতি মাসে লাভ পাওয়া যাবে এক লাখ টাকার ওপরে। এমনই আশ্বাস দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত নেওয়া হচ্ছে।

ব্রাইট ফিউচারের কার্যক্রম একেবারে ডেসটিনির আদলে। জাহাঙ্গীর নামের প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল একজন জানান, এটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠান। এর নিজস্ব কারখানায় বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদন হয়। এছাড়া রয়েছে ট্রাভেলস, পরিবহণ ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। রয়েছে মার্কেট, গরুর ফার্ম ও মৎস্য চাষ, হাউজিং, এক্সেসরিজ ও জমির ব্যবসা।

প্রথমে তিনি কনজুমার পণ্যের ডিলারশিপ নিয়ে কথা বলেন। এরপর বলেন, যদি কারও ব্যবসা করার মতো সময় বা ইচ্ছা না থাকে, তাহলে তিনি এসব প্রকল্পে অর্থ লগ্নি করতে পারেন। সেক্ষেত্রে তার লভ্যাংশের টাকা প্রকল্পভেদে নিয়মানুযায়ী দৈনিক কিংবা মাসিক হারে পেয়ে যাবেন।

টাকা বিনিয়োগের প্রমাণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো চেক দিই না, তবে স্ট্যাম্পে চুক্তি করে নিই। প্রতি এক লাখ টাকা বিনিয়োগে শতকরা ১২ শতাংশ মুনাফা দিই।’

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেউ ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেই মাসে পাবে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। হিসাব করে দেখা যায়, ১০ মাসেরও কম সময়ের মধ্যেই মূলধন উঠে আসবে। তারপরও আবার লভ্যাংশ প্রদান চালিয়ে যাবেন। আবার চাইলে মূলধন ফেরত পাওয়া যাবে।

এ ব্যাপারে জানতে ব্রাইট ফিউচার হোল্ডিংস লিমিটেডের মালিক আক্তার হোসেনের সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি।

নতুন মোড়কে সেই ‘হায় হায় কোম্পানি’

ইনফিনিটি-ব্রাইট ফিউচারের রমরমা এমএলএম বাণিজ্য

 কায়েস আহমেদ সেলিম 
১৬ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নানা কারণে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। কারণ এই বিপণন পদ্ধতি হাজারো মানুষকে পথে বসিয়েছে। গত ২২ বছরে এমএলএমের নামে বহু ভুয়া প্রতিষ্ঠানের ডালপালা ছড়ায় বাংলাদেশে। এসব প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় মার্কেটিং প্ল্যান আর মোটিভেশনের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারানো মানুষের সংখ্যা কয়েক লাখ হবে। ১৯৯৯ সালের দিকে শ্রীলংকান নাগরিক নভরত্নম শ্রী নারায়না থাস নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে প্রথম বাংলাদেশে এমএলএম ব্যবসার শুরু হয়। আর বাংলাদেশে এমএলএমের জনক বলা হয় ডেসটিনির মালিক রফিকুল আমিনকে। তিনি এমএলএম প্রতারণা মামলায় বর্তমানে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসাবে জেলে রয়েছেন। তার অনুসারীদের অনেকেই এখন এই ব্যবসায় জড়িত।

প্রতারণার নয়া ফাঁদ ‘ইনফিনিটি মার্কেটিং লিমিটেড’ : ইনফিনিটি মার্কেটিং লিমিটেডের সিইও সিরাজুল আমিন রুমেল। যিনি রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে বিভিন্ন কোম্পানির মানহীন পণ্য বেচাকেনার নামে এমএলএম ব্যবসা করছেন। তার বিরুদ্ধে মানব পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে। র‌্যাবের হাতে একবার গ্রেফতার হয়ে ৬ মাস জেলও খেটেছেন রুমেল। তার বিরুদ্ধে একাধিকবার বিভিন্ন টেলিভিশন ও প্রিন্ট মিডিয়ায় সংবাদ প্রচার হলেও তিনি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বীরদর্পে চালিয়ে যাচ্ছেন অবৈধ কর্মকাণ্ড।

প্রতারক রুমেল সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে তা বাঁধাই করে অফিসের দেওয়ালে টানিয়ে রেখে নিজেকে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসাবে জাহির করেন। বিভিন্ন জায়গায় নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছের লোক পরিচয় দিয়ে থাকেন। নানান অভিযোগে তার নামে সারা দেশে অন্তত ২০টি মামলা রয়েছে।

সরেজমিন ইনফিনিটির গুলশান-১ এ জব্বার টাওয়ারে গিয়ে দেখা যায়, পুরো অফিস লোকে লোকারণ্য। রাজকীয় অফিস। ভেতরে থাইগ্লাসে আবদ্ধ করা রুম। ভেতরে সাজিয়ে রাখা ডেস্ক। কয়েকটি ডেস্ক ঘিরে নারী-পুরুষের ভিড়। চলছে কথার ফিসফাস। মনে হতে পারে কোনো গোপন মিটিং। কোট-টাই পরা ফিটফাট লোকজন একের পর এক আসছেন আর যাচ্ছেন। কারও হাতে ব্যাগ, খাকি খাম আবার বাজার করার ব্যাগ। অবাক করার বিষয় হলো এসব থেকে বেরিয়ে আসে শুধু টাকা। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই এখানে কী হচ্ছে? সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরার নজরদারি। সামনে বড় করে লেখা ‘ইনফিনিটি মার্কেটিং লিমিটেড’। বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর ব্যবসার আড়ালে অভিনব পদ্ধতিতে এখানে চলছে এমএলএম প্রতারণা। অল্প সময়ে কমিশনের মাধ্যমে কোটিপতি বানানোর কথা বলে গ্রামের বেকার ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে টাকা। সরকারদলীয় কয়েকজন এবং স্থানীয় প্রশাসনের মদদে বীরদর্পে চলছে এই কার্যক্রম। রয়েছে সাবেক প্রভাবশালী একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার আশীর্বাদ। আর প্রতারিতদের দমন করতে রাখা হয়েছে বিভিন্ন বাহিনীর সুঠাম দেহের অধিকারী কিছু অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক। ‘গ্রাহক’ শিকারে ব্যবহার করা হচ্ছে বন্ধ হয়ে যাওয়া ডেসটিনি, ইউনি পে টু’র প্রশিক্ষিত প্রতারক এবং সুন্দরী রমণী। এ ব্যাপারে রুমেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এর আগে যমুনা টেলিভিশনে রিপোর্ট করেছিল তাতে কী হয়েছে আমাদের? এসব নিউজফিউজে কিছু হয় না।

হাউজিং ব্যবসার নামে এমএলএম : এদিকে নামসর্বস্ব কয়েকটি ব্যবসা দেখিয়ে বড় লিমিটেড কোম্পানি খুলে এমএলএম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং) পদ্ধতিতে প্রতারণা বাণিজ্য শুরু করেছে একটি চক্র। প্রতিষ্ঠানের নাম ‘ব্রাইট ফিউচার হোল্ডিংস লিমিটেড’। ইতোমধ্যে প্রায় শত কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। যেসব ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলে প্রতিষ্ঠানটি মানুষের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছে, তার কোনোটিই প্রতিষ্ঠিত বা ব্যবসাসফল নয়।

নাম গোপন রাখার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানান, এই প্রতিষ্ঠানটি যারা শুরু করেন, ৭ বছর আগেও তারা ছিলেন একপ্রকার পথের ভিখারি। মানুষের কাছ থেকে সাহায্য কিংবা ধার নিয়ে সংসার চালাতে হয়েছে তাদের। কিন্তু এখন তারা আলিশান অফিসে বসছেন। থাকছেন অভিজাত বাড়িতে। চড়ছেন দামি গাড়িতে। আর মানুষকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখাচ্ছেন গাড়ি-বাড়ি-প্রতিষ্ঠানের মালিক বানিয়ে দেওয়ার।

ব্রাইট ফিউচার হোল্ডিংস লিমিটেডের মূল উদ্যোক্তা আক্তার হোসেন। তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে আছেন। বিলুপ্ত হওয়া ডেসটিনির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এই আক্তার হোসেন। অসংখ্য মানুষকে ডেসটিনিতে বিনিয়োগ করিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। ডেসটিনি বন্ধ হওয়ার পর নিজেই এমএলএম ব্যবসার ফাঁদ পেতে বসেন তিনি। একটির পর একটি প্রতিষ্ঠান খুলে মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে সুযোগমতো অফিস গুটিয়ে লাপাত্তা হয়ে যান। এরপর নতুন প্ল্যানে নতুন অফিস নিয়ে আবার প্রতারণার কার্যক্রম শুরু করেন। প্রথমে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেন মিষ্টি ভাষা, অভিজাত চালচলন এবং কিছু সময়ের জন্য লেনদেন ঠিক রেখে। যখন বিনিয়োগ করা অর্থের পরিমাণ বেড়ে যায়, হঠাৎ সব ফেলে উধাও হয়ে যান।

টাকা হাতানোর জন্য তার নতুন ফাঁদ ‘ব্রাইট ফিউচার হোল্ডিংস লিমিটেড’। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে নিজ নামেই ট্রেড লাইসেন্সও নিয়েছেন। তবে এমএলএম পদ্ধতিতে ব্যবসা করার কোনো কাগজপত্র নেই তার। আক্তার হোসেন মূল মালিক হলেও অফিসিয়াল কার্যক্রম পরিচালনা করেন আলাউদ্দিন। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা অফিসে নতুন আসা ব্যক্তিদের প্রথমে পুরো মার্কেটিং প্ল্যান বুঝিয়ে বলেন। শেষে নেওয়া হয় সুমন নামে আরেকজনের সামনে। তিনি সর্বশেষ ব্রিফিং দেন। মিথ্যা আশ্বাসগুলো উপস্থাপন করে নতুনদের ফাঁদে ফেলেন তিনি।

পরিচয় গোপন রেখে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম দেখতে গিয়ে জানা যায়, প্রতিদিন প্রায় কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয় এখানে। টাকা জমা নেওয়া, লভ্যাংশ দেওয়া, এমন ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার সামান্যতম বৈধতা না থাকলেও রাজধানী ঢাকার উত্তরাতে প্রকাশ্যেই চলছে এমন কার্যক্রম। তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা দেখে যে কেউ আঁচ করতে পারবে, নতুন মোড়কে সেই পুরোনো ‘হায় হায় কোম্পানি’ চালু হয়েছে। তারপরও এই প্রতিষ্ঠানে সরল বিশ্বাসে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করছেন অনেকে। এর মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের সংখ্যা বেশি। লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ঘরে বসেই পাওয়া যাবে ১২ শতাংশ সুদ। আর ১০ লাখ বিনিয়োগেই প্রতি মাসে লাভ পাওয়া যাবে এক লাখ টাকার ওপরে। এমনই আশ্বাস দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত নেওয়া হচ্ছে।

ব্রাইট ফিউচারের কার্যক্রম একেবারে ডেসটিনির আদলে। জাহাঙ্গীর নামের প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল একজন জানান, এটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠান। এর নিজস্ব কারখানায় বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদন হয়। এছাড়া রয়েছে ট্রাভেলস, পরিবহণ ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। রয়েছে মার্কেট, গরুর ফার্ম ও মৎস্য চাষ, হাউজিং, এক্সেসরিজ ও জমির ব্যবসা।

প্রথমে তিনি কনজুমার পণ্যের ডিলারশিপ নিয়ে কথা বলেন। এরপর বলেন, যদি কারও ব্যবসা করার মতো সময় বা ইচ্ছা না থাকে, তাহলে তিনি এসব প্রকল্পে অর্থ লগ্নি করতে পারেন। সেক্ষেত্রে তার লভ্যাংশের টাকা প্রকল্পভেদে নিয়মানুযায়ী দৈনিক কিংবা মাসিক হারে পেয়ে যাবেন।

টাকা বিনিয়োগের প্রমাণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো চেক দিই না, তবে স্ট্যাম্পে চুক্তি করে নিই। প্রতি এক লাখ টাকা বিনিয়োগে শতকরা ১২ শতাংশ মুনাফা দিই।’

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেউ ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেই মাসে পাবে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। হিসাব করে দেখা যায়, ১০ মাসেরও কম সময়ের মধ্যেই মূলধন উঠে আসবে। তারপরও আবার লভ্যাংশ প্রদান চালিয়ে যাবেন। আবার চাইলে মূলধন ফেরত পাওয়া যাবে।

এ ব্যাপারে জানতে ব্রাইট ফিউচার হোল্ডিংস লিমিটেডের মালিক আক্তার হোসেনের সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন