৭১ গণগ্রন্থাগারের বই-পত্রিকা বাজেট মাত্র দুই কোটি টাকা!
jugantor
৭১ গণগ্রন্থাগারের বই-পত্রিকা বাজেট মাত্র দুই কোটি টাকা!
বাজেট শুধু অপর্যাপ্ত নয় দুঃখজনক -সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী * সংস্কৃতিও উন্নয়নের সূচক হতে পারে -সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

  হক ফারুক আহমেদ  

২৫ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের ভিত্তি পড়ুয়া জাতি। একটি পড়ুয়া জাতি গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে সেই দেশের গণগ্রন্থাগার। যে প্রতিষ্ঠানের কাজই হচ্ছে নানা ধরনের বই ও পত্রপত্রিকা পাঠের সুব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পড়ুয়া জাতি গঠনে ভূমিকা রাখা। গণগ্রন্থাগারকে সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসাবে তৈরি করা। পরিতাপের বিষয়, ২০২২ সালে এসেও দেশের ৭১টি গণগ্রন্থাগারের জন্য বার্ষিক বই ও পত্রপত্রিকা কেনার বাজেট মাত্র ২ কোটি ২০ লাখ টাকা।

জানা গেছে, ২০১২ সালের আগ পর্যন্ত এই বাজেট ছিল মাত্র এক কোটি টাকা। পরবর্তীতে এটি বাড়িয়ে দুই কোটি টাকা করা হয়। গত কয়েক বছরে এই দুই কোটি টাকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ২০ লাখ টাকা। কিন্তু এটিকেও খুবই অপ্রতুল বলছেন শিক্ষা-সংস্কৃতিসংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা। তারা মতামত দিয়েছেন, শুধু অর্থনীতির সূচকে উন্নয়নকে পরিমাপ করলে দেশ পিছিয়ে যাবে। সংস্কৃতিকেও উন্নয়নের সূচক হিসাবে ভাবতে হবে। গণগ্রন্থাগারগুলোকে কার্যকরী করে জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে এগিয়ে আসতে হবে। বই ও পত্রপত্রিকা কেনা বাবদ বাজেট নির্ধারণ করতে হবে অন্তত ১০ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এই বাজেট শুধু অপর্যাপ্ত নয়, দুঃখজনক। এটা আমাদের জন্য ক্ষতিকারক। পাবলিক লাইব্রেরিকে যদি শক্তিশালী করতে না পারি তাহলে আমরা যে সাংস্কৃতিকভাবে পিছিয়ে যাচ্ছি, সেটা অব্যাহত থাকবে। সাংস্কৃতিক অগ্রগতির জন্য পাবলিক লাইব্রেরিগুলোকে শক্তিশালী করা দরকার। তার জন্য বই কেনার বরাদ্দ আরও বাড়াতে হবে। এমনিতেই লোকে বই কিনতে চায় না বা কেনা সম্ভব হয় না। সেখানে পাবলিক লাইব্রেরির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে। প্রচুর বই দিতে হবে, মানুষকে যেতে উৎসাহিত করতে হবে।

শিক্ষাবিদ ও লেখক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, এই বাজেট বরাদ্দ অত্যন্ত অপ্রতুল। এটা একটি স্বাধীনচেতা, সভ্য দেশের প্রতীক হতে পারে না। আমি নিজে দেখেছি ইউরোপের যে দেশগুলোর অর্থনীতি একটু দুর্বল তারাও পাবলিক লাইব্রেরির পেছনে প্রচুর ব্যয় করে। আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমরা শুধু অর্থনীতির সূচকে উন্নয়নকে মাপি, সংস্কৃতিও যে উন্নয়নের সূচক হতে পারে এটা কোনো সরকারের মাথায় আসেনি। আমাদের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় সবচেয়ে কম বাজেটে চলে। সেখানে একটা উন্নাসিকতা আছে। অনেকে সংস্কৃতি মানে গান-বাজনা বোঝে। কিন্তু সংস্কৃতি তো শুধু গান-বাজনা নয়।

তিনি বলেন, তাই প্রথমত বাজেট বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিষয়টি আমাদের জাতিসত্তার বিকাশের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়, এটি প্রমাণ করে যে আমরা সংস্কৃতি ও শিক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছি না। বরাদ্দ বাড়ালেই যে পাবলিক লাইব্রেরিগুলো খুব বিকশিত হবে তা নয়। পাবলিক লাইব্রেরি নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে হবে। সমাজের সঙ্গে পাবলিক লাইব্রেরির আন্তঃসংযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে যেন মানুষ গমগম করে, শিশুরা আসে, বয়স্করা আসে এমন ব্যবস্থা করতে হবে। লেখক, গবেষকদের নিয়ে আড্ডার আয়োজন করতে হবে মানুষের সঙ্গে।

জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ বলেন, আমরা এটি অনেক আগে থেকেই বলছি, পাবলিক লাইব্রেরির এই বাজেট অপ্রতুল। এটি শুধু আমরা বলব কেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ও বুঝতে পারে বা বোঝার কথা। কারণ, পাবলিক লাইব্রেরি যখন যে বই কেনার জন্য নির্বাচন করে সে বইটি সবগুলো (৭১টি) লাইব্রেরিতে দেওয়ার জন্য বাজেট করতে পারে না। সুতরাং যে বইগুলো নির্বাচন করা হচ্ছে সেগুলো যদি সবগুলো লাইব্রেরিতে দিতে হয় তাহলেও বাজেট বাড়ানো দরকার। পাবলিক লাইব্রেরির বই কেনার বাজেট ন্যূনতম বার্ষিক ১০ কোটি টাকা হওয়া উচিত।

এ বিষয়ে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, বিভিন্ন জেলা থেকে আরও বেশি বেশি বইয়ের জন্য চাহিদা রয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা বলতে পারি, আরও বেশি বরাদ্দ পেলে ভালো হয়।

৭১ গণগ্রন্থাগারের বই-পত্রিকা বাজেট মাত্র দুই কোটি টাকা!

বাজেট শুধু অপর্যাপ্ত নয় দুঃখজনক -সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী * সংস্কৃতিও উন্নয়নের সূচক হতে পারে -সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
 হক ফারুক আহমেদ 
২৫ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের ভিত্তি পড়ুয়া জাতি। একটি পড়ুয়া জাতি গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে সেই দেশের গণগ্রন্থাগার। যে প্রতিষ্ঠানের কাজই হচ্ছে নানা ধরনের বই ও পত্রপত্রিকা পাঠের সুব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পড়ুয়া জাতি গঠনে ভূমিকা রাখা। গণগ্রন্থাগারকে সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসাবে তৈরি করা। পরিতাপের বিষয়, ২০২২ সালে এসেও দেশের ৭১টি গণগ্রন্থাগারের জন্য বার্ষিক বই ও পত্রপত্রিকা কেনার বাজেট মাত্র ২ কোটি ২০ লাখ টাকা।

জানা গেছে, ২০১২ সালের আগ পর্যন্ত এই বাজেট ছিল মাত্র এক কোটি টাকা। পরবর্তীতে এটি বাড়িয়ে দুই কোটি টাকা করা হয়। গত কয়েক বছরে এই দুই কোটি টাকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ২০ লাখ টাকা। কিন্তু এটিকেও খুবই অপ্রতুল বলছেন শিক্ষা-সংস্কৃতিসংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা। তারা মতামত দিয়েছেন, শুধু অর্থনীতির সূচকে উন্নয়নকে পরিমাপ করলে দেশ পিছিয়ে যাবে। সংস্কৃতিকেও উন্নয়নের সূচক হিসাবে ভাবতে হবে। গণগ্রন্থাগারগুলোকে কার্যকরী করে জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে এগিয়ে আসতে হবে। বই ও পত্রপত্রিকা কেনা বাবদ বাজেট নির্ধারণ করতে হবে অন্তত ১০ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এই বাজেট শুধু অপর্যাপ্ত নয়, দুঃখজনক। এটা আমাদের জন্য ক্ষতিকারক। পাবলিক লাইব্রেরিকে যদি শক্তিশালী করতে না পারি তাহলে আমরা যে সাংস্কৃতিকভাবে পিছিয়ে যাচ্ছি, সেটা অব্যাহত থাকবে। সাংস্কৃতিক অগ্রগতির জন্য পাবলিক লাইব্রেরিগুলোকে শক্তিশালী করা দরকার। তার জন্য বই কেনার বরাদ্দ আরও বাড়াতে হবে। এমনিতেই লোকে বই কিনতে চায় না বা কেনা সম্ভব হয় না। সেখানে পাবলিক লাইব্রেরির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে। প্রচুর বই দিতে হবে, মানুষকে যেতে উৎসাহিত করতে হবে।

শিক্ষাবিদ ও লেখক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, এই বাজেট বরাদ্দ অত্যন্ত অপ্রতুল। এটা একটি স্বাধীনচেতা, সভ্য দেশের প্রতীক হতে পারে না। আমি নিজে দেখেছি ইউরোপের যে দেশগুলোর অর্থনীতি একটু দুর্বল তারাও পাবলিক লাইব্রেরির পেছনে প্রচুর ব্যয় করে। আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমরা শুধু অর্থনীতির সূচকে উন্নয়নকে মাপি, সংস্কৃতিও যে উন্নয়নের সূচক হতে পারে এটা কোনো সরকারের মাথায় আসেনি। আমাদের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় সবচেয়ে কম বাজেটে চলে। সেখানে একটা উন্নাসিকতা আছে। অনেকে সংস্কৃতি মানে গান-বাজনা বোঝে। কিন্তু সংস্কৃতি তো শুধু গান-বাজনা নয়।

তিনি বলেন, তাই প্রথমত বাজেট বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিষয়টি আমাদের জাতিসত্তার বিকাশের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়, এটি প্রমাণ করে যে আমরা সংস্কৃতি ও শিক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছি না। বরাদ্দ বাড়ালেই যে পাবলিক লাইব্রেরিগুলো খুব বিকশিত হবে তা নয়। পাবলিক লাইব্রেরি নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে হবে। সমাজের সঙ্গে পাবলিক লাইব্রেরির আন্তঃসংযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে যেন মানুষ গমগম করে, শিশুরা আসে, বয়স্করা আসে এমন ব্যবস্থা করতে হবে। লেখক, গবেষকদের নিয়ে আড্ডার আয়োজন করতে হবে মানুষের সঙ্গে।

জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ বলেন, আমরা এটি অনেক আগে থেকেই বলছি, পাবলিক লাইব্রেরির এই বাজেট অপ্রতুল। এটি শুধু আমরা বলব কেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ও বুঝতে পারে বা বোঝার কথা। কারণ, পাবলিক লাইব্রেরি যখন যে বই কেনার জন্য নির্বাচন করে সে বইটি সবগুলো (৭১টি) লাইব্রেরিতে দেওয়ার জন্য বাজেট করতে পারে না। সুতরাং যে বইগুলো নির্বাচন করা হচ্ছে সেগুলো যদি সবগুলো লাইব্রেরিতে দিতে হয় তাহলেও বাজেট বাড়ানো দরকার। পাবলিক লাইব্রেরির বই কেনার বাজেট ন্যূনতম বার্ষিক ১০ কোটি টাকা হওয়া উচিত।

এ বিষয়ে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, বিভিন্ন জেলা থেকে আরও বেশি বেশি বইয়ের জন্য চাহিদা রয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা বলতে পারি, আরও বেশি বরাদ্দ পেলে ভালো হয়।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন