যাত্রীবেশেই ছিনতাই ও খুন করে অপরাধীরা
jugantor
যাত্রীবেশেই ছিনতাই ও খুন করে অপরাধীরা
সর্বদা দুশ্চিন্তায় থাকেন পরিবারের সদস্যরা

  শিপন হাবীব  

০৫ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘কোনো ভাইয়ের (অটোরিকশাচালক) দুর্ঘটনা কিংবা খুন হওয়ার সংবাদ শুনলে কলিজাটা মোচড় দিয়ে ওঠে। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। চোখের সামনে ভেসে আসে ছিনতাই-খুনের দৃশ্য। নিজেও বেশ কয়েকবার ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছি। প্রাণে রক্ষা পেলেও জীবন বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়েই সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাই।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন শাহজাহান মিয়া। রাজধানীতে প্রায় সাত বছর ধরে অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকানির্বাহ করে আসছেন তিনি।

শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘রাত হলেই আতঙ্কটা চলে আসে। অপরাধীরা কখনো যাত্রীবেশে আবার কখনো সন্ত্রাসী কায়দায় টাকাপয়সা, মোবাইল ফোন ছিনতাই করে। আবার কাউকে ছুরিকাঘাত কিংবা হত্যা করে অটোরিকশাটাই নিয়ে যায়। এমন ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়ে আমাদের সিএনজি (অটোরিকশা) চালাতে হয়। পরিবারের সদস্যরা আমাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে, কখন কী হয়!’

৩০ জুলাই ভোরে পল্লবীর কালশীর বিহারি ক্যাম্পের সামনের সড়ক থেকে গলাকাটা অবস্থায় আবদুল লতিফ হাওলাদার (৬০) নামে এক অটোরিকশাচালকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মঙ্গলবার (২ আগস্ট) বিকালে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পারভেজ ইসলাম যুগান্তরকে জানান, নিহত লতিফ হাওলাদার ২৯ জুলাই রাতে খুন হন। খুন করার পর তার অটেরিকশিটি নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় ১ আগস্ট মরণ এবং রবিন নামে দু’জন গ্রেফতার হয়েছে। ২ আগস্ট আদালতের মাধ্যমে ৬ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দুজন স্বীকার করেছে যে, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তারা জড়িত। রিমান্ড শেষে বিস্তারিত জানা যাবে। তিনি বলেন, লতিফ হাওলাদারের অটোরিকশাটি এখনো উদ্ধার হয়নি।

পুলিশ ও পরিবহণ শ্রমিক নেতারা বলছেন, শুধু রাজধানীতে ১৩ হাজার লাইসেন্সকৃত অটোরিকশা চলাচল করে। এছাড়া অবৈধভাবে চলে প্রায় সমসংখ্যক। ঢাকাসহ আশপাশের কয়েকটি জেলা মিলে বৈধ-অবৈধ অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। বিপুলসংখ্যক এই অটোরিকশার মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশের মালিক চালক। বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশ চালক ভাড়ায় চালান। আর অটোরিকশা চালিয়ে রোজগার হওয়া অর্থ ছিনতাই হলে কিংবা অটোরিকশাটি চুরি হলে জরিমানা চালককেই গুনতে হয়। আবার কখনো লাশ হতে হয়।

ঢাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ গাড়ি চোর চক্রের শতাধিক সদস্য সক্রিয় রয়েছে। মাঝেমধ্যে চক্রের সদস্যরা গ্রেফতার হচ্ছে। তাদের জেল হচ্ছে। কিন্তু চুরি, ছিনতাইন ও খুন বন্ধ হচ্ছে না। চুরি যাওয়া গাড়ি পেতে মালিকদের প্রায়ই ধরনা দিতে হয় সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের কাছে। তবে চুরি হওয়া গাড়ি উদ্ধার সংখ্যা খুবই কম।

২০১৮ সালের ১৩ জানুয়ারি রাজধানীর সংসদ ভবন এলাকায় সিএনজিচালিত এক অটোরিকশাচালকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ছিনতাইকারীরা পরে ওই অটোরিকশা দিয়েই ছিনতাই করে। ২০২১ সালের ৮ এপ্রিল ভোরে মিরপুর পল্লবী এলাকা থেকে দুলাল (৫০) নামের এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকের লাশ উদ্ধার হয়। দুলালকে হত্যার পর তার সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি চুরি করে নিয়ে যায় ছিনতাইচক্রের সদস্যরা। একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ডেমরায় হাসান (২০) নামে এক অটোরিকশাচালককে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। হত্যার পর হাসানকে ওই এলাকার একটি নার্সারির পেছনে ফেলে রাখা হয়। ২০২০ সালের ২৪ অক্টোবর রাজধানীর আফতাবনগর এলাকা থেকে জয়নাল মিয়া (৪৫) নামে এক অটোরিকশাচালকের লাশ উদ্ধার হয়। তার সারা শরীরে ছুরিকাঘাত ছিল। ছিনতাই হয় তার অটোরিকশাটিও।

ঢাকা মহানগর পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে ঢাকায় গাড়ি চুরির মামলা হয় ৩৩২টি। এসব মামলায় গ্রেফতার হয় ১৬২ জন। আর ২০২১ সালে ঢাকায় গাড়ি চুরির মামলা হয় সাড়ে ৩শ। ওই বছর গ্রেফতার হয় ১২০ জন। উদ্ধার করা গাড়ির মধ্যে মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে প্রাইভেট কার, জিপ, পিকআপ, বেবি ট্যাক্সি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মাইক্রোবাস, বাস, ট্রাক, লেগুনা, টেম্পো, অটোরিকশা, কাভার্ডভ্যান রয়েছে। চক্রের অনেক সদস্য জেল থেকে জামিনে কিংবা ছাড়া পেয়ে পুনরায় গাড়ি চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী যুগান্তরকে জানান, প্রায়ই সিএনজিচালিত অটোরিকশা চুরি, চালকদের ছুরিকাঘাত, হত্যার ঘটনা ঘটছে। পুলিশ এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। পরিবার-পরিজনদের নিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে অসহায় চালকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাতেও গাড়ি চালান। চোরচক্রের সঙ্গে অসাধু পুলিশ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ কঠোর হলে এমন অপরাধ নিশ্চয় কমে আসবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) ফারুক হোসেন বলেন, সিএনজি অটোরিকশা চুরি, চালককে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটছে। পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতার করাসহ চুরি যাওয়া গাড়িও উদ্ধার করছে। তবে অপরাধ শুধু পুলিশ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে না। সমাজের সব অংশের সহযোগিতা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, অপরাধীরা যাত্রীবেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডগুলো করে আসছে। আমরা পুরো চক্রকে গ্রেফতার করতে তৎপর রয়েছি। চালকদের আরও সচেতন হতে হবে। রাতে গাড়ি চালানোর সময় সতর্ক থাকতে হবে। সন্দেহ হলেই পুলিশকে ফোন কিংবা স্থানীয় থানায় জানাতে হবে।

যাত্রীবেশেই ছিনতাই ও খুন করে অপরাধীরা

সর্বদা দুশ্চিন্তায় থাকেন পরিবারের সদস্যরা
 শিপন হাবীব 
০৫ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘কোনো ভাইয়ের (অটোরিকশাচালক) দুর্ঘটনা কিংবা খুন হওয়ার সংবাদ শুনলে কলিজাটা মোচড় দিয়ে ওঠে। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। চোখের সামনে ভেসে আসে ছিনতাই-খুনের দৃশ্য। নিজেও বেশ কয়েকবার ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছি। প্রাণে রক্ষা পেলেও জীবন বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়েই সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাই।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন শাহজাহান মিয়া। রাজধানীতে প্রায় সাত বছর ধরে অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকানির্বাহ করে আসছেন তিনি।

শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘রাত হলেই আতঙ্কটা চলে আসে। অপরাধীরা কখনো যাত্রীবেশে আবার কখনো সন্ত্রাসী কায়দায় টাকাপয়সা, মোবাইল ফোন ছিনতাই করে। আবার কাউকে ছুরিকাঘাত কিংবা হত্যা করে অটোরিকশাটাই নিয়ে যায়। এমন ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়ে আমাদের সিএনজি (অটোরিকশা) চালাতে হয়। পরিবারের সদস্যরা আমাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে, কখন কী হয়!’

৩০ জুলাই ভোরে পল্লবীর কালশীর বিহারি ক্যাম্পের সামনের সড়ক থেকে গলাকাটা অবস্থায় আবদুল লতিফ হাওলাদার (৬০) নামে এক অটোরিকশাচালকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মঙ্গলবার (২ আগস্ট) বিকালে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পারভেজ ইসলাম যুগান্তরকে জানান, নিহত লতিফ হাওলাদার ২৯ জুলাই রাতে খুন হন। খুন করার পর তার অটেরিকশিটি নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় ১ আগস্ট মরণ এবং রবিন নামে দু’জন গ্রেফতার হয়েছে। ২ আগস্ট আদালতের মাধ্যমে ৬ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দুজন স্বীকার করেছে যে, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তারা জড়িত। রিমান্ড শেষে বিস্তারিত জানা যাবে। তিনি বলেন, লতিফ হাওলাদারের অটোরিকশাটি এখনো উদ্ধার হয়নি।

পুলিশ ও পরিবহণ শ্রমিক নেতারা বলছেন, শুধু রাজধানীতে ১৩ হাজার লাইসেন্সকৃত অটোরিকশা চলাচল করে। এছাড়া অবৈধভাবে চলে প্রায় সমসংখ্যক। ঢাকাসহ আশপাশের কয়েকটি জেলা মিলে বৈধ-অবৈধ অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। বিপুলসংখ্যক এই অটোরিকশার মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশের মালিক চালক। বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশ চালক ভাড়ায় চালান। আর অটোরিকশা চালিয়ে রোজগার হওয়া অর্থ ছিনতাই হলে কিংবা অটোরিকশাটি চুরি হলে জরিমানা চালককেই গুনতে হয়। আবার কখনো লাশ হতে হয়।

ঢাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ গাড়ি চোর চক্রের শতাধিক সদস্য সক্রিয় রয়েছে। মাঝেমধ্যে চক্রের সদস্যরা গ্রেফতার হচ্ছে। তাদের জেল হচ্ছে। কিন্তু চুরি, ছিনতাইন ও খুন বন্ধ হচ্ছে না। চুরি যাওয়া গাড়ি পেতে মালিকদের প্রায়ই ধরনা দিতে হয় সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের কাছে। তবে চুরি হওয়া গাড়ি উদ্ধার সংখ্যা খুবই কম।

২০১৮ সালের ১৩ জানুয়ারি রাজধানীর সংসদ ভবন এলাকায় সিএনজিচালিত এক অটোরিকশাচালকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ছিনতাইকারীরা পরে ওই অটোরিকশা দিয়েই ছিনতাই করে। ২০২১ সালের ৮ এপ্রিল ভোরে মিরপুর পল্লবী এলাকা থেকে দুলাল (৫০) নামের এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকের লাশ উদ্ধার হয়। দুলালকে হত্যার পর তার সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি চুরি করে নিয়ে যায় ছিনতাইচক্রের সদস্যরা। একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ডেমরায় হাসান (২০) নামে এক অটোরিকশাচালককে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। হত্যার পর হাসানকে ওই এলাকার একটি নার্সারির পেছনে ফেলে রাখা হয়। ২০২০ সালের ২৪ অক্টোবর রাজধানীর আফতাবনগর এলাকা থেকে জয়নাল মিয়া (৪৫) নামে এক অটোরিকশাচালকের লাশ উদ্ধার হয়। তার সারা শরীরে ছুরিকাঘাত ছিল। ছিনতাই হয় তার অটোরিকশাটিও।

ঢাকা মহানগর পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে ঢাকায় গাড়ি চুরির মামলা হয় ৩৩২টি। এসব মামলায় গ্রেফতার হয় ১৬২ জন। আর ২০২১ সালে ঢাকায় গাড়ি চুরির মামলা হয় সাড়ে ৩শ। ওই বছর গ্রেফতার হয় ১২০ জন। উদ্ধার করা গাড়ির মধ্যে মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে প্রাইভেট কার, জিপ, পিকআপ, বেবি ট্যাক্সি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মাইক্রোবাস, বাস, ট্রাক, লেগুনা, টেম্পো, অটোরিকশা, কাভার্ডভ্যান রয়েছে। চক্রের অনেক সদস্য জেল থেকে জামিনে কিংবা ছাড়া পেয়ে পুনরায় গাড়ি চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী যুগান্তরকে জানান, প্রায়ই সিএনজিচালিত অটোরিকশা চুরি, চালকদের ছুরিকাঘাত, হত্যার ঘটনা ঘটছে। পুলিশ এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। পরিবার-পরিজনদের নিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে অসহায় চালকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাতেও গাড়ি চালান। চোরচক্রের সঙ্গে অসাধু পুলিশ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ কঠোর হলে এমন অপরাধ নিশ্চয় কমে আসবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) ফারুক হোসেন বলেন, সিএনজি অটোরিকশা চুরি, চালককে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটছে। পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতার করাসহ চুরি যাওয়া গাড়িও উদ্ধার করছে। তবে অপরাধ শুধু পুলিশ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে না। সমাজের সব অংশের সহযোগিতা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, অপরাধীরা যাত্রীবেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডগুলো করে আসছে। আমরা পুরো চক্রকে গ্রেফতার করতে তৎপর রয়েছি। চালকদের আরও সচেতন হতে হবে। রাতে গাড়ি চালানোর সময় সতর্ক থাকতে হবে। সন্দেহ হলেই পুলিশকে ফোন কিংবা স্থানীয় থানায় জানাতে হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও খবর