স্বেচ্ছা পাহারায় অপরাধ কমেছে ৯৫ শতাংশ
jugantor
রোহিঙ্গা ক্যাম্প
স্বেচ্ছা পাহারায় অপরাধ কমেছে ৯৫ শতাংশ
মাদক, অস্ত্র ও স্বর্ণ উদ্ধার বেড়েছে কয়েকগুণ

  শফিক আজাদ, উখিয়া (কক্সবাজার)  

০৭ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো। খুন, গুম, ধর্ষণ, অপহরণ, মাদক, অস্ত্র, স্বর্ণ, চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড বাড়তে থাকে। ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ২০২১ সালের অক্টোবরে ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের নিয়ে প্রথম স্বেচ্ছায় পাহারার ব্যবস্থা চালু করেন ৮ এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম। এরপর থেকে পালটে যেতে শুরু করে চিত্র। কয়েক মাসের ব্যবধানের স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থা চালুর পর ক্যাম্পগুলোতে ৯৫ শতাংশ অপরাধ কমেছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, ক্যাম্পে দুষ্কৃতকারীদের অপতৎপরতাকে রুখে দিতে চালু করা হয় এফডিএমএন সদস্য দ্বারা স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থা। ২০২১ সালের ২৩ অক্টোবর শফিউল্লাহ কাটা ক্যাম্প-১৬ ও জামতলি ক্যাম্প-১৫ এর সব কর্মকর্তা ও মাঝিদের সঙ্গে স্বেচ্ছায় পাহারা নিয়ে সভা করি। পরে দুটি ক্যাম্পে এ ব্যবস্থা চালু করা হয়। দুটি পুলিশ ক্যাম্পের ১৪৭টি উপদলে পাঁচজন করে মোট ৭৩৫ জন স্বেচ্ছায় পাহারা দিতে থাকে। ১৫ দিন পর এই স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থার ফলাফল মূল্যায়ন করে দেখা গেল দুষ্কৃতকারীদের অপরাধ সংঘটন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

সূত্র জানায়, ৮ এপিবিএন ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি এফডিএমএন ক্যাম্প এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে। কিন্তু অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু হয় সেই বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি। স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থা চালুর আগে অর্থাৎ ২০২১ সালের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ৮.২৫ মাসে বিভিন্ন মামলায় ২০৮ জন দুষ্কৃতকারী গ্রেফতার, ২টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৯ রাউন্ড গুলি, ৯৪টি দেশীয় অস্ত্র, ৪ লাখ ১৯ হাজার ৮৮৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও ১৮ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার হয়।

অন্যদিকে স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থা চালুর পর থেকে অর্থাৎ ২০২১ সালের ২৩ অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ৮.২৪ মাসে বিভিন্ন মামলায় ৭৫৪ জন দুষ্কৃতকারী গ্রেফতার, ১৩টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৩৩ রাউন্ড গুলি, ১৪১টি দেশীয় অস্ত্র, ১৫ লাখ ৩৭ হাজার ১৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও প্রায় ৫০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার হয়। এ সময় ক্যাম্প ইতিহাসে প্রথম ক্লু-লেস হত্যার রহস্য উন্মোচিত হয়। জানা গেছে, ৮ এপিবিএনের অধীন ১১টি এফডিএমএন ক্যাম্পে ৬৪টি ব্লকে ৭৭২টি সাব-ব্লক রয়েছে। প্রতিরাতে একটি সাব-ব্লকে ৫/১০ জন করে পাহারা দিচ্ছে। প্রত্যেকটি ক্যাম্পের এক্সিট-এন্ট্রি পয়েন্টে পুলিশের সঙ্গে ১৫-২০ জন এফডিএমএন সদস্য স্বেচ্ছায় পাহারা দেয়। এই হিসাবে প্রতিরাতে পাহারা দিচ্ছে ৩ হাজার ৮৬০ জন। ১৫-২০ দিন পর একজনের পাহারার দায়িত্ব পড়ে। প্রতিদিন ক্যাম্পের চিফ মাঝির (এফডিএমএন ক্যাম্পের প্রধান নেতা) মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে পাহারাদারদের তালিকা পুলিশ ক্যাম্পে প্রেরণ করা হয়। এ ব্যবস্থায় পুলিশ তিন স্তরে ক্যাম্পের পাহারা দায়িত্ব মনিটরিং করে। প্রথম স্তর-ক্যাম্পের নির্দিষ্ট ডিউটি দল, দ্বিতীয় স্তর-ক্যাম্পের নিজস্ব তদারকি দল, এটির নেতৃত্বে থাকেন পুলিশ পরিদর্শক/এসআই। তৃতীয় স্তর-এএসপি/এডিশনাল এসপির নেতৃত্বে সব ক্যাম্পে পাহারা দায়িত্ব তদারকি করা হয়। সার্বিক তদারকি অধিনায়ক করে থাকেন। জালের মতো বিস্তৃত স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থায় দুষ্কৃতকারীরা পুলিশি অভিযানে একের পর এক গ্রেফতার হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় জঙ্গিবাদ, বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ, গোয়েন্দা তথ্য প্রাপ্তি সহজ হচ্ছে। ক্যাম্প এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

৮ এপিবিএন প্রবর্তিত স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থা কক্সবাজারের অন্য সব রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চালু হয়েছে। এখন ৩৩টি ক্যাম্পের ১ হাজার ৭৭৩টি সাব-ব্লকে ৫ জন করে মোট ৮ হাজার ৮৬৫ জন স্বেচ্ছা পাহারাদার পাহারা দেয়। ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক মোহাম্মদ সিহাব কায়সার খান বলেন, বিভিন্ন ব্লক, সাব ব্লক থেকে রোহিঙ্গা নিয়ে স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থা চালু করার আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। কিন্তু তা কাটিয়ে উঠে দ্রুত সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থা কারণে ক্যাম্পে অপরাধ প্রবণতা কমেছে। প্রতিনিয়ত দুষ্কৃতকারীরা ধরা পড়ছে। মাদক, অস্ত্র, স্বর্ণ উদ্ধার বেড়েছে বহুগুণ। সব মিলিয়ে ক্যাম্পে শান্তি সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। উখিয়ার জামতলী ১৫ ক্যাম্পের এইচ ব্লকের হেড মাঝি মো. বশির বলেন, স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা চালু হওয়ায় অপরাধ অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। কিছু দুষ্কৃতকারী পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পে আগুন দিয়ে যে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করতো তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প

স্বেচ্ছা পাহারায় অপরাধ কমেছে ৯৫ শতাংশ

মাদক, অস্ত্র ও স্বর্ণ উদ্ধার বেড়েছে কয়েকগুণ
 শফিক আজাদ, উখিয়া (কক্সবাজার) 
০৭ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো। খুন, গুম, ধর্ষণ, অপহরণ, মাদক, অস্ত্র, স্বর্ণ, চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড বাড়তে থাকে। ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ২০২১ সালের অক্টোবরে ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের নিয়ে প্রথম স্বেচ্ছায় পাহারার ব্যবস্থা চালু করেন ৮ এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম। এরপর থেকে পালটে যেতে শুরু করে চিত্র। কয়েক মাসের ব্যবধানের স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থা চালুর পর ক্যাম্পগুলোতে ৯৫ শতাংশ অপরাধ কমেছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, ক্যাম্পে দুষ্কৃতকারীদের অপতৎপরতাকে রুখে দিতে চালু করা হয় এফডিএমএন সদস্য দ্বারা স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থা। ২০২১ সালের ২৩ অক্টোবর শফিউল্লাহ কাটা ক্যাম্প-১৬ ও জামতলি ক্যাম্প-১৫ এর সব কর্মকর্তা ও মাঝিদের সঙ্গে স্বেচ্ছায় পাহারা নিয়ে সভা করি। পরে দুটি ক্যাম্পে এ ব্যবস্থা চালু করা হয়। দুটি পুলিশ ক্যাম্পের ১৪৭টি উপদলে পাঁচজন করে মোট ৭৩৫ জন স্বেচ্ছায় পাহারা দিতে থাকে। ১৫ দিন পর এই স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থার ফলাফল মূল্যায়ন করে দেখা গেল দুষ্কৃতকারীদের অপরাধ সংঘটন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

সূত্র জানায়, ৮ এপিবিএন ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি এফডিএমএন ক্যাম্প এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে। কিন্তু অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু হয় সেই বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি। স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থা চালুর আগে অর্থাৎ ২০২১ সালের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ৮.২৫ মাসে বিভিন্ন মামলায় ২০৮ জন দুষ্কৃতকারী গ্রেফতার, ২টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৯ রাউন্ড গুলি, ৯৪টি দেশীয় অস্ত্র, ৪ লাখ ১৯ হাজার ৮৮৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও ১৮ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার হয়।

অন্যদিকে স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থা চালুর পর থেকে অর্থাৎ ২০২১ সালের ২৩ অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ৮.২৪ মাসে বিভিন্ন মামলায় ৭৫৪ জন দুষ্কৃতকারী গ্রেফতার, ১৩টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৩৩ রাউন্ড গুলি, ১৪১টি দেশীয় অস্ত্র, ১৫ লাখ ৩৭ হাজার ১৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও প্রায় ৫০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার হয়। এ সময় ক্যাম্প ইতিহাসে প্রথম ক্লু-লেস হত্যার রহস্য উন্মোচিত হয়। জানা গেছে, ৮ এপিবিএনের অধীন ১১টি এফডিএমএন ক্যাম্পে ৬৪টি ব্লকে ৭৭২টি সাব-ব্লক রয়েছে। প্রতিরাতে একটি সাব-ব্লকে ৫/১০ জন করে পাহারা দিচ্ছে। প্রত্যেকটি ক্যাম্পের এক্সিট-এন্ট্রি পয়েন্টে পুলিশের সঙ্গে ১৫-২০ জন এফডিএমএন সদস্য স্বেচ্ছায় পাহারা দেয়। এই হিসাবে প্রতিরাতে পাহারা দিচ্ছে ৩ হাজার ৮৬০ জন। ১৫-২০ দিন পর একজনের পাহারার দায়িত্ব পড়ে। প্রতিদিন ক্যাম্পের চিফ মাঝির (এফডিএমএন ক্যাম্পের প্রধান নেতা) মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে পাহারাদারদের তালিকা পুলিশ ক্যাম্পে প্রেরণ করা হয়। এ ব্যবস্থায় পুলিশ তিন স্তরে ক্যাম্পের পাহারা দায়িত্ব মনিটরিং করে। প্রথম স্তর-ক্যাম্পের নির্দিষ্ট ডিউটি দল, দ্বিতীয় স্তর-ক্যাম্পের নিজস্ব তদারকি দল, এটির নেতৃত্বে থাকেন পুলিশ পরিদর্শক/এসআই। তৃতীয় স্তর-এএসপি/এডিশনাল এসপির নেতৃত্বে সব ক্যাম্পে পাহারা দায়িত্ব তদারকি করা হয়। সার্বিক তদারকি অধিনায়ক করে থাকেন। জালের মতো বিস্তৃত স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থায় দুষ্কৃতকারীরা পুলিশি অভিযানে একের পর এক গ্রেফতার হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় জঙ্গিবাদ, বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ, গোয়েন্দা তথ্য প্রাপ্তি সহজ হচ্ছে। ক্যাম্প এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

৮ এপিবিএন প্রবর্তিত স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থা কক্সবাজারের অন্য সব রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চালু হয়েছে। এখন ৩৩টি ক্যাম্পের ১ হাজার ৭৭৩টি সাব-ব্লকে ৫ জন করে মোট ৮ হাজার ৮৬৫ জন স্বেচ্ছা পাহারাদার পাহারা দেয়। ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক মোহাম্মদ সিহাব কায়সার খান বলেন, বিভিন্ন ব্লক, সাব ব্লক থেকে রোহিঙ্গা নিয়ে স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থা চালু করার আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। কিন্তু তা কাটিয়ে উঠে দ্রুত সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। স্বেচ্ছায় পাহারা ব্যবস্থা কারণে ক্যাম্পে অপরাধ প্রবণতা কমেছে। প্রতিনিয়ত দুষ্কৃতকারীরা ধরা পড়ছে। মাদক, অস্ত্র, স্বর্ণ উদ্ধার বেড়েছে বহুগুণ। সব মিলিয়ে ক্যাম্পে শান্তি সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। উখিয়ার জামতলী ১৫ ক্যাম্পের এইচ ব্লকের হেড মাঝি মো. বশির বলেন, স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা চালু হওয়ায় অপরাধ অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। কিছু দুষ্কৃতকারী পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পে আগুন দিয়ে যে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করতো তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন