কুমিল্লায় বন্ধ হয়ে গেছে দেড় শতাধিক খামার
jugantor
জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি
কুমিল্লায় বন্ধ হয়ে গেছে দেড় শতাধিক খামার
পোলট্রি শিল্পে বিপর্যয়

  আবুল খায়ের, কুমিল্লা  

০৯ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কুমিল্লায় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে পোলট্রি ফার্ম শিল্প। জেলায় ৩ হাজার ছোট-বড় পোলট্রি ফার্ম রয়েছে। সম্প্রতি দেড় শতাধিক ফার্ম বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সহস্রাধিক যুবক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এছাড়া অনেক পোলট্রি ফার্ম, খামার ও মৎস্য খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক মন্দা, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে খাদ্য এবং ওষুধের দাম বৃদ্ধির ফলে সম্ভাবনাময় এ শিল্পটি বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যথাযথ প্রণোদনা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে এ শিল্প নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশে সহজলভ্য হিসাবে মানুষের প্রাণিজ প্রোটিনের চাহিদা মেটাচ্ছে পোলট্রি মাংস ও ডিম। কুমিল্লায় প্রাণিজাত পণ্যের দৈনিক উৎপাদন মূল্য ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। জেলায় পোলট্রি শিল্পে জড়িত রয়েছেন প্রায় ৩ হাজার খামারি। এসব খামারে রয়েছে ব্রয়লার, লেয়ার ও সোনালি জাতের মোরগ-মুরগি। ৪৪৭টি লেয়ার মুরগির খামার থেকে প্রতিদিন ১৬ লাখ ৭০ হাজার ডিম উৎপাদন হয়। এক বছরে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৩ টন পোলট্রি মুরগির মাংস। এ ফার্মগুলোতে ৩০ থেকে ৩৫ দিনে বিক্রির উপযোগী হয় একটি ব্রয়লার মুরগি। এ সময়ে এক কেজি ওজনের একটি মুরগির উৎপাদন খরচ হয় প্রায় ১৩৫ টাকা। খামারিদের কাছ থেকে সেই মুরগিটি বিক্রেতারা কিনেছেন ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা দরে। এক মাস পরিচর্যার পর একটি মুরগি থেকে খামারির আয় মাত্র ৫-১০ টাকা।

ডিম বিক্রেতারা বলছেন, খুচরা বাজারে প্রতি ডিমে তাদের লাভ ৩০ থেকে ৫০ পয়সা। কুমিল্লায় এক হালি ডিম বিক্রি হয় ৪০ টাকায়। বাজারগুলোতে প্রতিদিনই উঠানামা করে পোলট্রি মুরগি ও ডিমের দাম। জেলায় ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও ঘাটতি রয়েছে মুরগি উৎপাদনে। ৩ হাজার পোলট্রি খামারি মাংস ও ডিমের জোগান দিচ্ছে। বৈশ্বিক প্রভাবে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক খামারিই লোকসানে পড়ে বন্ধ করে দিয়েছেন দীর্ঘদিনের পোলট্রি খামার। খামারিরা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় ৪০ শতাংশ বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়েনি ডিম ও মুরগির দাম। খামারিদের সংকট কাটাতে পোলট্রি মাংস ও ডিমের দাম নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিপণন অধিদপ্তর গঠন করা গেলে খামারিদের লোকসান কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ।

জেলার আদর্শ সদর উপজেলার কালিরবাজার ইউনিয়নের ধনুয়াখোলা এলাকার কলেজ শিক্ষক মজিবুর রহমান বাবুল ১৩ বছর আগে শুরু করেছেন পোলট্রি ও ফিশারিজ খামার। মাস্টার এগ্রো ফার্ম অ্যান্ড ফিশারিজ নামের ওই প্রতিষ্ঠানে ১০ হাজার মুরগির যত্নআত্তি করতে কাজ করছে বেশ কয়েকজন কর্মী। প্রতিদিন এখান থেকে ৮ হাজার ডিম বাজারে যাচ্ছে। এ ফার্মে মুরগির বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত হয়ে জৈবসার হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে সবজি উৎপাদনে। ডিম ও মুরগির উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত এই ব্যবসায়ী। একই উপজেলার রাজাপুর এলাকার রশিদ পোলট্রি ফার্মের মালিক আব্দুর রশীদ এবং পোলট্রি খামারি সাইফুল ইসলাম বলেন, খাদ্য ও ওষুধের দাম বৃদ্ধির ফলে আমরা প্রতিদিনই লোকসানের দিকে ধাবিত হচ্ছি। মুরগি ও ডিমের মার্কেট দর নির্ধারণ না হওয়ায় বাজার সিন্ডিকেট আমাদের জিম্মি করে কম মূল্যে পণ্য নিয়ে বেশি মূল্যে বিক্রি করছে। বাজারে মুরগি ও ডিমের দাম বাড়লেও মনিটরিং না থাকায় এর সুফল পাচ্ছি না। মধ্যস্বত্বভোগীরা লভ্যাংশ হাতিয়ে নিয়ে আমাদের শিল্পকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অবিলম্বে বাজার দর নির্ধারণ না করলে অসংখ্য খামার ও ফার্ম বন্ধ হয়ে যাবে। কুমিল্লা জেলা পোলট্রি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আব্দুল মালেক বলেন, পোলট্রি মুরগির মাংসের বাজার স্থিতিশীল নয়। কখনো ঊর্ধ্বমুখী আবার কখনো নিম্নমুখী। পোলট্রির খাদ্য ও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ধীরে ধীরে প্রান্তিক খামারিরা ঝরে যাবেন। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, করোনার ও বৈশ্বিক প্রভাবে বন্ধ হয়ে গেছে দেড়শ খামার। উদ্ভুত পরিস্থিতি ঠেকাতে কুমিল্লায় পোলট্রি ও ডেইরি খামারিদের ২৬ কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখতে মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং করছে জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়।

জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি

কুমিল্লায় বন্ধ হয়ে গেছে দেড় শতাধিক খামার

পোলট্রি শিল্পে বিপর্যয়
 আবুল খায়ের, কুমিল্লা 
০৯ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কুমিল্লায় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে পোলট্রি ফার্ম শিল্প। জেলায় ৩ হাজার ছোট-বড় পোলট্রি ফার্ম রয়েছে। সম্প্রতি দেড় শতাধিক ফার্ম বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সহস্রাধিক যুবক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এছাড়া অনেক পোলট্রি ফার্ম, খামার ও মৎস্য খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক মন্দা, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে খাদ্য এবং ওষুধের দাম বৃদ্ধির ফলে সম্ভাবনাময় এ শিল্পটি বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যথাযথ প্রণোদনা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে এ শিল্প নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশে সহজলভ্য হিসাবে মানুষের প্রাণিজ প্রোটিনের চাহিদা মেটাচ্ছে পোলট্রি মাংস ও ডিম। কুমিল্লায় প্রাণিজাত পণ্যের দৈনিক উৎপাদন মূল্য ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। জেলায় পোলট্রি শিল্পে জড়িত রয়েছেন প্রায় ৩ হাজার খামারি। এসব খামারে রয়েছে ব্রয়লার, লেয়ার ও সোনালি জাতের মোরগ-মুরগি। ৪৪৭টি লেয়ার মুরগির খামার থেকে প্রতিদিন ১৬ লাখ ৭০ হাজার ডিম উৎপাদন হয়। এক বছরে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৩ টন পোলট্রি মুরগির মাংস। এ ফার্মগুলোতে ৩০ থেকে ৩৫ দিনে বিক্রির উপযোগী হয় একটি ব্রয়লার মুরগি। এ সময়ে এক কেজি ওজনের একটি মুরগির উৎপাদন খরচ হয় প্রায় ১৩৫ টাকা। খামারিদের কাছ থেকে সেই মুরগিটি বিক্রেতারা কিনেছেন ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা দরে। এক মাস পরিচর্যার পর একটি মুরগি থেকে খামারির আয় মাত্র ৫-১০ টাকা।

ডিম বিক্রেতারা বলছেন, খুচরা বাজারে প্রতি ডিমে তাদের লাভ ৩০ থেকে ৫০ পয়সা। কুমিল্লায় এক হালি ডিম বিক্রি হয় ৪০ টাকায়। বাজারগুলোতে প্রতিদিনই উঠানামা করে পোলট্রি মুরগি ও ডিমের দাম। জেলায় ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও ঘাটতি রয়েছে মুরগি উৎপাদনে। ৩ হাজার পোলট্রি খামারি মাংস ও ডিমের জোগান দিচ্ছে। বৈশ্বিক প্রভাবে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক খামারিই লোকসানে পড়ে বন্ধ করে দিয়েছেন দীর্ঘদিনের পোলট্রি খামার। খামারিরা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় ৪০ শতাংশ বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়েনি ডিম ও মুরগির দাম। খামারিদের সংকট কাটাতে পোলট্রি মাংস ও ডিমের দাম নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিপণন অধিদপ্তর গঠন করা গেলে খামারিদের লোকসান কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ।

জেলার আদর্শ সদর উপজেলার কালিরবাজার ইউনিয়নের ধনুয়াখোলা এলাকার কলেজ শিক্ষক মজিবুর রহমান বাবুল ১৩ বছর আগে শুরু করেছেন পোলট্রি ও ফিশারিজ খামার। মাস্টার এগ্রো ফার্ম অ্যান্ড ফিশারিজ নামের ওই প্রতিষ্ঠানে ১০ হাজার মুরগির যত্নআত্তি করতে কাজ করছে বেশ কয়েকজন কর্মী। প্রতিদিন এখান থেকে ৮ হাজার ডিম বাজারে যাচ্ছে। এ ফার্মে মুরগির বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত হয়ে জৈবসার হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে সবজি উৎপাদনে। ডিম ও মুরগির উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত এই ব্যবসায়ী। একই উপজেলার রাজাপুর এলাকার রশিদ পোলট্রি ফার্মের মালিক আব্দুর রশীদ এবং পোলট্রি খামারি সাইফুল ইসলাম বলেন, খাদ্য ও ওষুধের দাম বৃদ্ধির ফলে আমরা প্রতিদিনই লোকসানের দিকে ধাবিত হচ্ছি। মুরগি ও ডিমের মার্কেট দর নির্ধারণ না হওয়ায় বাজার সিন্ডিকেট আমাদের জিম্মি করে কম মূল্যে পণ্য নিয়ে বেশি মূল্যে বিক্রি করছে। বাজারে মুরগি ও ডিমের দাম বাড়লেও মনিটরিং না থাকায় এর সুফল পাচ্ছি না। মধ্যস্বত্বভোগীরা লভ্যাংশ হাতিয়ে নিয়ে আমাদের শিল্পকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অবিলম্বে বাজার দর নির্ধারণ না করলে অসংখ্য খামার ও ফার্ম বন্ধ হয়ে যাবে। কুমিল্লা জেলা পোলট্রি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আব্দুল মালেক বলেন, পোলট্রি মুরগির মাংসের বাজার স্থিতিশীল নয়। কখনো ঊর্ধ্বমুখী আবার কখনো নিম্নমুখী। পোলট্রির খাদ্য ও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ধীরে ধীরে প্রান্তিক খামারিরা ঝরে যাবেন। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, করোনার ও বৈশ্বিক প্রভাবে বন্ধ হয়ে গেছে দেড়শ খামার। উদ্ভুত পরিস্থিতি ঠেকাতে কুমিল্লায় পোলট্রি ও ডেইরি খামারিদের ২৬ কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখতে মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং করছে জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও খবর