চিড়িয়াখানায় জীর্ণশীর্ণ প্রাণীর কান্না
jugantor
চিড়িয়াখানায় জীর্ণশীর্ণ প্রাণীর কান্না

  শিপন হাবীব  

২০ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কান্না

জাতীয় মিরপুর চিড়িয়াখানায় টিকিটের মূল্য বেশ চড়া। ৩০ টাকা থেকে লাফিয়ে ৫০ টাকায় ঠেকেছে। সামনে আরও বাড়তে পারে। কিন্তু দর্শনার্থীদের মনভরা, ভালো লাগার পশুপাখিসহ বিভিন্ন প্রাণীর বেশিরভাগই জীর্ণশীর্ণ।

কোনো কোনোটির পাঁজরের হাড় স্পষ্ট গোনা যায়। কোনোটি আবার ঝিমুচ্ছে। বেশি বয়স হয়ে গেছে অনেক হাতি কিংবা সিংহের। দর্শনার্থীরা আনন্দিত হওয়ার বদলে আফসোস করেন। কিছু সিংহ, ভালুক, বানর ও হাতির চোখের কোণে জল।

খাবার খেতে চাইছে না। ডাকলে সাড়া দিচ্ছে না। নীরব চোখে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টিতে অসুস্থতা আর দিশেহারা ভাব। হকার, কুকুর সমানতালে দখলে নিয়েছে চিড়িয়াখানা।

খাঁচা ঘিরে অব্যবস্থাপনা আর দুর্গন্ধ দর্শনার্থীদের অস্বস্তিতে ফেলছে। এদিকে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বমুখীর কারণে মাংসসহ খাবারের দাম বাড়াতে ঠিকাদাররা চাপ দিচ্ছে।

গত দুদিন সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, চিড়িয়াখানার বাইরে-ভেতরে অব্যবস্থাপনা ও সমানতালে অবৈধ হকারের দৌরাত্ম্য। বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত পুরো চিড়িয়াখানা ঘিরেই। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে আবর্জনা, খাবার সামগ্রীর অবশিষ্টাংশ।

খুব সহজেই ভেতরে খাবার নিয়ে ঢোকার সুযোগ থাকায় দর্শনার্থীদের কাছে এ যেন পিকনিট স্পট। চিড়িয়াখানাজুড়ে বানরের ন্যায় তৈরি করা ডাস্টবিনগুলোর ভেতর ভরে আছে ময়লা-আবর্জনায়। দর্শনার্থীদের বসার জায়গা এবং অ্যাপ্রোচ রোড নেই অনেক স্থানে।

সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বললেন, পুরো চিড়িয়াখানায় কুকুর আর ইঁদুরের জ্বালায় পশুপাখিরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সরেজমিন দেখাও গেল-বানর, শকুন, ময়ূর, পাখির খাঁচা ঘিরে ইদুরের উৎপাত। পশুপাখির খাবার নিয়ে যেতেও দেখা গেছে এদের।

অভিযোগ রয়েছে, প্রাণীগুলোকে দেয়া হচ্ছে চর্বি ও নিম্নমানের খাবার। খোদ এক কর্মচারী বলেন, মাংসসহ খাবার দেখভালের জন্য যারা রয়েছেন তাদের মধ্যেই সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। তারা কখনও থাকেন কখনও থাকেন না।

জানা গেছে, সপ্তাহে ৫ দিন চিড়িয়াখানার মাংসাশী প্রাণীদের জন্য গরু জবাই করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, জীর্ণশীর্ণ গরু কিনে এনে জবাই করা মাংস প্রাণীদের খেতে দেওয়া হয়। চিড়িয়াখানা অফিস সূত্রে জানা যায়, ১ কেজি গরুর মাংস কেনা হয় ৭৪৫ টাকায়।

ভারতীয় সিংহের খাঁচার সামনে গিয়ে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না এটিকে। অনেক দর্শনার্থী উঁকি মেরে সিংহ দেখার চেষ্টা করছিলেন। যখন দেখা মিলল, দেখা গেল জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় খাঁচার এক কোণায় পড়ে আছে।

নিঃশব্দ, অলস পড়ে থাকা সিংহের মুখ দিয়ে লালা পড়ছিল। পাশেই মাংস পড়ে আছে আবর্জনা ভরা বালিতে। সাদা সিংহের অবস্থাও খুব একটা ভালো নেই। নড়াচড়া করে না। জানা যায়, চিকিৎসার অভাবে বয়স্ক সিংহটি আগের মতো চলাফেরা করে না।

বার্ধক্যজনিত কারণে তার অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। এক কর্মকর্তা জানান, শুধু এ সিংহের বেলায় নয়, বাঘ, সিংহ, হায়েনাকে খাবার দেওয়ার স্থানগুলোতেও ২ থেকে ৫ ইঞ্চি বালির উপস্থিতি রয়েছে। মাংস কিংবা তাজা মুরগি দেয়া হলে ওই বালি মিশে খাবারের অনুপযোগী হয়ে ওঠে।

ভালুক দুটির অবস্থা বেশ নাজুক। খাঁচায় চিৎকার করছিল। উত্তরা থেকে আসা সজিব জানালেন, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এসেছেন পশুপাখি দেখতে। অধিকাংশ প্রাণীই মনমরা হয়ে আছে। খাঁচাসংলগ্ন পড়ে থাকা খাবার পচে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে।

খাঁচার চারপাশে ঘুরে দেখার সরু রাস্তাগুলো বেশ পিচ্ছিল। প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হন দর্শনার্থীরা।

বানর ও পাখির খাঁচা পাশাপাশি। একাধিক দর্শনার্থী জানান, এখানেও পচা মাছ ও ফলমূলের গন্ধে একাকার। আবার এও দেখা গেছে, দর্শনার্থীরা বিভিন্ন খাবার ছুড়ে দিচ্ছে বানর ও পাখির খাঁচায়।

খাবারের অংশ কখনও খাঁচার ভেতর আবার কখনও বাইরে পড়ছে। এসব নিয়ন্ত্রণে খাঁচার আশপাশে সংশ্লিষ্টদের কাউকে পাওয়া যায়নি। ফলে ইচ্ছেমতো কিছু দর্শনার্থী প্রাণীদের উত্ত্যক্ত করে।

সাপের খাঁচা ভরা শুধু অজগর সাপে। খাঁচাগুলোর চারপাশে আবর্জনা ভরা। কাচঘেরা খাঁচার ভেতরে থাকা অজগর খুব একটা দেখা যায় না। সায়েদাবাদ থেকে শিরীন-জুয়েল দম্পতি তাদের দুই কন্যাকে নিয়ে এসেছেন চিড়িয়াখানায়।

জুয়েল জানালেন, খাঁচার কাচগুলো ময়লা, ধুলাবালি লেগে হলদে হয়ে উঠেছে। ফলে খুব কাছ থেকেও সাপ দেখা যায় না। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার বক্তব্য, এ মুহূর্তে অজগরের সংখ্যা অনেক বেশি। বাকি খাঁচায় সাপ না থাকায়, অজগর রাখা হচ্ছে। বাচ্চাসহ প্রায় ১২৮টি অজগর রয়েছে।

৫টির মধ্যে একটি হাতির করুণ অবস্থা। তবে জিরাফগুলোর অবস্থা ভালো থাকায় দর্শনার্থীদের আনন্দ নিয়ে দেখা গেছে। এখানে ১টি মাত্র গণ্ডার রয়েছে। দায়িত্বে থাকা স্টাফ জানালেন, গণ্ডারটি বহু বছর ধরে একা। সঙ্গী নেই।

সব সময় মনমরা অবস্থায় থাকে। কয়েক বছর এর সঙ্গে একটি ছাগল দেয়া হয়েছিল। এখন সে বড়ই একা। শুয়ে শুয়ে সময় পার করে।

এদিকে জলহস্তী রয়েছে ১৪টি। যে জায়গা রয়েছে সেখানে মাত্র ৪টি থাকার কথা। অল্প জায়গায় অতিরিক্ত জলহস্তী থাকায় নিজেদের মধ্যে লড়াই লেগেই থাকে। শরীরে রক্ত ঝরতে দেখা গেছে।

যা দেখে বিশেষ করে শিশুরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষ বলছে, জলহস্তী কেউ নিচ্ছে না। অন্য কোনো চিড়িয়াখানায়ও দেওয়া যাচ্ছে না।

হরিণের সংখ্যা এখন ২৮৩টি। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৪২টি হরিণ বিক্রি করা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা করে। ১৩৮টি ময়ূর রয়েছে। এর মধ্যে গত অর্থবছরে ৬টি বিক্রি করা হয়।

এদিকে হরিণ দেখার যে স্থান রয়েছে, তা যথাযথ নয়। এবড়োখেবড়ো হয়ে আছে। আর হকারদের উৎপাত তো রয়েছেই। দর্শনার্থীদের কাজ থেকে অতিরিক্ত মূল্যে পানীয় জাতীয় খাবারসহ কলা, বিস্কুট, কেক বিক্রি করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিরাপত্তা প্রহরী জানান, হকাররা গেট দিয়েই প্রবেশ করে। এদের থেকে মাসোহারা পাচ্ছেন উধ্বর্তন কর্মকর্তা থেকে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও। এখানেও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। ইচ্ছে করলেও আমরা বাধা দিতে পারি না।

১৮৬ দশমিক ৬৩ একর জমিতে গড়ে ওঠা চিড়িয়াখানাটিতে ১২৮ প্রজাতির ৩০৬৫টি পশুপাখি রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এতগুলো পশুপাখির চিকিৎসায় মাত্র ৩ জন চিকিৎসক রয়েছে।

এর মধ্যেই সার্জন একজন। চিড়িয়াখানা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২৩৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ১৩৮ জন। খালি পদ রয়েছে ৯৯টি।

বিভিন্ন প্রাণীর শীর্ণ অবস্থা বিষয়ে চিড়িয়াখানার পরিচালক রফিকুল ইসলাম তালুকদার জানালেন, চিড়িয়াখানার অধিকাংশ প্রাণীই বনজঙ্গলের। ওই পরিবেশেই তারা স্বাধীন থাকে। আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকে।

এসব প্রাণী খাঁচায় বন্দি অবস্থায় রয়েছে। অনেক প্রাণীর যথেষ্ট বয়সও হয়েছে। এছাড়া ইচ্ছে করলেই খাঁচা এবং নির্ধারিত স্থানে বন্দি থাকা প্রাণীগুলোকে বেশি খাবার দিয়ে মোটাতাজা অবস্থায় রাখা যায় না।

পশুপাখির জন্য মাংসসহ যেসব খাবার দেওয়া হয়, তার জন্য নির্দিষ্ট কমিটি রয়েছে। কমিটির সদস্যরা নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছেন। কোনো অনিয়ম দুর্নীতির সুযোগ নেই। আমাদের লোকবল স্বল্পতা রয়েছে। নিশ্চয় নিয়োগ হবে। এমন সমস্যা থাকবে না।

চিড়িয়াখানায় জীর্ণশীর্ণ প্রাণীর কান্না

 শিপন হাবীব 
২০ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
কান্না
অসুস্থ সিংহটি এখন মৃতপ্রায়- যুগান্তর

জাতীয় মিরপুর চিড়িয়াখানায় টিকিটের মূল্য বেশ চড়া। ৩০ টাকা থেকে লাফিয়ে ৫০ টাকায় ঠেকেছে। সামনে আরও বাড়তে পারে। কিন্তু দর্শনার্থীদের মনভরা, ভালো লাগার পশুপাখিসহ বিভিন্ন প্রাণীর বেশিরভাগই জীর্ণশীর্ণ।

কোনো কোনোটির পাঁজরের হাড় স্পষ্ট গোনা যায়। কোনোটি আবার ঝিমুচ্ছে। বেশি বয়স হয়ে গেছে অনেক হাতি কিংবা সিংহের। দর্শনার্থীরা আনন্দিত হওয়ার বদলে আফসোস করেন। কিছু সিংহ, ভালুক, বানর ও হাতির চোখের কোণে জল।

খাবার খেতে চাইছে না। ডাকলে সাড়া দিচ্ছে না। নীরব চোখে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টিতে অসুস্থতা আর দিশেহারা ভাব। হকার, কুকুর সমানতালে দখলে নিয়েছে চিড়িয়াখানা।

খাঁচা ঘিরে অব্যবস্থাপনা আর দুর্গন্ধ দর্শনার্থীদের অস্বস্তিতে ফেলছে। এদিকে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বমুখীর কারণে মাংসসহ খাবারের দাম বাড়াতে ঠিকাদাররা চাপ দিচ্ছে। 

গত দুদিন সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, চিড়িয়াখানার বাইরে-ভেতরে অব্যবস্থাপনা ও সমানতালে অবৈধ হকারের দৌরাত্ম্য। বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত পুরো চিড়িয়াখানা ঘিরেই। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে আবর্জনা, খাবার সামগ্রীর অবশিষ্টাংশ।

খুব সহজেই ভেতরে খাবার নিয়ে ঢোকার সুযোগ থাকায় দর্শনার্থীদের কাছে এ যেন পিকনিট স্পট। চিড়িয়াখানাজুড়ে বানরের ন্যায় তৈরি করা ডাস্টবিনগুলোর ভেতর ভরে আছে ময়লা-আবর্জনায়। দর্শনার্থীদের বসার জায়গা এবং অ্যাপ্রোচ রোড নেই অনেক স্থানে। 

সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বললেন, পুরো চিড়িয়াখানায় কুকুর আর ইঁদুরের জ্বালায় পশুপাখিরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সরেজমিন দেখাও গেল-বানর, শকুন, ময়ূর, পাখির খাঁচা ঘিরে ইদুরের উৎপাত। পশুপাখির খাবার নিয়ে যেতেও দেখা গেছে এদের।

অভিযোগ রয়েছে, প্রাণীগুলোকে দেয়া হচ্ছে চর্বি ও নিম্নমানের খাবার। খোদ এক কর্মচারী বলেন, মাংসসহ খাবার দেখভালের জন্য যারা রয়েছেন তাদের মধ্যেই সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। তারা কখনও থাকেন কখনও থাকেন না। 

জানা গেছে, সপ্তাহে ৫ দিন চিড়িয়াখানার মাংসাশী প্রাণীদের জন্য গরু জবাই করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, জীর্ণশীর্ণ গরু কিনে এনে জবাই করা মাংস প্রাণীদের খেতে দেওয়া হয়। চিড়িয়াখানা অফিস সূত্রে জানা যায়, ১ কেজি গরুর মাংস কেনা হয় ৭৪৫ টাকায়। 

ভারতীয় সিংহের খাঁচার সামনে গিয়ে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না এটিকে। অনেক দর্শনার্থী উঁকি মেরে সিংহ দেখার চেষ্টা করছিলেন। যখন দেখা মিলল, দেখা গেল জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় খাঁচার এক কোণায় পড়ে আছে।

নিঃশব্দ, অলস পড়ে থাকা সিংহের মুখ দিয়ে লালা পড়ছিল। পাশেই মাংস পড়ে আছে আবর্জনা ভরা বালিতে। সাদা সিংহের অবস্থাও খুব একটা ভালো নেই। নড়াচড়া করে না। জানা যায়, চিকিৎসার অভাবে বয়স্ক সিংহটি আগের মতো চলাফেরা করে না।

বার্ধক্যজনিত কারণে তার অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। এক কর্মকর্তা জানান, শুধু এ সিংহের বেলায় নয়, বাঘ, সিংহ, হায়েনাকে খাবার দেওয়ার স্থানগুলোতেও ২ থেকে ৫ ইঞ্চি বালির উপস্থিতি রয়েছে। মাংস কিংবা তাজা মুরগি দেয়া হলে ওই বালি মিশে খাবারের অনুপযোগী হয়ে ওঠে। 

ভালুক দুটির অবস্থা বেশ নাজুক। খাঁচায় চিৎকার করছিল। উত্তরা থেকে আসা সজিব জানালেন, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এসেছেন পশুপাখি দেখতে। অধিকাংশ প্রাণীই মনমরা হয়ে আছে। খাঁচাসংলগ্ন পড়ে থাকা খাবার পচে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে।

খাঁচার চারপাশে ঘুরে দেখার সরু রাস্তাগুলো বেশ পিচ্ছিল। প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হন দর্শনার্থীরা। 

বানর ও পাখির খাঁচা পাশাপাশি। একাধিক দর্শনার্থী জানান, এখানেও পচা মাছ ও ফলমূলের গন্ধে একাকার। আবার এও দেখা গেছে, দর্শনার্থীরা বিভিন্ন খাবার ছুড়ে দিচ্ছে বানর ও পাখির খাঁচায়।

খাবারের অংশ কখনও খাঁচার ভেতর আবার কখনও বাইরে পড়ছে। এসব নিয়ন্ত্রণে খাঁচার আশপাশে সংশ্লিষ্টদের কাউকে পাওয়া যায়নি। ফলে ইচ্ছেমতো কিছু দর্শনার্থী প্রাণীদের উত্ত্যক্ত করে। 

সাপের খাঁচা ভরা শুধু অজগর সাপে। খাঁচাগুলোর চারপাশে আবর্জনা ভরা। কাচঘেরা খাঁচার ভেতরে থাকা অজগর খুব একটা দেখা যায় না। সায়েদাবাদ থেকে শিরীন-জুয়েল দম্পতি তাদের দুই কন্যাকে নিয়ে এসেছেন চিড়িয়াখানায়।

জুয়েল জানালেন, খাঁচার কাচগুলো ময়লা, ধুলাবালি লেগে হলদে হয়ে উঠেছে। ফলে খুব কাছ থেকেও সাপ দেখা যায় না। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার বক্তব্য, এ মুহূর্তে অজগরের সংখ্যা অনেক বেশি। বাকি খাঁচায় সাপ না থাকায়, অজগর রাখা হচ্ছে। বাচ্চাসহ প্রায় ১২৮টি অজগর রয়েছে। 

৫টির মধ্যে একটি হাতির করুণ অবস্থা। তবে জিরাফগুলোর অবস্থা ভালো থাকায় দর্শনার্থীদের আনন্দ নিয়ে দেখা গেছে। এখানে ১টি মাত্র গণ্ডার রয়েছে। দায়িত্বে থাকা স্টাফ জানালেন, গণ্ডারটি বহু বছর ধরে একা। সঙ্গী নেই।

সব সময় মনমরা অবস্থায় থাকে। কয়েক বছর এর সঙ্গে একটি ছাগল দেয়া হয়েছিল। এখন সে বড়ই একা। শুয়ে শুয়ে সময় পার করে। 

এদিকে জলহস্তী রয়েছে ১৪টি। যে জায়গা রয়েছে সেখানে মাত্র ৪টি থাকার কথা। অল্প জায়গায় অতিরিক্ত জলহস্তী থাকায় নিজেদের মধ্যে লড়াই লেগেই থাকে। শরীরে রক্ত ঝরতে দেখা গেছে।

যা দেখে বিশেষ করে শিশুরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষ বলছে, জলহস্তী কেউ নিচ্ছে না। অন্য কোনো চিড়িয়াখানায়ও দেওয়া যাচ্ছে না। 

হরিণের সংখ্যা এখন ২৮৩টি। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৪২টি হরিণ বিক্রি করা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা করে। ১৩৮টি ময়ূর রয়েছে। এর মধ্যে গত অর্থবছরে ৬টি বিক্রি করা হয়।

এদিকে হরিণ দেখার যে স্থান রয়েছে, তা যথাযথ নয়। এবড়োখেবড়ো হয়ে আছে। আর হকারদের উৎপাত তো রয়েছেই। দর্শনার্থীদের কাজ থেকে অতিরিক্ত মূল্যে পানীয় জাতীয় খাবারসহ কলা, বিস্কুট, কেক বিক্রি করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিরাপত্তা প্রহরী জানান, হকাররা গেট দিয়েই প্রবেশ করে। এদের থেকে মাসোহারা পাচ্ছেন উধ্বর্তন কর্মকর্তা থেকে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও। এখানেও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। ইচ্ছে করলেও আমরা বাধা দিতে পারি না। 

১৮৬ দশমিক ৬৩ একর জমিতে গড়ে ওঠা চিড়িয়াখানাটিতে ১২৮ প্রজাতির ৩০৬৫টি পশুপাখি রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এতগুলো পশুপাখির চিকিৎসায় মাত্র ৩ জন চিকিৎসক রয়েছে।

এর মধ্যেই সার্জন একজন। চিড়িয়াখানা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২৩৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ১৩৮ জন। খালি পদ রয়েছে ৯৯টি। 

বিভিন্ন প্রাণীর শীর্ণ অবস্থা বিষয়ে চিড়িয়াখানার পরিচালক রফিকুল ইসলাম তালুকদার জানালেন, চিড়িয়াখানার অধিকাংশ প্রাণীই বনজঙ্গলের। ওই পরিবেশেই তারা স্বাধীন থাকে। আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকে।

এসব প্রাণী খাঁচায় বন্দি অবস্থায় রয়েছে। অনেক প্রাণীর যথেষ্ট বয়সও হয়েছে। এছাড়া ইচ্ছে করলেই খাঁচা এবং নির্ধারিত স্থানে বন্দি থাকা প্রাণীগুলোকে বেশি খাবার দিয়ে মোটাতাজা অবস্থায় রাখা যায় না।

পশুপাখির জন্য মাংসসহ যেসব খাবার দেওয়া হয়, তার জন্য নির্দিষ্ট কমিটি রয়েছে। কমিটির সদস্যরা নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছেন। কোনো অনিয়ম দুর্নীতির সুযোগ নেই। আমাদের লোকবল স্বল্পতা রয়েছে। নিশ্চয় নিয়োগ হবে। এমন সমস্যা থাকবে না।
 

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন