নেশায় বুঁদ তারুণ্য
jugantor
১৪ বছরে জব্দ মাদক বেড়েছে হাজার গুণ
নেশায় বুঁদ তারুণ্য
সবার আগে নিজেকেই নিজে প্রতিরোধ করতে হবে -ডা. মোহিত কামাল * মাদক আসলে মৃত্যুর সমার্থক-অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম খান

  শিপন হাবীব   

২৫ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর ধনাঢ্য পরিবারের এক তরুণী। মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হওয়ার আগে থেকেই ইয়াবা আসক্ত। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি কলেজে পড়ছেন। তার মাদকাসক্তির বিষয়টি প্রথমদিকে কাউকে বলতেন না পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু এখন তারা অতিষ্ঠ। তরুণীর মা জানান, তার স্বামী ইতালি থাকেন। সেখানে ব্যবসা করেন। ঢাকায় ছয়তলা বাড়ি রয়েছে তাদের। মেয়ের সঙ্গে একমাত্র ছেলেও এখন মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। ক্রিস্টাল, এলএসডি, আইসের মতো ভয়ানক মাদকের নেশায় বুঁদ তারা। সন্তানদের বাধা দেওয়ায় দুবার আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। তিনি বলেন, আমাদের মতো অনেক মা-বাবা ঘরে বসেই টের পাচ্ছে, মাদক কতটা ভয়ংকর।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত ১৪ বছরে জব্দ মাদকের সংখ্যা হাজার গুণ বেড়েছে। ২০০৯ সালে দেশে ইয়াবা জব্দ হয় ৪ হাজার পিস। আর চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত জব্দ হয়েছে প্রায় ৪৫ লাখ। এ সময়ের মধ্যে অভিযান, মামলা, আসামির সংখ্যাও বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ। পুলিশ ও বিজিবির জব্দ তালিকা আরও বেশি। গত দুই বছরে র‌্যাব প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার মাদক জব্দ করেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ইয়াবা। ওই সময়ের মধ্যে ৩৬ হাজার মাদক চোরাকারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শুধু বিজিবির কক্সবাজার রিজিয়ন গত বছর ৫৩৫ কোটি টাকার ইয়াবাসহ অন্য মাদক ধ্বংস করেছে। যেখানে প্রায় ১ কোটি পিস ইয়াবা ছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের তরুণরাই আগামীর বাংলাদেশ গড়বে। কিন্তু তারাই আসক্ত হয়ে পড়ছে সর্বনাশা মাদকে। এতে তারুণ্যের শক্তি আজ ধ্বংসের পথে। ফুটপাত থেকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল পর্যন্ত মাদকের ভয়াল থাবা। অভিযানে যৎসামান্য জব্দ ও আসামি গ্রেফতার হলেও মাদক মামলায় প্রায় ৬৬ শতাংশই খালাস পেয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে সরকারিভাবে মাদকাসক্তদের নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও বেসরকারি এক হিসাবে দেশে প্রায় ৭৫ লাখের বেশি মাদকসেবী রয়েছে। এছাড়া সিডেটিভ-ঘুমের ওষুধ জাতীয় এবং হ্যালুসিনেশন-বিভ্রম সৃষ্টিকারী মাদকসেবীর সংখ্যাও অনেক। যার প্রায় ৮০ শতাংশই যুবক।

জানা যায়, ইয়াবার সঙ্গে নতুন নতুন ভয়ানক মাদক যুক্ত হচ্ছে। নতুন মাদকে আসক্তদের মধ্যে প্রায় শতভাগই তরুণ-তরুণী। ক্রিস্টাল, মেথম, আইস, এলএসডি, হ্যাসিস, কোকেন, হেরোইন ছাড়াও নাইট্রোসাম, স্প্যাজমোপ্রক্সিভন, সেকোবারবিটাল, ফেনমেট্রাজিল, মিথাকুইনোন, অ্যালপ্রাজোলাম, অ্যাটিভান, ক্যাস্পোস এমন বহু মাদকে আসক্ত হচ্ছে তরুণ-তরুণীরা।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন যুগান্তরকে বলেন, মাদকাসক্তদের বেশিরভাগই তরুণ-তরুণী। আইন কিংবা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। এজন্য সমাজের সব স্টেক হোল্ডার একসঙ্গে কাজ করতে হবে। অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি সমন্বয়ে মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো জরুরি। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল যুগান্তরকে বলেন, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সব বয়সিদের মধ্যে মাদক ছড়িয়ে পড়ছে। মাদক নির্মূলে সবার আগে নিজেকেই নিজে প্রতিরোধ করতে হবে। আমার সামনে মাদক আছে-আমি মাদক খাব না-এটাই প্রতিজ্ঞা হতে হবে যুবদের।

তিনি আরও বলেন, মাদক একটি রাসায়নিক দ্রব্য। আমাদের মস্তিষ্ক একটি রাসায়নিকের কারখানা। সঙ্গে পুরো দেহটিও। যখন মাদক ভেতরে ঢুকে তখন মানুষটাকে বদলে দেয়। কিশোর-তরুণরা যেন মনে রাখে-কেন আমি আমার ভেতরে মরণ রাসায়নিক দ্রব্য ঢুকাব। যাতে সাময়িক মজার জন্য পুরো জীবনটাই ধ্বংসের মধ্যে চলে যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম খান বলেন, সমাজের প্রতিটি মানুষকে বোঝাতে হবে, মাদক আসলে মৃত্যুর সমার্থক। সবাইকে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।

১৪ বছরে জব্দ মাদক বেড়েছে হাজার গুণ

নেশায় বুঁদ তারুণ্য

সবার আগে নিজেকেই নিজে প্রতিরোধ করতে হবে -ডা. মোহিত কামাল * মাদক আসলে মৃত্যুর সমার্থক-অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম খান
 শিপন হাবীব  
২৫ নভেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর ধনাঢ্য পরিবারের এক তরুণী। মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হওয়ার আগে থেকেই ইয়াবা আসক্ত। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি কলেজে পড়ছেন। তার মাদকাসক্তির বিষয়টি প্রথমদিকে কাউকে বলতেন না পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু এখন তারা অতিষ্ঠ। তরুণীর মা জানান, তার স্বামী ইতালি থাকেন। সেখানে ব্যবসা করেন। ঢাকায় ছয়তলা বাড়ি রয়েছে তাদের। মেয়ের সঙ্গে একমাত্র ছেলেও এখন মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। ক্রিস্টাল, এলএসডি, আইসের মতো ভয়ানক মাদকের নেশায় বুঁদ তারা। সন্তানদের বাধা দেওয়ায় দুবার আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। তিনি বলেন, আমাদের মতো অনেক মা-বাবা ঘরে বসেই টের পাচ্ছে, মাদক কতটা ভয়ংকর। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত ১৪ বছরে জব্দ মাদকের সংখ্যা হাজার গুণ বেড়েছে। ২০০৯ সালে দেশে ইয়াবা জব্দ হয় ৪ হাজার পিস। আর চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত জব্দ হয়েছে প্রায় ৪৫ লাখ। এ সময়ের মধ্যে অভিযান, মামলা, আসামির সংখ্যাও বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ। পুলিশ ও বিজিবির জব্দ তালিকা আরও বেশি। গত দুই বছরে র‌্যাব প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার মাদক জব্দ করেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ইয়াবা। ওই সময়ের মধ্যে ৩৬ হাজার মাদক চোরাকারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শুধু বিজিবির কক্সবাজার রিজিয়ন গত বছর ৫৩৫ কোটি টাকার ইয়াবাসহ অন্য মাদক ধ্বংস করেছে। যেখানে প্রায় ১ কোটি পিস ইয়াবা ছিল। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের তরুণরাই আগামীর বাংলাদেশ গড়বে। কিন্তু তারাই আসক্ত হয়ে পড়ছে সর্বনাশা মাদকে। এতে তারুণ্যের শক্তি আজ ধ্বংসের পথে। ফুটপাত থেকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল পর্যন্ত মাদকের ভয়াল থাবা। অভিযানে যৎসামান্য জব্দ ও আসামি গ্রেফতার হলেও মাদক মামলায় প্রায় ৬৬ শতাংশই খালাস পেয়ে যাচ্ছে। 
বাংলাদেশে সরকারিভাবে মাদকাসক্তদের নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও বেসরকারি এক হিসাবে দেশে প্রায় ৭৫ লাখের বেশি মাদকসেবী রয়েছে। এছাড়া সিডেটিভ-ঘুমের ওষুধ জাতীয় এবং হ্যালুসিনেশন-বিভ্রম সৃষ্টিকারী মাদকসেবীর সংখ্যাও অনেক। যার প্রায় ৮০ শতাংশই যুবক। 

জানা যায়, ইয়াবার সঙ্গে নতুন নতুন ভয়ানক মাদক যুক্ত হচ্ছে। নতুন মাদকে আসক্তদের মধ্যে প্রায় শতভাগই তরুণ-তরুণী। ক্রিস্টাল, মেথম, আইস, এলএসডি, হ্যাসিস, কোকেন, হেরোইন ছাড়াও নাইট্রোসাম, স্প্যাজমোপ্রক্সিভন, সেকোবারবিটাল, ফেনমেট্রাজিল, মিথাকুইনোন, অ্যালপ্রাজোলাম, অ্যাটিভান, ক্যাস্পোস এমন বহু মাদকে আসক্ত হচ্ছে তরুণ-তরুণীরা। 

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন যুগান্তরকে বলেন, মাদকাসক্তদের বেশিরভাগই তরুণ-তরুণী। আইন কিংবা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। এজন্য সমাজের সব স্টেক হোল্ডার একসঙ্গে কাজ করতে হবে। অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি সমন্বয়ে মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো জরুরি। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল যুগান্তরকে বলেন, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সব বয়সিদের মধ্যে মাদক ছড়িয়ে পড়ছে। মাদক নির্মূলে সবার আগে নিজেকেই নিজে প্রতিরোধ করতে হবে। আমার সামনে মাদক আছে-আমি মাদক খাব না-এটাই প্রতিজ্ঞা হতে হবে যুবদের।

তিনি আরও বলেন, মাদক একটি রাসায়নিক দ্রব্য। আমাদের মস্তিষ্ক একটি রাসায়নিকের কারখানা। সঙ্গে পুরো দেহটিও। যখন মাদক ভেতরে ঢুকে তখন মানুষটাকে বদলে দেয়। কিশোর-তরুণরা যেন মনে রাখে-কেন আমি আমার ভেতরে মরণ রাসায়নিক দ্রব্য ঢুকাব। যাতে সাময়িক মজার জন্য পুরো জীবনটাই ধ্বংসের মধ্যে চলে যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম খান বলেন, সমাজের প্রতিটি মানুষকে বোঝাতে হবে, মাদক আসলে মৃত্যুর সমার্থক। সবাইকে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন