বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস খুলনা

তদন্তে অস্বাভাবিক বিলম্ব গ্রাহক হয়রানি চরমে

  নূর ইসলাম রকি, খুলনা ব্যুরো ১৯ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাসপোর্ট

নগরীর বৈকালী বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসে সোমবার দুপুরে ঢুকতেই চোখে পড়ল এক ব্যক্তির হাতে ৪টি নতুন পাসপোর্টের আবেদন।

তিনি কোনো বাধা ছাড়াই একাধিক পাসপোর্টের আবেদনপত্র নিয়ে অফিসের মধ্যে ঢুকে নিমেষেই পাসপোর্টের আবেদন যাচাই থেকে ছবি তোলা পর্যন্ত সব কাজ শেষ করলেন।

কোথাও তাকে কোনো হয়রানির শিকার হতে হয়নি। কারণ তিনি খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের নগর বিশেষ শাখার (সিটি এসবি) কর্মকর্তা। এমন চিত্র প্রায় নিত্যদিনের।

পাশাপাশি মোবাইল ফোন কলের মাধ্যমে অনেক পাসপোর্ট গ্রাহকের জন্য সুপারিশ করেন একশ্রেণীর পুলিশ সদস্য। এই অভিযোগ অনেক দিনের। এদিকে জরুরি পাসপোর্টের ক্ষেত্রেও তদন্তে অস্বাভাবিক বিলম্বের কারণে গ্রাহক হয়রানি চরমে উঠেছে।

অন্যদিকে কেএমপির অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার সোনালী সেন যুগান্তরকে বলেন, মাঝে মধ্যে দু-একটি অনুরোধ অনেকেই করতে পারেন। তবে পাসপোর্ট অফিসের মধ্যে বিশেষ শাখার কর্মকর্তাদের অবস্থান করার কোনো এখতিয়ার নেই। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পুলিশ ক্লিয়ারেন্সে প্রকৃত ঘটনা উঠে আসবে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেয়া হবে না। নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন মেনে নিয়েই পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দেয়া হয়।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসার জন্য বিদেশ গমন ও হজযাত্রীরাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নগর বিশেষ শাখা (সিটিএসবি) এবং জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সহায়তায় দ্রুততম সময়ে পাসপোর্ট করায়।

সাধারণভাবে পাসপোর্ট পেতে সরকারি ফি হিসেবে ৩৪৫০ টাকা ব্যাংকে জমা দিতে হয়। আর জরুরিভাবে পাসপোর্ট পেতে নির্ধারিত ফি ৬ হাজার টাকার ওপরে হলেও ক্ষেত্র বিশেষে ৮-১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেয় পুলিশের বিশেষ শাখার একশ্রেণীর সদস্য।

প্রথম কারণটি হল বিশেষ শাখার সদস্যদের মাধ্যমে গেলে পাসপোর্ট অফিসে কোনো ধরনের হয়রানি হবে না এবং দ্বিতীয় কারণ পুলিশ ক্লিয়ারেন্সে সময় লাগবে না। এ বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস ও খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হলে তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন বলে স্বীকার করেন।

তবে পাসপোর্ট গ্রাহকরা লিখিত কোনো অভিযোগ না দেয়ার কারণে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডের সিটিএসবি এবং জেলার এসবি কর্মকর্তা বেশির ভাগই গ্রাহকদের কাছ থেকে বিভিন্ন খরচ দেখিয়ে পাসপোর্টের জমার টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত ২-৩ হাজার টাকা করে গ্রহণ করেন।

পাসপোর্ট অফিসের খরচ ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য এই অতিরিক্ত টাকা নেয়া হয়। এক্ষেত্রে যারা বিশেষ শাখার পুলিশের সহযোগিতা ছাড়া পাসপোর্টের আবেদন জমা দেন তাদেরও পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের টাকার হাত থেকে রক্ষা নেই।

এক্ষেত্রে পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের কথা বলে আবেদনকারীকে মোবাইল করা হয়। এরপর গ্রাহকের বাড়ির একটি বিদ্যুৎ বিলের কপি নেয়া হয়। পাশাপাশি আসা-যাওয়া বাবদ এবং ওপরের অফিসারের খরচ বাবদ দেয়া লাগে ন্যূনতম ৫শ’ থেকে ১ হাজার টাকা হারে।

এদিকে জরুরি ফি জমা দিয়ে পাসপোর্টের আবেদন করে তিন মাস বয়সের শিশুর পুলিশি ক্লিয়ারেন্স পেতে সময় লাগে দেড় মাস। শিশু আফরিন সুহার ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছে, যার দায় পুলিশের কোন বিভাগের তা তারা নিজেরাই বলতে পারছেন না। আফরিন সুহার বর্তমান অবস্থান তার মামাবাড়ি খুলনা নগরীর মহেশ্বরপাশায়। এখানেই তার জন্ম। পিতার ঠিকানা বগুড়া সদরের নিশিন্দা শাহাপাড়া। ৪ জুন তার মা শিশু কন্যার জন্য পাসপোর্ট পেতে জরুরি ফি ব্যাংকে জমা দিয়ে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রসহ আবেদন খুলনা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে জমা দেন। কিন্তু ১৭ জুলাই পর্যন্ত তার পাসপোর্টের কোনো খবর হয়নি। এভাবেই জরুরি ফির পাসপোর্ট পেতে কেটে গেছে দেড় মাস। কিন্তু এখনও কোনো সুরাহা হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেএমপির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সিটিএসবির এই বিষয়টি আমরা জানি। কিন্তু কোনো লিখিত অভিযোগ না থাকায় ব্যবস্থা নিতে পারি না।’ তবে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে পাসপোর্ট করানো এবং পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের নামে টাকা নেয়ার বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। সম্প্রতি এ বিষয়ে সবাইকে সতর্কও করা হয়েছে।

খুলনা বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের পরিচালক মো. আবু সাইদ যুগান্তরকে এ বিষয়ে বলেন, বিভাগীয় অফিসের মধ্যে কোনো দালাল প্রবেশ করতে পারে না। একাধিক ক্যামেরা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সতর্কতার কারণে একই ব্যক্তি একাধিকবার পাসপোর্টের আবেদন নিয়ে ভেতরে আসতে সাহস পায় না। তবে শহরের বিভিন্ন স্থানে পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের হয়রানি করা হয়। বিষয়টি লিখিতভাবে ১৫ মার্চ কেএমপিকে জানানো হয়েছে। পাসপোর্ট অফিসের মধ্যে সিটিএসবির অনেক কর্মকর্তা ঘোরাঘুরি করেন বলে একাধিকবার শুনেছি। অনেক সময় তারা বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সুপারিশ নিয়ে আসেন। তবে কোনো গ্রাহক কখনই দালালদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেয় না এটাই সত্য।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter