ভুয়া ডাক্তারদের দৌরাত্ম্যে প্রতারিত খুলনার মানুষ

  আহমদ মুসা রঞ্জু, খুলনা ব্যুরো ২৮ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভুয়া ডাক্তারদের দৌরাত্ম্যে প্রতারিত খুলনার মানুষ

খুলনায় ভুয়া ডাক্তারের দৌরাত্ম্য থামানো যাচ্ছে না। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) মাঝে-মধ্যে অভিযান চালিয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলেও কিছু দিন যেতে না যেতেই সেই আগের অবস্থা।

ভিজিটিং কার্ডে নানা ডিগ্রি ব্যবহার করে সহজ-সরল রোগীদের প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। তাদের সহযোগিতার জন্য একটি দালাল চক্রও সক্রিয় রয়েছে শহরজুড়ে।

এদেরই একজন ডা. কামরুজ্জামান। খুলনা নগরীর শিপইয়ার্ড মেইন রোডের আল আমিন স্কুলের পাশে আরাফাত হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক তিনি।

বছরখানেক আগে র‌্যাবের অভিযানে ভুয়া চিকিৎসক হিসেবে ডা. কামরুজ্জামান ও নিজাম উদ্দিন নয়নকে জরিমানা করে হাসপাতালটিই বন্ধ করে দেয়া হয়। কয়েক মাস ধরে হাসপাতালটি পুনরায় চালু করা হয়েছে। তার দাবি, তিনি ২০০৫ সালে বাংলাদেশ গ্লোবাল ইন্সটিটিউট থেকে ডিপ্লোমা (ডিএমএফ) ডিগ্রি নিয়েছেন। ভিজিটিং কার্ডে এমবিবিএস ডিগ্রি লিখে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডা. কামরুজ্জামান প্রথম দিকে রূপসায় ড্যাপস হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চাকরি শুরু করেন। কিছু দিনের মধ্যেই তিনি প্রেসক্রিপশন এবং ভিজিডিং কার্ডে এমবিবিএস, এম ঢাকা লেখা শুরু করেন।

তিনি নিজেকে মেডিসিন ও সার্জারি বিশেষজ্ঞ পরিচয় দিচ্ছেন। ২০১৬ সালের ৯ এপ্রিল তার ভুল চিকিৎসায় রূপসা চর বস্তির হাফিজা বেগম নামের এক রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া যায়।

এমবিবিএস সনদ নিয়ে জানতে চাইলে ডা. কামরুজ্জামান বলেন, ‘আমি বাংলাদেশ গ্লোবাল ইন্সটিটিউট থেকে এমবিবিএস ডিপ্লোমা কোর্স করেছি। সার্টিফিকেটও দিয়েছে। মূল্য না থাকলে সরকার কেন এসব প্রতিষ্ঠান চালুর অনুমতি দিয়েছে? খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুলনার সদ্য সাবেক ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মঈন উদ্দিন মোল্লা ওই ক্লিনিকেই প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন।’

খুলনার সিভিল সার্জন আবদুর রাজ্জাক এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘র‌্যাবের অভিযান চালানোর পর আবার সেটি চালু হয়েছে কিনা জানি না। খোঁজ নেব।’ ডা. মঈন উদ্দীন মোল্লার প্র্যাকটিসের বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই।’ এসব নিয়ে নানা কথা চালু আছে।

নগরীর শান্তিধাম মোড়ে চেম্বার নিয়ে বসেছেন ডা. গোলাম মাসুদ মৃধা। তিনিও নিজেকে এমবিবিএস পাস বলে দাবি করছেন। ঢাকায় বাংলাদেশ কম্বাইন্ড মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল থেকে তিনি এমবিবিএস ডিগ্রি নেয়ার দাবি করেছেন।

২০১৪ সালে র‌্যাব-৬ তার চেম্বারে অভিযান চালায়। তখন তাকে ভুয়া চিকিৎসক অবহিত করা হয়। টের পেয়ে তিনি ঢাকায় পালিয়ে নিজেকে রক্ষা করেন। এ নিয়ে উচ্চ আদালতের রায় তার পক্ষে বলে দাবি তার।

এ প্রসঙ্গে ডা. গোলাম মাসুদ মৃধা বলেন, ‘আমরা যারা বাংলাদেশ কম্বাইন্ড মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল থেকে পাস করে বের হয়েছি তারা আদালতের দ্বারস্থ হই। আদালত আমাদের বৈধতা দেয়ার বিষয়ে রায় দিয়েছেন। সেজন্য আমরা প্র্যাকটিস করছি।’

নগরীর পূর্ববানিয়াখামার এলাকায় ডা. মুজিবর রহমান প্রসূতি ডেলিভারি করানোসহ সব ধরনের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। তিনি সব রোগেরই চিকিৎসক। জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘গরিব মানুষ আসে চিকিৎসা নিতে।

কি করব টাকা-পয়সা কম দিয়ে এখানে চিকিৎসা নেয়। আমিও তাদের সেবা দিয়ে যাই।’ যুগান্তরের অনুসন্ধানে এ ধরনের অন্তত ২০ জন লোকের সন্ধান পাওয়া গেছে খুলনায়, যাদের চিকিৎসা দেয়ার বৈধ কোনো ডিগ্রি নেই।

বছরের পর বছর ধরে এরা ঢাকঢোল পিটিয়ে বড় বড় সাইনবোর্ড টানিয়ে চিকিৎসার নামে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। ২০১৪ সালে র‌্যাব-৬ নগরীতে ৭ জন ভুয়া চিকিৎসককে আটক করে জেল ও জরিমানা দেয়। জরিমানা ও সাজা ভোগের পর তারা আবারও একই কাজে জড়িয়ে পড়েছেন।

এর আগে নগরীর মীম নার্সিং হোমের চিকিৎসক ফেরদৌস রহমান, এন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চিকিৎসক সৌমেন মিত্র, রংধনু ক্লিনিকের চিকিৎসক ইব্রাহিম বাহাদুর ও কান্তিলাল, খুলনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চিকিৎসক পঞ্চানন মহলী ও সেবা ক্লিনিকের চিকিৎসক অনুপ মিত্রকে বিভিন্ন মেয়াদে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাজা ও জরিমানা করা হয়।

সাজা ভোগ ও জরিমানা দিয়ে তারা আবারও এ পেশায় যুক্ত হয়ে পড়েছেন। ভুয়া চিকিৎসকদের বিষয়ে খুলনা সিভিল সার্জন আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘এত ভুয়া ডাক্তারের বিষয়ে আমার জানা নেই। আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’ খুলনা বিএমএর সভাপতি ডা. বাহারুল ইসলাম বলেন, ‘এরা দেশের শত্রু। প্রশাসনের উচিত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।’

এ বিষয়ে র‌্যাব-৬ খুলনার সিও হাসান ইমাম আল রাজিব বলেন, ‘র‌্যাবের নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে ভুয়া ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান আছে। তথ্য পেলে এ ধরনের অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হবে।’

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter