বাণিজ্যিক উইংয়ে বিদেশিদের পরিবর্তে স্বদেশি নিয়োগ

পদ সম্প্রসারণে অর্থমন্ত্রীকে বাণিজ্যমন্ত্রীর ডিও

  শাহ আলম খান ১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাণিজ্যিক মিশনে বিদেশি নাগরিকদের পরিবর্তে সহায়ক পদে স্বদেশী জনবলের নিয়োগ বাড়ানোর জোরালো দাবি তুলেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের গোপনীয়তা রক্ষা ও দায়িত্ববোধ, বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় রোধ তথা রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং নতুন বাজার সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা পালনেই বাণিজ্যিক উইংয়ে স্বদেশভিত্তিক পদ বাড়ানো জরুরি। তাদের দাবি, এর গুরুত্ব বুঝতে পেরে ইতিমধ্যে পররাষ্ট্র, তথ্য, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশে মিশনগুলোয় সহায়ক বিভিন্ন পদে স্বদেশি জনবল নিয়োগ দিচ্ছে। কিন্তু পদ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাটছাঁট অনুমোদনের কারণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিদেশে পদায়নের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কম। এ পরিস্থিতিতে তারা অননুমোদিত ৬টি এবং নতুন প্রক্রিয়াধীন আরও তিনটি মিশনের বাণিজ্যিক উইংয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে বাণিজ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।

এদিকে বিষয়টি অবহিত হওয়ার পর বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের বাণিজ্যিক উইংয়ের পদ সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে অনুরোধ জানিয়ে আধা সরকারি পত্র (ডিও) দিয়েছেন। ওই ডিওতে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থায় বাণিজ্যিক কূটনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বর্তমান সরকারের রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়ন, রফতানি বৃদ্ধি ও বৈদেশিক বাণিজ্যকে আরও গতিশীল এবং সম্প্রসারণের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন দেশে বাণিজ্যিক উইং স্থাপন এবং সৃজনের উদ্যোগ নিয়েছে। আরও বলেছেন, ইতিপূর্বে বাণিজ্যিক উইংসমূহের জন্য ১৯টি স্বদেশভিত্তিক পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় ওই প্রস্তাবের বিপরীতে ১৩টি স্বদেশভিত্তিক পদ সৃষ্টির অনুমোদন দেয়। বাকি ৬টি পদ মিশন সংশ্লিষ্টদের দেশের স্থানীয় নাগরিকদের দিয়ে পূরণ করার নির্দেশনা দেয়। এই মিশনগুলো হচ্ছে বার্লিন, টোকিও, প্যারিস, তেহরান, মাদ্রিদ ও ব্রাসেলস। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এসব বাণিজ্যিক উইংয়ে সহায়ক পদে অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় অনুমোদন না দেয়ায় স্বদেশভিত্তিক জনবল নিয়োগ ও পদায়ন স্থগিত রয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর পাঠানো এই ডিওতে কয়েকটি যৌক্তিক কারণ তুলে ধরে প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনা কামনা করেছেন।

জানা গেছে, বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের বাণিজ্যিক উইংগুলোর জন্য ২০০৯ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন ১৯টি পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় ওই পদ কাটছাঁট করে ১৩টি স্বদেশভিত্তিক পদ চালু করার অনুমোদন দেয়। বাকি ছয়টি পদ মিশনে স্থানীয়ভিত্তিক নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। পরে এ বিষয়ে ২০১১ সালের ১৬ আগস্ট অর্থ বিভাগের সচিবকে এটি ডিও’র মাধ্যমে বিদেশস্থ বাণিজ্যিক উইংয়ে স্থানীয়ভিত্তিক ও স্বদেশভিত্তিক জনবল নিয়োগের সুবিধা-অসুবিধাসমূহ তুলে ধরে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটি দীর্ঘ সময়েও সমাধান হয়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মন্ত্রণালয়ের ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দাবির প্রেক্ষিতে বিষয়টি আবারও আলোচনায় উঠে আসে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মিশনগুলোয় যেসব নিয়োগ হচ্ছে, তাতে ড্রাইভার ও মেসেঞ্জার ছাড়া অন্যান্য সহায়ক পদে স্বদেশী জনবল কম। নিজ দেশের কাজে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে মিশনসংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকদের। স্বদেশভিত্তিক জনবল নিয়োগে ঘাটতির কারণে একদিকে বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দক্ষ কর্মকর্তারা মিশনে বদলির সুযোগ পাচ্ছেন না। অন্যদিকে স্থানীয় ভিত্তিতে নিয়োগের ফলে সংশ্লিষ্টদের কর্তব্য পালনে কোনো দায়বোধই থাকছে না। পাশাপাশি সরকারের কর্মপরিকল্পনার গোপনীয়তাও রক্ষা করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে মিশনগুলোর রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয়ভাবে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে এদের বেতন-ভাতা সম্পূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয় বিধায় বাংলাদেশের রেমিটেন্সও অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, স্থানীয়ভিত্তিক জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারকে মাত্রাতিরিক্ত অর্থদণ্ড দিতে হয়। সম্প্রতি মাদ্রিদ মিশনে ড্রাইভার কাম মেসেঞ্জারকে যৌক্তিক কারণে বরখাস্ত করা হলেও সে ওই দেশের আদালতে মামলা ঠুকে দেয়। তার নিয়োগ স্থানীয়ভিত্তিক হওয়ার কারণে ক্ষতিপূরণ বাবদ বাংলাদেশ সরকারকে ১২ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। এই নিয়োগ স্বদেশী জনবলের মাধ্যমে পূরণ হলে তার মাসিক বেতন-ভাতা দেশেই ফেরত আসে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখে।

স্বদেশভিত্তিক নিয়োগে সমবণ্টন দাবি : বিদেশে বাণিজ্যিক মিশনে স্বদেশভিত্তিক নিয়োগের স্বল্প সুযোগেও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে ক্যানবেরা, ওয়াশিংটন, অটোয়া, বেইজিং, জেনেভা, দুবাই, লন্ডন, লসএঞ্জেলস, নয়াদিল্লি, কলকাতা, ইয়াংগুন, মস্কো ও কুয়ালালামপুর- এই ১৩টি মিশনে স্বদেশভিত্তিক জনবল নিয়োগ হচ্ছে। এছাড়া নতুন করে আরও তিনটি মিশন খোলার প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যে শুধু ওয়াশিংটন ছাড়া বাকি সব মিশনে স্বদেশভিত্তিক জনবলের আওতায় ব্যক্তিগত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হচ্ছে। অথচ এনাম কমিটির অর্গানোগ্রামে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ৬টি, ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের ৫টি এবং সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম-কম্পিউটার অপারেটর ৯টি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও সেখানে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের একটি পদ ছাড়া বাকিগুলোতে ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া ২০০৬ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যে নিয়োগবিধি প্রণয়ন করেছে, সে অনুযায়ী ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা একই নিয়োগবিধির আওতাভুক্ত। ১৯৯৫ সালে উভয় পদকে একই স্কেলে ২য় শ্রেণীতে আপগ্রেড করা হয়েছে। বর্তমানে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা একই গ্রেডেশেনের তালিকাভুক্ত এবং পিএসপি থেকে সিনিয়রিটি ভিত্তিতে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। এ নীতি অনুসরণ করে ইতিমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ইআরডি, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিভিন্ন মিশনে পদায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু ব্যতিক্রম শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। পুরনো নিয়মেই এ মন্ত্রণালয়ে শুধু ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের পদায়ন করে আসছে। বর্তমানে এখানে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ১৯ জন এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা রয়েছেন ৪১ জন। সংখ্যায় বেশি হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বিদেশে নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাচ্ছেন না। সমবণ্টন দাবি করে এলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। ফলে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে একধরনের চাপা ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসু যুগান্তরকে বলেন, প্রশাসনিক কিংবা ব্যক্তিগত কর্মকর্তা কারো ক্ষেত্রেই বৈষম্য করা হচ্ছে না। নিয়োগবিধি এবং অর্গানোগ্রামে যা আছে তা অনুসরণ করেই বিদেশে পদায়ন দেয়া হচ্ছে। সুযোগ না থাকলে তো আমাদের কিছু করার নেই।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×