প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অ্যান্টিক শপের আড়ালে পাচার!

বিপুল সংখ্যক প্রত্নসম্পদ উদ্ধার * একজন গ্রেফতার, মূল হোতা লিটন পলাতক

  আহমদুল হাসান আসিক ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অ্যান্টিক শপ
ছবি-সংগৃহীত

গুলশান-২ নম্বরের ডিএনসিসি মার্কেটের দোতলার পূর্ব পাশে গেলেই চোখে পড়ে অ্যান্টিক শপ ‘কাঁসা সেন্টারের’। প্রাচীন ও দুর্লভ ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক বিভিন্ন নিদর্শনের দৃষ্টিনন্দন রেপ্লিকার সংগ্রহ দেখে যেন চোখ ফেরানো যায় না।

এখানে শৌখিন মানুষের নিত্য আনাগোনা। অথচ এই অ্যান্টিক শপের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। কাঁসা সেন্টারের অন্যতম স্বত্বাধিকারী তরিকুল ইসলাম লিটন আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত।

১২ বছর ধরে লিটন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও ভারতে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাচার করছেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এজেন্টদের মাধ্যমে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ করে তিনি পাচার করেন।

মঙ্গলবার লিটনের ভাই মনিরুল ইসলামের ভাটারার বাসা থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উদ্ধারের পর বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য। এ সময় মনিরুলকে গ্রেফতার করা হয়। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ওই বাসা থেকে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের ভাস্কর্যসহ সপ্তম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উদ্ধার করে।

উদ্ধার করা নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে- কষ্টি ও বেলে পাথরের ১০টি মূর্তি, বিভিন্ন ধরনের ১৮টি ধাতব মুদ্রা, একটি প্রাচীন তাম্রলিপি এবং কয়েকটি বিভিন্ন ধরনের প্রাচীন স্মারক। এ ঘটনায় ভাটারা থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেছে ডিবি। মনিরুলকে এক দিনের রিমান্ডে নিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ডিবি।

অভিযানে নেতৃত্বদানকারী ডিবির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) বশির উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, দেশের মহামূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাচারকারী সংঘবদ্ধ একটি চক্রকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই চক্রের এক সদস্যের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

এদিকে, উদ্ধার হওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো দেখতে ডিবি কার্যালয়ে যান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান এবং ঐতিহ্য অন্বেষণের উপ-পরিচালক শারমিন রেজওয়ানা।

তারা জানান, এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ডিবি যেসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উদ্ধার করেছে এগুলো সপ্তম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর বলে ধারণা করছি। এসব নিদর্শনের মধ্যে তাম্রলিপি, নবগ্রহ, গণেশ, সূর্য, হরগৌরি, চামণ্ডা ও বুদ্ধমূর্তি রয়েছে। এগুলোর কোনো বাজার মূল্য নেই। এগুলো অমূল্য সম্পদ।

এগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, পাচারকারী চক্রের কাছে যে তাম্রলিপি পাওয়া গেছে সেটি সংস্কৃত ভাষায় লেখা। তবে এর পাঠ উদ্ধার করা হয়নি। তাম্রলিপিতে সাধারণত রাজার আদেশ ও নির্দেশ লেখা থাকত। এমনকি রাজাদের ভূমিদান, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং গুণকীর্তনও লেখা থাকত। তাম্রলিপি থেকে একজন রাজার শাসনামল সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। এগুলো সংরক্ষণ এবং তদারক করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

গ্রেফতার মনিরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ডিবি সূত্র জানায়, চার বছর ধরে বড় ভাই লিটনের এন্টিক শপে কর্মচারী হিসেবে কাজ করছিলেন মনিরুল। উদ্ধার হওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো বাসায় রাখার জন্য মনিরুলকে দিয়েছিলেন লিটন। তাদের গ্রামের বাড়ি বরগুনা সদরের ছোট গৌরিচন্না গ্রামে। তার বাবা আবদুস সাত্তার কৃষক ছিলেন।

দরিদ্র পরিবারের সন্তান লিটন খুব বেশি লেখাপড়া করতে পারেননি। পেটের দায়ে ২০ বছর আগে লিটন ঢাকায় এসে একটি এন্টিক শপে কর্মচারীর কাজ নেন। একসময় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাচারের সঙ্গে তিনি জড়িয়ে পড়েন। মাত্র আট বছরের মধ্যেই এন্টিক শপের কর্মচারী থেকে লিটন মালিক হয়ে যান। কর্মচারীদের দিয়ে তিনি দোকান পরিচালনা করেন।

অধিকাংশ সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। বিভিন্ন স্থান থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ করে তিনি বিদেশে পাচার করেন। পুলিশ বলছে, লিটনকে গ্রেফতার করা গেলে এই চক্রের অন্য সদস্যদের এবং কিভাবে পাচার করা হয় সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।

ডিবির পূর্ব বিভাগের ডিসি খন্দকার নুরুন্নবী যুগান্তরকে বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং ঐতিহাসিক বিভিন্ন নিদর্শন পাচারকারী আন্তর্জাতিক চক্রের অন্যতম হোতা লিটন। জিজ্ঞাসাবাদে মনিরুল অনেক তথ্য দিয়েছেন। তার দেয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আশা করছি শিগগিরই লিটনসহ এই চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে কাঁসা সেন্টারের কর্মচারীদের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তারা জানান, কাঁসা সেন্টারের শেয়ার রয়েছে চার ব্যবসায়ীর। তাদের মধ্যে লিটন হ্যান্ডিক্রাফটের বিভিন্ন দুর্লভ জিনিস বিক্রি করেন। এ ছাড়া মণি-মুক্তার আইটেম বিক্রি করেন রাজা মিয়া, শিপিং আইটেম বিক্রি করেন আজিজ মাস্টার এবং কাঁসার বিভিন্ন আইটেম বিক্রি করেন জাফর আহমেদ।

লিটনের কর্মচারী মো. ইব্রাহীম যুগান্তরকে বলেন, লিটন খুব বেশি দোকানে আসেন না। ঈদের পর একদিনও আসেননি। দোকান পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে তার ভাই মনিরুল। লিটন সম্পর্কে বেশি কিছু জানেন না বলেও তিনি জানান।

লিটনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার দুটি মোবাইল ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter