চাঞ্চল্যকর সাবিনা হত্যা

নবজাতকের কাঁথার সূত্র ধরে রহস্য উদ্ঘাটন

স্বামীকে আসামি করে চার্জশিট * মা-বাবার হুমকি পেয়ে স্ত্রীকে হত্যা করে টিপু

  সিরাজুল ইসলাম ১৯ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাত্র ২১ দিন বয়সী ফুটফুটে শিশু সুলতানা আক্তার প্রিয়ার সামনে হত্যা করা হয় তার মা রিনা আক্তার সাবিনাকে। ঘাতক সাবিনার স্বামী (প্রিয়ার বাবা) টিপু সুলতান। সাবিনাকে যখন গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করা হয় তখন প্রিয়া হাত-পা নেড়ে ছটফট করছিল। এতে এতটুকুও হাত কাঁপেনি পাষণ্ড টিপুর। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি ঘটেছিল গত বছর ২১ মে রাজধানীর মতিঝিলের ১৮-১৯ ফকিরাপুল বাজার রোডের হোটেল আল শাহিনের চতুর্থ তলার একটি কক্ষে। হত্যাকাণ্ডটি ছিল সম্পূর্ণ ‘ক্লুলেস’। ঘাতক বা ভিকটিমের কোনো পরিচয় পাওয়া যাচ্ছিল না। রহস্য উদ্ঘাটনে প্রযুক্তিগত সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। পরে তদন্ত কর্মকর্তার দক্ষতায় ট্রেডিশনাল পদ্ধতিতেই বেরিয়ে আসে রহস্য। এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে নবজাতকের সঙ্গে থাকা কাঁথা। এর সূত্র ধরেই ঘাতককে গ্রেফতার করা হয়। আদায় করা হয় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি। বৃহস্পতিবার এ মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এতে একমাত্র আসামি করা হয়েছে সাবিনার স্বামী টিপু সুলতানকে। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন আদালতে এ চার্জশিট দাখিল করা হয় বলে যুগান্তরকে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মতিঝিল থানার এসআই শেখ সাইফুল ইসলাম। পুলিশের মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) আরিফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আলোচিত এ হত্যা মামলার তদন্ত সিনেমার গল্পের মতো। হোটেলের রেজিস্টার খাতায় সাবিনা ও টিপুর কোনো নাম-ঠিকানা ছিল না। আবার খুনি চলে যাওয়ার সময়ও নিজের কিছু রেখে যায়নি। তাদের কারও কোনো মোবাইল নম্বরও পাওয়া যাচ্ছিল না। যখন ভিকটিমের মোবাইল নম্বর পাওয়া গেল তখন কললিস্ট থেকে সূত্র উদ্ঘাটন করা সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে রাজধানীর মতিঝিল এলাকা থেকে। কিন্তু ভিকটিমের কললিস্টে কখনও রাজধানীর কোথাও তার অবস্থান খুঁজে পাওয়া যায়নি। কললিস্ট অনুযায়ী তার সবশেষ লোকেশন ছিল চট্টগ্রাম। তাও আবার কয়েকদিন আগের। ভিকটিমের আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের মাধ্যমে পরিচয় নির্ণয়ের চেষ্টাকালে জানা যায়, তার নামে কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। এ অবস্থায় তদন্তের মূল উপজীব্য হয়ে পড়ে মৃতদেহের পাশে পাওয়া বাচ্চার পাঁচটি কাঁথা, একটি ভ্যানিটি ব্যাগ, ভ্যানিটি ব্যাগের ভেতর থাকা চট্টগ্রাম-চেয়ারম্যান ঘাট-চট্টগ্রাম (ভায়া সোনাপুর) রুটে চলাচলকারী বাঁধন পরিবহনের একটি বাসের টিকিট এবং লক্ষ্মীপুর রামগতির মধ্যবাজারে অবস্থিত ‘লাবণী শিল্পালয়’ নামে একটি জুয়েলারি দোকানের কার্ড।

চার্জশিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তদন্ত কর্মকর্তা বাসের টিকিট, কাঁথা ও জুয়েলারি দোকানের কার্ড নিয়ে চলে যান নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে। এরপর তিনি দুই জেলার সুধাংশু, বেগমগঞ্জ এবং রামগতি এলাকার বিভিন্ন বাজারে ঘুরতে থাকেন। নিহতের পরিচয় নিশ্চিত হতে তদন্ত কর্মকর্তা বিভিন্ন এলাকায় উঠান বৈঠকও করেন। পাশাপাশি নিয়োগ দেয়া হয় গোয়েন্দা। অর্থাৎ তদন্ত চলে প্রকাশ্য ও গোপনে। একদিন রামগতি বাজারে গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা দেখতে পান, একটি হোমিওপ্যাথিক দোকানে এক শিশুকে নিয়ে এসেছেন এক নারী। শিশুটিকে যে কাঁথা দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা হয়েছে, সেটির সঙ্গে হোটেল কক্ষ থেকে উদ্ধার হওয়া শিশুটির কাঁথা মিলে যায়। তখন ওই নারীর কাছে তদন্ত কর্মকর্তা জানতে চান, তিনি এ কাঁথা কোথা থেকে সংগ্রহ করেছেন। জবাবে মহিলা বলেন, রামগতি এলাকায় এই কাঁথা বানানো হয়। তখন তদন্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের ধারণা বদ্ধমূল হয়, নিহত নারী এ এলাকারই হবেন। তাই তিনি ওই হোমিও দোকানসহ রামগতি এলাকার বিভিন্ন বাজার ও দোকানে নিহতের ছবি এবং তদন্ত কর্মকর্তার নম্বর দিয়ে আসেন। মতিঝিল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গোলাম রব্বানী জানান, গত ১০ জুন নিহত রীনার মামা কামাল উদ্দিন ওষুধ কিনতে ওই হোমিও দোকানে যান। দোকানে ঢোকার পরই টেবিলে কাচের নিচে রাখা ছবিটি দেখে চমকে ওঠেন কামাল। এরপর হোমিও ডাক্তারের কাছ থেকে তদন্ত কর্মকর্তার মোবাইল নম্বর নিয়ে তাকে ফোন করেন কামাল। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন সাবিনার ভাই সায়েদ। ওই দিনই এসআই সাইফুলের নেতৃত্বে মতিঝিল থানার পুলিশ চট্টগ্রামে গিয়ে নগরের পাঁচলাইশ থানার ১২৮ ষোলক বহরে অবস্থিত খোকন এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্লাস্টিকের দোকান থেকে টিপু সুলতানকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ও আদালতে দেয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে টিপু সুলতান জানায়, তার বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া থানার মোহাম্মদনগরে। সে ওই প্লাস্টিকের দোকানে চাকরি করে। সাবিনা ও তার এক আত্মীয় আড়াই বছর আগে ওই দোকানে একটি চেয়ার কিনতে গিয়েছিলেন। সেখানেই সাবিনার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে বছর দেড়েক আগে তাদের বিয়ে হয়। কিন্তু বিষয়টি টিপুর পরিবারের কেউ জানতেন না। গত বছর ৩০ এপ্রিল নোয়াখালীর মাইজদীতে অবস্থিত ‘মা-মনি জেনারেল হাসপাতালে’ সিজারের মাধ্যমে কন্যা সন্তানের জন্ম দেন সাবিনা। মোবাইল ফোনে নবজাতকের সঙ্গে একটি ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করে টিপু। এরপরই টিপুর বিয়ের বিষয়টি জেনে যায় তারা মা-বাবা। তার মা-বাবা টিপুকে এই বলে হুমকি দেয় যে, ‘তুই জঘন্য কাজ করেছিস। আমাদের বাড়িতে তোর কোনো জায়গা নেই।’

এর পরই স্ত্রী সাবিনাকে খুন করার পরিকল্পনা করে টিপু। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শেখ সাইফুল ইসলাম জানান, গত ১৭ মে কৌশলে সাবিনাকে রামগতি থেকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসে টিপু।

২০ মে রাতে সৌদিয়া পরিবহনযোগে সাবিনা ও নবজাতক প্রিয়াকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয় টিপু সুলতান। ওইদিন দিবাগত রাতে (২১ মে ভোর ৩টার দিকে) তারা ফকিরাপুলের আল শাহীন হোটেলে ওঠে। হোটেলের রেজিস্টার খাতায় নাম-ঠিকানা না লিখে বিশ্রামের কথা বলে সাবিনা ও নবজাতক প্রিয়াকে নিয়ে হোটেলে উঠে যায় টিপু। হোটেলে অবস্থানকালে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে ২১ মে সন্ধ্যায় সাবিনাকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করে টিপু। হত্যার পর শিশুটিকে লাশের পাশে রেখে হোটেলকক্ষটি তালাবদ্ধ করে পালিয়ে যায় সে। এদিকে শিশুটি মৃত মায়ের পাশে গড়াগড়ি করতে থাকে। একপর্যায়ে খাট ও দেয়ালের ফাঁকা জায়গায় তার মাথা আটকে যায়। এ সময় হোটেল রুমে শিশুর কান্নার শব্দ শুনে কর্তৃপক্ষ জানালা খুলে দেখতে পায় সাবিনার লাশ খাটে পড়ে আছে। ওইদিন রাত ১০টার দিকে খবর পেয়ে পুলিশ নিহত সাবিনা ও অসুস্থ শিশু প্রিয়াকে উদ্ধার করে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×