ইয়াবার কারবারে অঢেল সম্পদের মালিক তারা

একজন পালিয়ে বিদেশে, একজন কারাগারে

  শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার ও নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম ব্যুরো ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইয়াবা

চট্টগ্রামে ভয়ংকর মরণ নেশা ইয়াবার ব্যবসা করে অঢেল সম্পদ ও কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার মালিক বনেছেন তারা দু’জন। তাদের উত্থান যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানায়।

দু’জনই বিপুল পরিমাণ ইয়াবার চালান নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন। আবার ছাড়া পেয়ে একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। এদের একজন রশিদ আহমেদ ওরফে খুলু।

আরেকজন মোজাহের মিয়া। পরে রশিদ খুলু বিদেশে পালিয়ে যান। আর মোজাহের মিয়া সর্বশেষ ২০ লাখ পিস ইয়াবার চালান নিয়ে পুনরায় গ্রেফতার হওয়ার পর কারাগারে।

রশিদ খুলু মিয়ানমারের নাগরিক হলেও বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে আবাস গড়েন কক্সবাজারের টেকনাফে। আর মোজাহের মিয়ার বাড়ি চট্টগ্রামের আনোয়ারায়। টেকনাফ থেকে ইয়াবা পৌঁছাতেন রশিদ খুলু। আর চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূলে তা খালাস করতেন মোজাহের মিয়া।

মোজাহের মিয়ার উত্থান : ৮-১০ বছর আগেও তার নুন আনতে পান্তা ফোরানোর অবস্থা ছিল। এখন বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। রয়েছে ব্যাংকে অঢেল টাকা।

চড়েন দামি প্রাইভেট কারে, ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করছেন দেশ-বিদেশের নামি-দামি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর এলাকার চাঁন মিয়ার ছেলে মোজাহের। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের শীর্ষ মাদকের গডফাদারের তালিকায় রয়েছে তার নাম।

যদিও এলাকায় তিনি সমাজসেবক হিসেবেও পরিচিত। কারণ ইয়াবার টাকা দান-খয়রাত করতেন। সম্প্রতি সিআইডির ইকোনমিক ক্রাইম স্কোয়াড অর্গানাইজড ক্রাইমের প্রাথমিক তদন্তে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড চট্টগ্রাম নগরীর সিডিএ এভিনিউ শাখায় মোজাহের মিয়ার তিনটি ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে।

এসব ব্যাংক হিসাবে অল্প সময়ে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের বিষয়টি ধরা পড়ে। এর মধ্যে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিসমিল্লাহ ক্রোকারিজের নামে খোলা ব্যাংক হিসাব নম্বর ২৩৩-৩০০-২৩৯৩। হাজী মোজাহের মিয়া নামে খোলা হিসাব নম্বর ২৩৩-৩০০-২৩৪৯ এবং মোজাহের মিয়া নামে খোলা হিসাব নম্বর ২৩৩-৪০০-৫৬৯০।

২০১৪ সালের ২৭ নভেম্বর ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা জমা দিয়ে বিসমিল্লাহ ক্রোকারিজের নামে খোলা হয় ব্যাংক হিসাব। এ সময় তার আয় দেখানো হয় ৯০ হাজার টাকা। গত বছরের ৫ জুন পর্যন্ত এ ব্যাংক হিসাবে ৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা লেনদেন হয়। এ ব্যাংক হিসাবে ভৈরব এসএমই শাখা, ঢাকা পান্থপথ, সিলেটের গোবিন্দগঞ্জ শাখা থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ জমা হয়।

সিআইডির এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, চট্টগ্রাম নগরীর রিয়াজুদ্দিন বাজারে তার নামে যে দোকানটি আছে সেটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি টাকার সমপরিমাণ। পাঁচলাইশ সুগন্ধা আবাসিক এলাকায় ২ নম্বর রোডের ৬ তলা ভবনের ৫৬ নম্বর বাসাটি মোজাহের মিয়ার।

যার বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এ ছাড়া তার নামে-বেনামে আরও জমিজমা, ট্রলার আছে বলে জানা গেছে। মোজাহের মিয়ার প্রথম ছেলে মো. পারভেজুল ইসলাম লেখাপড়া করেন অস্ট্রেলিয়ায়। দ্বিতীয় ছেলে আকিবুল ইসলাম ঢাকা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএতে পড়েন।

তৃতীয় ছেলে তানভিরুল চট্টগ্রাম লিটল জুয়েল স্কুল অ্যান্ড কলেজে। বড় মেয়ে আয়েশা আক্তার ওরফে ইশা বিবাহিত, ছোট মেয়ে নাফিজা আক্তার রুমা কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বিবিএতে অধ্যয়নরত। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়ে ৩ আগস্ট নগরীর পাঁচলাইশ থানায় মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করা হয়।

ওই মামলায় মোজাহের মিয়া ছাড়াও তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লেনদেনকারী আরও ৭ জনকে আসামি করা হয়। সিআইডির ইকোনমিক ক্রাইম স্কোয়াড অর্গানাইজড ক্রাইমের পুলিশ পরিদর্শক মো. আশরাফুল ইসলাম বাদী হয়ে এ মামলা করেন। আনোয়ারা থানার ওসি দুলাল মাহমুদ যুগান্তরকে জানান, মোজাহের মিয়া আনোয়ারা থানার তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী। র‌্যাবের অভিযানে ইয়াবাসহ গ্রেফতারের পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।

রশিদ আহমদ খুলু : মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে প্রথমে তিনি টেকনাফের শাহ পরীর দ্বীপে অবস্থান নেন। এরপর কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে আবাস গড়েন। ২০১২ সালে ২ লাখ ৭০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ গ্রেফতার হন ইয়াবা চালানের মূল হোতা রশিদ আহমদ খুলু, তার শ্যালক আতাউল করিম, ইসমাইল ও সাব্বির আহমেদ।

এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে র‌্যাব। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী আবাসিক এলাকার ২ নম্বর সড়কের ৩৬ নম্বর বাড়িটি রশিদ খুলুর। পরিবার নিয়ে এখানেই বসবাস করছেন অনেক বছর।

হালিশহর শ্যামলী আবাসিক এলাকায় একতা বিল্ডিং সংলগ্ন আরও একটি বিলাসবহুল ভবন আছে তার। ২০১৫ সালে খুলুর সিন্ডিকেটের প্রধান জাহিদুল ইসলাম ওরফে আলো ক্রসফায়ারে মারা যাওয়ার পর চট্টগ্রামের সব অফিস বন্ধ করে ২০১৬ সালে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম ও অফিস গড়ে তোলেন রশিদ খুলু।

সূত্র জানায়, ইয়াবা গডফাদার মোজাহের গ্রেফতার হয়ে কারাবন্দি থাকলেও ভাগ্য ভালো রশিদ খুলুর। তিনি দেশত্যাগ করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে রশিদ খুলুর অবর্তমানে এখন তার ছেলে ফয়সাল রশিদ নিয়ন্ত্রণ করছেন ইয়াবার পুরো সিন্ডিকেট- এমন অভিযোগ চাউর আছে। রশিদ খুলু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কৌশলে মাঝেমধ্যে দেশে আসেন বলেও বিভিন্ন সূত্রের দাবি।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.