রাজধানীতে ৯ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৬৩০

মৌসুমের বাকি ২ মাস নিয়ে শঙ্কিত বিশেষজ্ঞরা * জনসচেতনতা সৃষ্টিতে উদ্যোগ নেই দুই সিটি কর্পোরেশনের

  মতিন আব্দুল্লাহ ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডেঙ্গুজ্বর

রাজধানীতে ডেঙ্গুজ্বর ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ জ্বরে আক্রান্তদের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। ৯ দিনে ৬৩০ জন আক্রান্ত হয়েছেন ডেঙ্গুজ্বরে। ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন হাসপাতালে ৬০ জন ভর্তি হয়েছেন।

তাদের তিনজনের দেহে ডেঙ্গু হেমোরেজিক (রক্তক্ষরণ) অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার এ অবস্থা চলতে থাকলে বর্ষা মৌসুমের বাকি ২ মাসে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সে বিষয়ে তারা শঙ্কিত। তাদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জনসচেতনতা সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বাড়ি ও বাড়ির আঙ্গিনা অবশ্যই পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। অন্যথায় চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

তারা বলেন, ডেঙ্গু বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ালেও তা প্রতিরোধে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের কার্যকর উদ্যোগ নেই। কোনো কার্যক্রমও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। যদিও দুই সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে- বেশ আগ থেকে ডেঙ্গুজ্বর বা চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন করেও ডেঙ্গু ভাইরাসবাহিত এডিস মশার জীবাণু ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও নগরবাসী সচেতন না হওয়ায় ডেঙ্গুজ্বর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) বলছে, ৩৩ হাজার বাড়ি পরিদর্শন করে এডিস মশার লার্ভা নিধন করা হয়েছে। মসজিদ, স্কুল-কলেজসহ সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে চিঠি দিয়ে প্রচার চালাতে বলা হয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে কয়েক দফা ক্র্যাশ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া ডিএসসিসির পক্ষকালব্যাপী নতুন ক্র্যাশ কর্মসূচি নগরবাসীর মাঝে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) বলছে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টিতে মসজিদ, স্কুল-কলেজে চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। কাউন্সিলরদের এলাকায় জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাঁচটি আঞ্চলিক কার্যালয়ে জনসচেতনতামূলক সভা, র‌্যালিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এরপরও নগরবাসীর সচেতন না হওয়ায় ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

জানা গেছে, এ মৌসুমে ঢাকা দক্ষিণে কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করলেও ঢাকা উত্তরে জনসচেতনতামূলক কোনো কর্মসূচিই পরিচালনা করা হয়নি। ডিএসসিসির ৫৭টি ওয়ার্ডের (নারী ও পুরুষ মিলিয়ে) ৭৬ কাউন্সিলর এবং ডিএনসিসির ৩৬টি ওয়ার্ডের (নারী ও পুরুষসহ) ৪৮ জন কাউন্সিলরের মধ্যে বেশিরভাগের ভূমিকাই প্রশ্নবিদ্ধ। নগরবাসীকে সচেতন করার কোনো কর্মসূচিই তারা পালন করছেন না।

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. শেখ সালাহউদ্দীন যুগান্তরকে বলেন, ডেঙ্গুজ্বর রাজধানীতে ভয়াবহরূপ ধারণ করেছে। এ জ্বরবাহিত মশা স্বচ্ছ পানিতে জন্মানোয় ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, গত বছরে চিকুনগুনিয়ার ভয়াবহতার কারণে এবার বেশ আগ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়ি বাড়ি গিয়ে লার্ভা নিধন করা হয়েছে। কিন্তু, এরপরও নগরবাসী সচেতন হচ্ছেন না। অনেকে মশারি না টাঙিয়ে ঘুমাচ্ছেন। বাসায় ছাদে ও ফুলের টবে পানি জমে থাকলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। তিনি আরও বলেন, জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কাউন্সিলরদের জোরালো ভূমিকা রাখা দরকার।

ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. জাকির হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা এবার অন্যবারের তুলনায় বেশি। ইতিমধ্যে ১১ জন মারা গেছেন। প্রতিদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। নগরবাসী সচেতন না হলে ডেঙ্গুজ্বর নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা যুগান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ শঙ্কিত ও উৎকণ্ঠিত। এ বছর বর্ষা মৌসুম কিছুটা আগে শুরু হওয়ায় ডেঙ্গুর প্রকোপ আগে থেকেই শুরু হয়েছে। বর্ষা মৌসুমের এখনও ২ মাস বাকি।

নগরবাসী সচেতন না হলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা বলা কঠিন। তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতের বিষয়ে ইতিমধ্যে দু’বার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। আজ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সব ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সভা অনুষ্ঠিত হবে।

তিনি আরও বলেন, বাহকবাহিত রোগ কোনো বছর বেশি আবার কোনো বছর অপেক্ষকৃত কম হয়ে থাকে। তবে সামগ্রিকভাবে নগরবাসী সচেতন না হলে এটা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে রোগী এবং তার পরিবার উভয় ভুক্তভোগী হয়। তাই পরিবারের সদস্যদের যেন ডেঙ্গু না হয়, সে ব্যাপারে সবারই সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ ডা. আয়েশা আক্তার জানান, এ বছরের জানুয়ারি থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ৩ হাজার ৬০২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন এবং সুস্থ হয়ে ৩ হাজার ৩০৬ জন বাড়ি ফিরেছেন। এ সময়ে এ রোগে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু আগস্টে ১ হাজার ৬৬৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। ১ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬৩০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন।

ডা. আয়েশা আরও জানান, জুন থেকে এ রোগের প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। জুনে ২৭৬ জন আক্রান্ত হন। এর মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়। জুলাইয়ে ৮৮৭ জন আক্রান্ত এবং চারজনের মৃত্যু হয়। আগস্টে ১ হাজার ৬৬৬ জন আক্রান্ত এবং চারজনের মৃত্যু হয়।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য মতে, রাজধানীর সাতটি এলাকা অতিরিক্ত ডেঙ্গুপ্রবণ। এগুলো হল- ধানমণ্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, হাতিরপুল, পান্থপথ, বনশ্রী ও রামপুরা।

আইইডিসিআরের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এএসএম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, শরীরে আগে থেকে ডেঙ্গুর ইনফেকশন থাকলে দ্বিতীয়বার আক্রান্তের পর ডেঙ্গু হেমোরেজিক (রক্তক্ষরণ) অবস্থার সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, আক্রান্তের ৫ দিনের মধ্যে এনএসএ পরীক্ষা করলে ডেঙ্গু নিশ্চিত হওয়া যায়।

জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে সংবাদপত্রে নিয়মিত বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশনায় বলা হয়- ১. ঘরে ও আশপাশে যে কোনো পাত্রে বা জায়গায় জমে থাকা পানি ৩ দিন পরপর ফেলে দিতে হবে।

২. ব্যবহৃত পাত্রের গায়ে লেগে থাকা মশার ডিম অপসারণে পাত্রটি ঘষে ঘষে পরিষ্কার রাখতে হবে। ৩. যাতে পানি না জমে সেজন্য অব্যবহৃত পানির পাত্র নষ্ট অথবা উল্টে রাখতে হবে।

৪. দিনে অথবা রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। ৫. সম্ভব হলে জানালা ও দরজায় মশা প্রতিরোধক নেট লাগানো। ৬. প্রয়োজনে শরীরের (মুখমণ্ডল ব্যতীত) অনাবৃত স্থানে মশা নিবারক ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করা যেতে পারে।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter