সুনামগঞ্জে পরিবহন খাত

পুলিশের মাসোহারা ৫ লাখ

টাকা আদায় হয় বিকাশ অ্যাকাউন্টে * না দিলে মামলা

  ইয়াহ্ইয়া মারুফ, সুনামগঞ্জ থেকে ফিরে ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পুলিশ

সুনামগঞ্জে ট্রাক, পিকআপ, বাস-মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল স্ট্যান্ড ও বিভিন্ন কোম্পানির গাড়ি থেকে ৫ লাখ টাকা মাসোহারা নিচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ। টাকা না দিলেই ঠুকে দেয়া হয় মামলা।

জেলার ৬টি ট্রাফিক পয়েন্ট থেকে এসব টাকা তোলা হয়। অধিকাংশ গাড়ির কাগজপত্র ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় রাস্তায় চলাচলের জন্য মৌখিক চুক্তিতে চালক, মালিক ও সমিতির নেতারা ট্রাফিক পুলিশের হয়রানি থেকে রক্ষা পেতে এ টাকা দিয়ে থাকেন। এছাড়া নানা অজুুহাতে গাড়ি আটকের নামে চাঁদাবাজি তো আছেই।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের টাকা আদায় ও শ্রমিক নেতা, কোম্পানি প্রতিনিধিদের কথোপকথনের বেশ কয়েকটি অডিও ক্লিপও যুগান্তরে হাতে পৌঁছেছে।

এসব অডিও ক্লিপের কথোপকথনে ৪ লাখ ৯২ হাজার ৭৫০ টাকা মাসোহারা উত্তোলনের সত্যতা পাওয়া গেছে। ৬টি পয়েন্টে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের বদলি করা হলেও মাসোহারা বাতিল হয় না। নতুন দায়িত্ব নিয়ে যিনি আসেন তিনিই টাকা আদায় করেন। আদায়কৃত টাকার ভাগ যায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পকেটেও।

সুনামগঞ্জের টিআই সামছুলের কাছে মাসোহারার ভাগ দেন পুরো জেলার ৬টি পয়েন্টে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সুনামগঞ্জের প্রবেশমুখ গোবিন্দগঞ্জ পয়েন্টে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট নিকুঞ্জ ও এটিএসআই ইসহাক মিয়া এবং আবদুর রহিম ৪৩টি কোম্পানি ও বিভিন্ন স্ট্যান্ডসহ ৬৮ জনের কাছ থেকে ৭২ হাজার ৯০০ টাকা মাসোহারা নেন। তারা মাসের ১ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে টাকা আদায় করে নেন।

এছাড়া কিছু ড্রাইভার ও ম্যানেজার গোবিন্দগঞ্জ পয়েন্টে এসে সরাসরি টাকা দিয়ে যান। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিকুঞ্জ-০১৭৫৭-৭০১৮৪৩ ও এটিএসআই ইসহাক মিয়া-০১৭১৫-২৫০১০২ এবং ০১৭৪৬-৯৭৭৪৯৭ নম্বরে (বিকাশ পারসোনাল) টাকা আদায় করে থাকেন।

প্রগতি অ্যান্ড সম্রাট ট্রান্সপোর্টের মো. ছবুর মিয়া জানান, প্রতি মাসের ১৩-১৪ তারিখ তিনি সার্জেন্ট নিকুঞ্জের বিকাশ নম্বরে ৪ হাজার ৪০ টাকা দেন। সুখতারা ট্রান্সপোর্টের হালিম মিয়া জানান, মাসের ৫-৬ তারিখ তিনি সার্জেন্ট নিকুঞ্জের বিকাশ নম্বরে ২ হাজার ৪০ টাকা দেন।

ম্যানেজার লামাকাজী সিএনজি স্ট্যান্ডের সভাপতি মো. মজিদ মিয়া জানান, আগে আমি দিতাম বর্তমানে সমিতির সেক্রেটারি মো. গিয়াস মিয়া টাকা দেন। প্রাণ কোম্পানির মো. এমদাদ মিয়া জানান, তিনি মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা সার্জেন্ট নিকুঞ্জকে দেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সার্জেন্ট নিকুঞ্জ অকপটে মাসোহারা আদায়ের কথা স্বীকার করেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘এগুলো সবাই জানে। মিথ্যা কথা বলব না, আমাদের ইন্টারন্যাল কিছু ফাংশন থাকে। বুঝেনই তো, আমরা চাকরি করি। কোনো তদবির থাকলে বলার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আসলে সাক্ষাতে বিস্তারিত বলব।’

ছাতক থানায় কর্মরত ট্রাফিক টিএসআই গোলাম মোস্তফা, এটিএসআই রাজিবুল, বারেক মিয়া ছাতক ও দোয়ারাবাজারের ১৩টি স্ট্যান্ড থেকে ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৫০ টাকা মাসোহারা আদায় করেন। দোয়ারাবাজার থানা এলাকার ৮টি সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে মাসে ৫৫ হাজার টাকা আদায় করা হয়। সিএনজি পাম্পে গ্যাস না থাকায় দোয়ারাবাজারে সিএনজি অটোরিকশাগুলো ছাতকে সিএনজি নেয়ার জন্য আসে।

এসব সিএনজি অটোরিকশার স্ট্যান্ড থেকে মাসোহারা দিতে হয়। দোয়ারাবাজার উপজেলা সিএনজি স্ট্যান্ডের যুগ্ম-আহ্বায়ক গিয়াস উদ্দিন বলেন, চলতি মাসের টাকা দেয়া হয়নি। দু’এক দিনের মধ্যে দিয়ে দেব। আর ছাতক থানা এলাকার ৫টি স্ট্যান্ডে ৬০৫টি সিএনজি অটোরিকশা থেকে মাসিক প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫৫০ টাকা আদায় করা হয়।

ছাতক স্ট্যান্ডের সভাপতি আলা উদ্দিন টিএসআই গোলাম মোস্তফাকে ৬০ হাজার টাকা মাসোহারা দেন। ট্রাফিক পুলিশ ছাতক বাজার স্ট্যান্ডের ৩৫০টি সিএনজি অটোরিকশা থেকে ৩০০ টাকা করে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা, লাফার্জ সিমেন্ট ফ্যাক্টরি সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ডের ৬০টি সিএনজি অটোরিকশা থেকে ৮০ টাকা করে ৪ হাজার ৮০০ টাকা, ছাতক শিবটিলা স্ট্যান্ডের ১০০টি সিএনজি অটোরিকশা থেকে ৩০০ টাকা করে ৩০ হাজার টাকা, ফকিরটিলা স্ট্যান্ডের ৪৫টি সিএনজি অটোরিকশা থেকে আড়াইশ’ টাকা করে ১১ হাজার ২৫০ টাকা, নোয়ারাই বাজার স্ট্যান্ডের ৫০টি সিএনজি অটোরিকশা থেকে আড়াইশ’ টাকা করে ১২ হাজার ৫০০ টাকা চাঁদা তোলে।

এ ব্যাপারে জানতে ছাতকে দায়িত্বরত টিএসআই গোলাম মোস্তফার সঙ্গে একাধিক যোগাযোগের চেষ্টা করে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দিরাই থেকে বদলি হওয়া ট্রাফিক পুলিশের এক এটিএসআই যুগান্তরকে জানান, দিরাই থানায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের এটিএসআই/৮৩ সনজিত ভৌমিক ৪টি কোম্পানি, বিভিন্ন স্ট্যান্ডসহ ২২ জনের কাছ থেকে ৪৫ হাজার ৩০০ টাকা মাসোহারা নেন। প্রতি মাসের ১ থেকে ৫ তারিখের মধ্যে এটিএসআই সনজিত ভৌমিক নিজের ব্যবহৃত মোবাইল (০১৭২৩-৩৬১৪৮০/০১৯৮৩-২৩৩৪২৪) নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করে বিকাশের মাধ্যমে টাকা নিয়ে নেন। কিছু স্ট্যান্ড ও কোম্পানি সরাসরি তার হাতে টাকা দিয়ে আসে।

দিরাই বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন মোটরসাইকেল স্ট্যান্ডের সভাপতি মো. সোহেল মিয়া যুগান্তরকে বলেন, গত মাসেও টাকা দিয়েছি। দিন তিনেক আগে আমাদের নিজেদের মধ্যে একটি ঝামেলা হওয়ায় পৌর মেয়রের নির্দেশে মাসোহারা দেয়া বন্ধ রয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে এটিএসআই সনজিত ভৌমিকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে এবং ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এছাড়া সুনামগঞ্জ সদর থানায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের এটিএসআই খোরশেদ ৩৯টি কোম্পানির কাছ থেকে ৩৬ হাজার টাকা মাসোহারা নেন। প্রতি মাসের ১ থেকে ৫ তারিখের মধ্যে বিকাশের ০১৭২১৩৯৫৪৪৮ নম্বরের মাধ্যমে তার কাছে টাকা চলে যায়। কিছু স্ট্যান্ড ও কোম্পানি সরাসরি তার কাছে টাকা দিয়ে আসেন। স্টার সিগারেট কোম্পানির এক কর্মী জানান, প্রতি মাসে ৮০০ টাকা ট্রাফিকের লোকেরা আমাদের অফিসে এসে নিয়ে যান। তবে এটিএসআই খোরশেদ মাসোহারা নেয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।

সুনামগঞ্জ সদরে ট্রাফিকের টিআই সামছুল আলম, সার্জেন্ট অলিউর রহমান লেগুনা ও সিএনজি স্টেশন থেকে প্রতি মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা মাসোহারা নেন। মাসের ১-৫ তারিখের মধ্যে মালিক সমিতির সভাপতি মো. জাহিদুল ইসলাম, কোষাধ্যক্ষ মো. শহিদুল ইসলাম ট্রাফিক অফিসে গিয়ে টিআই সামছুলের নিকট দিয়ে আসেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন টিআই সামছুল আলম। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিদিনই গাড়ি ধরছি এবং মামলা দিচ্ছি।’

জানতে চাইলে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার বরকতুল্লাহ খান যুগান্তরকে বলেন, এ ধরণের কোনো তথ্য বা অভিযোগ আমার কাছে নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter