হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার বন্ধ

সংকটে হৃদরোগ চিকিৎসা

রোগী ফিরিয়ে দিচ্ছে হার্ট ফাউন্ডেশন * বিএসএমএমইউ’র সবগুলো ক্যাথল্যাব নষ্ট

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রাশেদ রাব্বি

দেশের প্রধান কয়েকটি হাসপাতালে হৃদরোগ চিকিৎসায় সংকটাবস্থা বিরাজ করছে। সব ধরনের হৃদরোগ চিকিৎসার একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার সংস্কারের দোহাই দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববদ্যালয়ের হৃদরোগ বিভাগের সবগুলো ক্যাথল্যাব মেশিন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। ফলে সেখানে বন্ধ রয়েছে সব ধরনের এনজিওগ্রাম ও এনজিওপ্লাস্টি। চিকিৎসার জন্য রোগীরা মিরপুরের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে গেলেও শয্যা সংকটের কারণ দেখিয়ে তাদের ফিরেয়ে দেয়া হচ্ছে।

জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, দু’দিন ধরে ওই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে আসা কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের রোগীদের ভর্তি করা হচ্ছে না। কারণ হাসপাতালের অপারেশর থিয়েটারে সংস্কার কাজ চলছে। তবে এ অবস্থা কতদিন থাকবে সে বিষয়ে কিছুই বলতে পারছেন না তারা।

যেসব রোগীর জটিল (শিশু ও প্রাপ্ত বয়স্ক) ভাসকুলার সার্জারি, বাইপাস সার্জারি, সিএপিজি, বাল্ব প্রতিস্থাপন বা চিকিৎসার প্রয়োজন তাদের ফিরে যেতে হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব রোগী দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসা না পেলে মৃত্যু ঝুঁকি থাকে। জানা গেছে, শুধু ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের ক্যাজুয়ালিটি ওটি চালু রয়েছে। যেখানে পায়ের শিরার অপারেশন ছাড়া আর তেমন কোনো কাজ করা হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, হৃদরোগ হাসপাতালে ৫টি অপারেশন থিয়েটার বা ওটি রয়েছে। এরমধ্যে প্রতিদিন অন্তত তিনটি ওটিতে কাজ চলে। এসব ওটিতে কমপক্ষে ৪ থেকে ৫টি ওপেন হার্ট সার্জারি হয়ে থাকে। কিন্তু ওটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানোর এসব জটিল অস্ত্রপচার স্থগিত থাকছে। এতে করে বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হবে। বাড়ছে তাদের মৃত্যু ঝুঁকি।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের একজন চিকিৎসক যুগান্তরকে জানান, ঈদের আগে ও পরে হৃদরোগ হাসপাতালে ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয়েছে এমন ৭ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে অস্বাভাবিক মনে হলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এমনকি এসব রোগীর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে সার্জারি বিভাগের উদ্যোগে একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন তৈরি করা হয়। যেখানে উল্লেখ করা হয়, সার্জারি ব্যবস্থার ত্রুটির জন্য নয় বরং ইনফেকশনের কারণেই এসব রোগীর মৃত্যু ঘটেছে। তবে বিষয়টি যেন জানাজানি না হয় সেজন্য নির্ধারিত দিনে ওই প্রেজেন্টেশনটি উপস্থাপিত হয়নি।

এ বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত হতে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের প্রায় বেশকিছু নমুনা মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের মাধ্যমে একটি আধুনিক ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এ চিকিৎসক জানান, জীবাণু সংক্রমণের বিষয়টি এক প্রকার নিশ্চিত। তবে পরীক্ষার পরে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

ওটি কমপ্লেক্স জীবাণুমুক্ত করতে কি ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার- জানতে চাইলে হাসপাতালের একজন অধ্যাপক বলেন, প্রাথমিকভাবে জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে এমন ৪২টি স্থান শনাক্ত করা হয়েছে। সম্পূর্ণ ওটি প্রথমে ফিউমিগেশন (গ্যাস দিয়ে জীবাণুমুক্তকরণ) করতে হবে।

স্টেবিলাইজার মেশিন পরিবর্তন করতে হবে, সিংক পুনস্থপান করতে হবে। এমনকি চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের ওটি পোশাকও জীবাণুমুক্ত করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ওটিতে নতুন নিয়াগপ্রাপ্ত নার্সদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। যাদের কার্ডিয়াক ওটি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই।

ফলে রোগ সংক্রমণ ও অপারেশনের পদ্ধতিগত ত্র“টি ঘটছে। জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, হাসপাতালের ভার্টিক্যাল এক্সটেনশন হচ্ছে। এতে হাসপাতালের বিভিন্ন অংশ স্যাঁতসেঁতে হয়ে পড়েছে। তাই জীবাণুর সংক্রমণ ঘটতে পারে।

এ ধরনের ঘটনা এর আগের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ঘটেছে। হাসপাতালের ওটি কমপ্লেক্স সংস্কার কাজ চলছে। তাই আপাতত খুবই স্বল্পপরিসরে অপারেশন চলবে। ওটি চালু হতে কতদিন লাগবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্টদের ১৫ দিনের মধ্যে ওটি চালু করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে আরও কিছুদিন বেশি লাগতে পারে।

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের তিন ক্যাথল্যাব মেশিনের তিনটিই নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এরমধ্যে অ্যাডাল্টদের জন্য দুটি মেশিনের একটি প্রায় দু’বছর ধরে নষ্ট এবং অন্যটিও প্রায় ৬ মাস ধরে নষ্ট। ইতিপূর্বে দু’বার রিপিয়ার করা হলেও এগুলো দিয়ে বেশিদিন কাজ চালানো সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে বাচ্চাদের জন্য নির্ধারিত পেডিয়াট্রিক ক্যাথল্যাবটিও বেশ কিছুদিন ধরে নষ্ট। এ মেশিনটি ঠিক করতে কোটি টাকা প্রয়োজন।

তবে মেশিনটির ওয়ারেন্টি পিরিয়ডও প্রায় শেষ। এ কারণে বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে সব ধরনের এনজিওগ্রাম ও এনজিও প্লাস্টি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে রোগীদের অনেকে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে। কেউবা হৃদরোগ হাসপাতালের দারস্থ হচ্ছে। আবার কেউবা বেসরকারি হাসপাতালের দালালের খপ্পরে পড়ে চিকিৎসার নামে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক (শিশু কার্ডিওলজি) ডা. মো. জাহিদ হোসেন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, অ্যাডাল্ট মেশিন দুটি নষ্ট থাকায় ধীর্ঘদিন ধরে এনজিওগ্রাম ও এনজিওপ্লাস্টি হচ্ছে না। মেশিন দুটি অনেক পুরনো হয়ে যাওয়ায় রিপিয়ার করেও কাজ চালানো যাচ্ছে না।

নতুন ক্যাথল্যাব মেশিন না আসা পর্যন্ত চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে না। পিডিয়াট্রিক ক্যাথল্যাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ মেশনটির মেয়াদকাল আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এমন সময় মেশিনটির এক্স-রে টিউব নষ্ট হয়ে গেছে। এ টিউবটি ঠিক করতে প্রায় এক কোটি টাকা প্রয়োজন।

এটি সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে নতুন মেশিন আনা দরকার। হৃদরোগ চিকিৎসায় জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের পরেই ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের অবস্থান। সেখানেও সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা।

হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, হার্ট ফাউন্ডেশনের আইসিইউতে জীবাণুর সংক্রমণ ঘটেছে। আইসিইউতে বেশ কিছু রোগীর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায় বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের রোগীদের অপারেশনের পরে আইসিইউতে রাখতে হয়।

কিন্তু জীবাণুর সংক্রমণ ঘটায় সেখানেও অপারেশন স্বল্প পরিসরে নামিয়ে আনা হয়েছে। পাশপাশি এখানকার রোগীদের হৃদরোগ হাসপাতালে রেফার করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের আইসিইউ বিভাগের চিকিৎসক ডা. হাসান মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং জনসংযোগ বিভাগে যোগাযোগ করতে বলেন। হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা ডলি যুগান্তরকে বলেন, প্রতিবছর ঈদের সময় নিয়মিতভাবে হাসপাতালের ওটি, আইসিইউ ইত্যাদি পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা হয়।

এবারও হয়েছে। সে সময় কিছুটা রোগীদের সমস্যা হতে পারে। তবে এখন কোনো সমস্যা নেই। আইসিইউতে সংক্রমণের কারণে রোগীদের হৃদরোগ হাসপাতালে রেফার করা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি এমন নয়। আইসিইউতে সিট কম থাকায় ওখানে রেফার করা হয়।