বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসছে রোহিঙ্গারা

৯৮ কোটি ৩১ লাখ টাকার প্রকল্প * সাড়ে চার কোটি টাকা যাবে পরামর্শকের পকেটে

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  হামিদ-উজ-জামান

আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নানা ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করছে বাংলাদেশ সরকার। এর অংশ হিসেবে রোহিঙ্গাদের এবার বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা হচ্ছে।

‘কক্সবাজারে আশ্রয়গ্রহণকারী বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের জন্য বিদ্যুতায়ন’ শীর্ষক প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকার। পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাবটি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বাপাবিবো)।

এটি বাস্তবায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) আর্থিক সহায়তা দেবে। কক্সবাজার জেলার টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে প্রথম পর্যায়ে রোহিঙ্গাদের বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, অনুমোদন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ৫ সেপ্টেম্বর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন সুপারিশ দিয়ে প্রকল্প প্রস্তাবটি ফেরত দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, তবে শিগগিরই সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। জরুরি প্রকল্প হিসেবে এটি দ্রুত অনুমোদন করা হবে বলেও তিনি জানান।

জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৯৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয় হবে। এর মধ্যে অনুদান হিসেবে এডিবি দেবে ৮১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এছাড়া সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বাপাবিবো) নিজস্ব তহবিল থেকে এক কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চার কোটি ২৬ লাখ টাকা পরামর্শকের পকেটে যাবে।

এ খাতে ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা হলেও শেষ পর্যন্ত ব্যয় কমাতে পারেনি পরিকল্পনা কমিশন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এডিবির অনুদান সহায়তায় যে কয়েকটি কম্পোনেন্ট বাস্তবায়িত হবে তার সবগুলোতে একই পরামর্শক কাজ করবেন।

তাই এ খাতে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। অন্য কম্পোনেন্টগুলোতে আর পরামর্শক ব্যয় প্রস্তাব নাও করা হতে পারে। এছাড়া পরামর্শক নিয়োগ এবং এর ব্যয় বহন করবে এডিবি। তিনি আরও জানান, দু-একদিনের মধ্যেই ডিপিপি সংশোধন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। ইতিমধ্যে প্রস্তুতিও শেষ হয়েছে।

এদিকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব ও এডিবি উইংয়ের প্রধান আলকামা সিদ্দিকী যুগান্তরকে জানান, এডিবির সঙ্গে ৮০০ কোটি টাকার অনুদান চুক্তি সই হয়েছে। সেই চুক্তির আওতায় চারটি কম্পোনেন্ট (প্রকল্প) বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে একটি হল- বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া। তবে এজন্য আলাদা কোনো চুক্তির প্রয়োজন হবে না বলেও তিনি জানান।

পিইসি সভা সূত্র জানায়, পরামর্শক সেবা বাবদ ৭২ জনমাসের জন্য ৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ৭১ লাখ টাকা এবং এডিবির অনুদান থেকে তিন কোটি ৫৫ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ৫০ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ, একটি ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন স্থাপন, ২০০টি গ্রিড সংযুক্ত স্ট্রিট লাইন স্থাপন, গৃহস্থালিতে বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে ৫০টি ন্যানো গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, ৪০০টি সৌরবিদ্যুৎচালিত ২০ ওয়াট ক্ষমতার এলইডি লাইন স্থাপন, ৭০ হাজার উন্নত চুলা বিতরণ করা।

এছাড়া বিদ্যমান ২৪/৪১ এমভিএ পাওয়ার ট্রান্সফরমারকে ৮০/১২০ এমভিএ ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা এবং এক সেট ক্যাপাসিটর ব্যাংক স্থাপন করা।

প্রকল্পের প্রস্তাবনায় বলা হয়, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যে প্রায় চার লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গা নিজেদের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি হারিয়ে জীবন বাঁচাতে উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নিয়েছে। ২০১৮ সালের ৩০ মে পর্যন্ত প্রায় ৬ লাখ ৯২ হাজার বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

এছাড়া ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা এদেশে প্রবেশ করে। সব মিলিয়ে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। এসব আশ্রিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই জনগোষ্ঠীর বহুমাত্রিক চাহিদা পূরণ এবং জীবনমান উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সহযোগিতায় নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এসব মানুষের মৌলিক অবকাঠামোগত এবং অপরিহার্য সেবা দেয়ার জন্য অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এডিবির প্রতি অনুরোধ জানানো হয়। সরকারের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এডিবির একটি মিশন ৩-৭ জুন কক্সবাজার পরিদর্শন করে।

রোহিঙ্গাদের মানবিক চাহিদা এবং হৃদয়বিদারক অবস্থা বিবেচনা করে ‘ইমার্জেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রজেক্টের’ আওতায় দুই পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য এডিবি এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা (২০ কোটি মার্কিন ডলার) অনুদান দিয়েছে। এর মধ্যে ৮০০ কোটি টাকায় প্রথম পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এডিবির অর্থায়নে সহায়তার খাতগুলো হল- ক্যাম্পে প্রবেশের রাস্তা নির্মাণ, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা করা, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রশমন করা।