আর্থিক খাতে নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি

খেলাপি ঠেকাতে আইন সংশোধন

রাজস্ব বাড়াতে বহুমুখী উদ্যোগ

  মিজান চৌধুরী ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১৮:২৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। ছবি: যুগান্তর
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। ছবি: যুগান্তর

আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে নতুন সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি। এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন, অবলোপনকৃত ঋণ পর্যালোচনায় শক্তিশালী কমিটি গঠন, ভালো ঋণগ্রহীতাদের প্রণোদনা, স্প্রেড (ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান) ও ঋণের সুদের হার কমানো, বিদেশ থেকে ঋণ গ্রহণে উৎসাহিত করা, সঞ্চয়পত্রের লাগাম টেনে ধরার মতো উদ্যোগ নেয়া হবে।

পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ বাড়াতে বহুমুখী উদ্যোগ নেয়া হবে। এর মধ্যে আগামী বাজেটে ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা হবে। একে ফলপ্রসূ করতে একটি কার্যকরী ভ্যাটহার নির্ধারণ করারও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

আর্থিক খাত নিয়ে নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক কমে আসত যদি বিদ্যমান সংশ্লিষ্ট আইনগুলো বলবৎ ও বাস্তবায়ন করা যেত।

এসব আইনে কিছু দুর্বলতা থাকায় তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। আইনের বিভিন্ন ধারা ও উপধারায় নিহিত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে। সে জন্য এ আইন সংশোধন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে এবং আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে এ আইনের সংশোধন করা হবে।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, স্বল্পমেয়াদে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত বড় মাপের খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া, ঋণখেলাপিদের মদদদাতা প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন এ অর্থনীতিবিদ। নতুন সরকার প্রধান দুটি ইস্যুর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। প্রধান হচ্ছে দুর্নীতি দমন, অপরটি হচ্ছে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরানো। এ নিয়ে অর্থমন্ত্রী নিজেও কাজ শুরু করে দিয়েছেন। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর ইতিমধ্যে তিনটি বৈঠক করেছেন সংশ্লিষ্টদের নিয়ে। এর মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে দু’দফা এবং ব্যাংকের এমডিদের সঙ্গে এক দফা বৈঠক করেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আর্থিক খাত ভালো অবস্থানে আছে। যেটুকু খারাপ আছে তা সব দেশেই আছে। আর্থিক খাতের সমস্যা শনাক্ত করে সংস্কার করতে হবে। সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই। একই সঙ্গে আর্থিক খাত আরও সম্প্রসারণ করারও চিন্তা করা হচ্ছে।

ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন : জানা গেছে, ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। খেলাপির কাজ থেকে টাকা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। বেশিরভাগ খেলাপির অনিয়ম দুর্নীতি নানা কেলেঙ্কারি আর চরম অব্যবস্থাপনায় নড়বড়ে দেশের ব্যাংকিং খাত।

ফলে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। এ জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রণীত ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিভিন্ন ধারা ও উপধারা পর্যালোচনা করা হবে। এরপর আইন সংশোধনের উপায় বের করা হবে।

অবলোপনকৃত ঋণ পর্যালোচনায় কমিটি গঠন :

সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকিং খাতে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা মন্দ ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা অবলোপন করা হয়েছে। এসব ঋণ পৃথকভাবে পর্যালোচনা করা হবে।

কেন এসব ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। এর জন্য দায়ী কে। পাশাপাশি সরকারের লোকজন এসব ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে কিনা- এসব খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠন করা হবে। ওই কমিটি পৃথক পৃথক কেইস পর্যালোচনা করবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, এ কমিটি গঠন করার উদ্দেশ্য হচ্ছে অবলোপনকৃত ঋণ মানে শেষ নয়। সেখান থেকে ঋণের অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা চালানো হবে। এ ক্ষেত্রে কমিটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

স্প্রেড কমানোর উদ্যোগ :

বর্তমান ঋণের সুদের হার অনেক বেশি। আমানত সুদের হার কম। ফলে স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী স্প্রেড ৫ শতাংশের মধ্যে থাকছে না। এই স্প্রেড কমানো নিয়ে নতুন সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা ৪ শতাংশের মধ্যে রাখতে বলেছে। কিন্তু সেটি থাকছে না। ঋণের সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে এলে স্প্রেড কমবে। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কাজ শুরু করেছে।

খেলাপিদের সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা :

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে অস্বাভাবিক হারে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। এসব খেলাপি হওয়ার পেছনে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে।

কারণ ঋণগ্রহীতা চেষ্টা করবে টাকা ফেরত না দিয়ে থাকার জন্য। তাকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে সহায়তা করা হয়েছে কিনা, সরকারিভাবে কোনো ত্র“টি-বিচ্যুতি হয়েছে কিনা সেটিও দেখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আর্থিক খাতের সংস্কার হিসেবে এটি করা হবে। পাশাপাশি জনবল সংকটও দূর করা হবে। বিশেষ করে স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোকবল নিয়োগ না দিয়ে সরাসরি নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কারণ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগকৃত জনবলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হয় না।

রাজস্ব আহরণ কার্যকরী রেট নির্ধারণ :

বর্তমান রাজস্ব আদায় মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আনুপাতিক হারে ১৬-১৭ শতাংশ যাওয়া উচিত। বর্তমানে আদায় হচ্ছে ৮-৯ শতাংশ। এ হার বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ জন্য আয়কর ও ভ্যাটের ওপরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

এই দুই খাত থেকেই সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় করা হবে। পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের ফলে যাতে জনগণ কষ্ট না পায় সেদিকেও খেয়াল রাখা হবে। এদিকে আগামী বাজেটে ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হবে। এতে যাতে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকেও নজর রাখতে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×