লাইফ সাপোর্টে শেয়ারবাজার

শেয়ারবাজারে অব্যাহত দরপতন ঠেকাতে নানা ধরনের তৎপরতা চলছে। বড় ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই তারা এগিয়ে আসছে না। অর্থ সংকটের কারণে তারা বাজারে সক্রিয় হতে পারছে না। ফলে বাজারও পারছে না ঘুরে দাঁড়াতে। এমন অবস্থায় শেয়ারবাজার চাঙা রাখতে কোরামিনের মতো ওষুধ দেয়া হচ্ছে। এসব নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন-

  মনির হোসেন ২১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শেয়ারবাজার

মাধ্যাকর্ষণ শক্তির চেয়েও বেশি গতিতে নিচের দিকে টানছে শেয়ারবাজার। ইতিমধ্যে তলানিতে এসেছে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম। কমছে লেনদেন। সব মিলে লাইফ সাপোর্টে চলে গেছে শেয়ারবাজার।

পুঁজি হারিয়ে ক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভ ইতিমধ্যে বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সামনে প্রতিবাদ মিছিল করছেন তারা। এসব মিছিল থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে।

এদিকে বাজার টেনে ধরে রাখার অবিরাম চেষ্টা করছে বিএসইসি। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাপোর্ট বাড়াতে চলছে নানা তৎপরতা। দরপতন ঠেকাতে অন্যান্য পক্ষগুলো থেকেও চেষ্টা চলছে। নতুন করে তারল্য প্রবাহ বাড়ানো এবং প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে সংস্কারসহ পাঁচ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেনের কাছে বৃহস্পতিবার প্রস্তাবগুলো দেয়া হয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজারে মূল সমস্যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট। এই সংকট কাটাতে উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের মতে, কৃত্রিমভাবে সাপোর্ট দিয়ে বাজার বেশিদিন ধরে রাখা যাবে না। এতে সব সময়ই একটি সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী লাভবান হয়।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, শেয়ারবাজারের মূল সমস্যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট। এ সংকট কাটাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এক্ষেত্রে এর আগে কারসাজির সঙ্গে জড়িত যাদের নাম এসেছে, তাদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের নিশ্চয়তা দিতে হবে, কেউ কারসাজির মাধ্যমে তাদের পুঁজি হাতিয়ে নিলে বিচার হবে। পাশাপাশি বাজারে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা করতে হবে।

জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনের পর কিছুদিন চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল শেয়ারবাজার। ফেব্রুয়ারি থেকে বাজারে পতন শুরু হয়। চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি ডিএসইর সূচক ছিল প্রায় ৫ হাজার ৯৫০ পয়েন্ট। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তা প্রায় ৭শ’ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ২৬০ পয়েন্টের নিচে নেমে এসেছে। আলোচ্য সময়ে ডিএসইর বাজারমূলধন ৬০ হাজার কোটি টাকা কমে ৩ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অস্বাভাবিকভাবে কমছে লেনদেন। গত এক সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে মাত্র ১ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। স্বাভাবিক সময়ে একদিনের লেনদেন এর চেয়ে বেশি। কারণ ডিএসইতে একদিনে ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা লেনদেনের রেকর্ড হয়েছে। বর্তমানে যা প্রায় এক মাসের লেনদেনের সমান। এভাবে বাজার তারল্য প্রবাহ কমায় স্টক এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ হাউসগুলো সমস্যায় পড়বে। খরচ কমাতে বেশ কিছু হাউসকে জনবল ছাঁটাইয়ে যেতে হবে।

অন্যদিকে বাজারে বড় বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাপোর্ট নেই। এর আগে কয়েকদিন দরপতন হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুরোধে বড় কয়েকটি হাউসের সাপোর্ট পাওয়া যেত। সাম্প্রতিক সময়ে সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। এখন কোনো প্রতিষ্ঠান দরপতন ঠেকাতে এগিয়ে আসছে না। যা দরপতনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

জানা গেছে, মোটা দাগে শেয়ারবাজারে দুই ধরনের সংকট চলছে। এক্ষেত্রে চাহিদার দিক থেকে সংকট হল এই বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নেই। ফলে নতুন বিনিয়োগকারী আসছে না। বাড়ছে না তারল্য প্রবাহ। আর সরবরাহের দিক থেকে সংকট হল বাজারে ভালো কোনো কোম্পানি আসছে না। বিশেষ করে ২০১১ সালের পর যেসব কোম্পানি প্রিমিয়ামের মাধ্যমে বাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে, তার অধিকাংশই খারাপ অবস্থায় রয়েছে। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে ১৭টি কোম্পানির শেয়ারের দাম ইস্যু মূল্যের নিচে নেমে এসেছে। অর্থাৎ বিএসইসি আইপিওতে (প্রাথমিক শেয়ার) যে দামে শেয়ার বিক্রি অনুমোদন দিয়েছে, সেকেন্ডারি মার্কেটে দাম তার চেয়ে অনেক কমে এসেছে। কোনো কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম অভিহিত মূল্যেরও নিচে নেমে এসেছে। তালিকাভুক্তির পর প্রথম দু-একদিন দাম বাড়লেও এরপর কমতে শুরু করে। এর মানে হল বিনিয়োগকারীরা বিএসইসির নির্ধারিত দামে এসব কোম্পানির শেয়ার কিনে বড় ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

ফলে শেয়ারবাজারের প্রতি মানুষের চরম আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। জানতে চাইলে ডিএসইর পরিচালক মো. রকিবুর রহমান সিঙ্গাপুর থেকে যুগান্তরকে বলেন, অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। সব সূচক ইতিবাচক। কিন্তু বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের অবস্থা পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসিসহ সব পক্ষকে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। বাজারের উন্নয়নে কাজ করতে হবে। তার মতে, ভালো কোম্পানি বাজারে নিয়ে আসার বিকল্প নেই।

এদিকে বৃহস্পতিবার বিএসইসির কাছে ডিএসইর দেয়া প্রস্তাবগুলো হচ্ছে- নতুন করে আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসা কোম্পানির প্লেসমেন্ট শেয়ারের পরিমাণ সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ এবং প্লেসমেন্টধারীর সংখ্যা সর্বোচ্চ সংখ্যা ৫০ জন। কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ন্যূনতম শেয়ার ২ শতাংশ ও উদ্যোক্তাদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের যে বাধ্যবাদকতা রয়েছে, তা কঠোরভাবে পালনের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি উদ্যোক্তা-পরিচালকের শেয়ার সিডিবিএলে ব্লক করে রাখা।

এই শেয়ার বিক্রির ক্ষমতা ডিএসইকে দেয়া এবং পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের সীমা বাড়ানো। প্লেসমেন্ট শেয়ারকে নিয়ন্ত্রণে আনা। লেনদেন শুরু হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী এক বছর প্লেসমেন্টের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসা কোম্পানির শেয়ার লকইন করে রাখা। এক্ষেত্রে শেয়ারগুলো সিডিবিএলের অ্যাকাউন্ট স্থগিত রাখা।

এছাড়াও নেটিং (এক কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে ওইদিনই অন্য কোম্পানির শেয়ার কেনা) সুবিধা চালু করা, ব্রোকার হাউসের সার্ভিস বুথ চালু, সারা দেশে হাউসগুলোর শাখা খোলা এবং গ্রামীণফোনের ওপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আরোপিত কর জটিলতার সমাধান।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×