মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা

কাল্পনিক নয়, বাস্তবভিত্তিক সম্ভাবনা রয়েছে -ড. জাহিদ হোসেন

  হামিদ-উজ-জামান ২৫ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে দেশের মূল্যস্ফীতির হার সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফলে লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছিই ওঠানামা করেছে গড় মূল্যস্ফীতি। কিন্তু চলতি (২০১৯-২০) অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। এরই মধ্যে ঊর্ধ্বমুখী ধারা নিয়েই শুরু হয়েছে অর্থবছর। আশঙ্কার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন, বন্যার কারণে আমনের উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কায় পণ্যমূল্য বাড়তে পারে। আবার চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, রেমিটেন্স বৃদ্ধি, মেগা প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতিতেও বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাড়বে সরকারি খাতের ঋণ। এসব কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ১০ মাসের তথ্য পর্যালোচনা করলেও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাজেটে নির্ধারিত সাড়ে ৫ শতাংশ লক্ষ্যপূরণ নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন শনিবার যুগান্তরকে বলেন, গত অর্থবছর খাদ্য মূল্যস্ফীতি যেটি কমার প্রবণতা ছিল, সেটি মূলত বাম্পার ফলনের কারণে। কিন্তু সেটি এখন আর নেই। কয়েকদিন আগে হয়ে যাওয়া বন্যার কারণে আমন উৎপাদন কম হলে চালের দাম একটু বাড়তে পারে। শাকসবজিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া গ্যাসের দাম বাড়ায় পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়াসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পণ্য উৎপাদন খরচ বাড়বে। এগুলোর প্রভাব হয়তো একদিনে পড়বে না। ৩-৪ মাসের মধ্যে এর প্রভাব পড়বে। তাছাড়া ভ্যাট আইনের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। যদিও এখনও পরিষ্কার নয়, কীভাবে এ আইন বাস্তবায়ন হবে। ভ্যাটের কারণে আমদানি, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষেত্রে পাইকারি খুচরা সবক্ষেত্রেই দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই প্রভাব পড়তে পারে মূল্যস্ফীতিতে। এছাড়া প্রবৃদ্ধির চাপ আছে। উৎপাদন ক্ষমতার চেয়ে যদি মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বেশি হয়, তখন চাহিদা সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ কারণেও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। সেই সঙ্গে মেগা প্রকল্পগুলোসহ অন্যান্য প্রকল্পে সরকারি ব্যয় বাড়ছে। ফলে চাহিদার ওপর চাপ আসবে। তাই এ কথা বলতে পারি, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আশঙ্কা কাল্পনিক নয়, বাস্তবভিত্তিক সম্ভাবনা রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে ড. জাহিদ বলেন, এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার চাপ কম রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম কম রয়েছে। তবে ট্রাম্পের বাণিজ্য-যুদ্ধ এবং জিও পলিটিক্যাল কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সেক্ষেত্রে দেশীয় বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম কয়েক মাস মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তো রয়েছেই। কেননা বন্যার কারণে শাকসবজির উৎপাদন কম হয়েছে। ধানের আবাদ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পণ্য সরবরাহ চেইন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ডেঙ্গুর কারণে মানুষের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করায় উৎপাদনের ওপর প্রভাব পড়েছে। চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়েছে। সবকিছু মিলিয়ে এই আশঙ্কা রয়েছে। তবে অক্টোবর নাগাদ কৃষি উৎপাদন যদি খাপ খাইয়ে নিতে পারা যায়, তাহলে হয়তো অর্থবছরের শেষদিকে মূল্যস্ফীতি কমতে পারে।

বিবিএসের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেশ কয়েক মাস থেকেই দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বিরাজ করছে। ভোক্তা মূল্য সূচক (সিপিআই) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের অক্টোবরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৪০ শতাংশ। সেটি নভেম্বরে এসে সামান্য কমে হয়েছিল ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ডিসেম্বরেও কিছু কমে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৩৫ শতাংশে। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৪২ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে সেটি আরও বেড়ে হয় ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ। মার্চে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এপ্রিলে আরও বেড়ে হয়েছিল ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ। মে মাসে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ। তবে জুনে কিছুটা কমে হয়েছিল ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। নতুন অর্থবছরের শুরুতেই জুলাইয়ে আবারও বেড়ে যায় মূল্যস্ফীতি। এক্ষেত্রে বেড়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৬২ শতাংশে। বিবিএস বলছে, মাছ, মাংস, ডিম, শাকসবজি, ভোজ্য তেল, মসলা ও কোমল পানীয় দ্রব্যের দাম জুলাইয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে। এছাড়া গ্যাসের দাম, চিকিৎসাসেবা, বাড়ি ভাড়া, পরিধেয় বস্ত্রাদি, শিক্ষা উপকরণসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ায় খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×