আস্থা সংকটে বীমা খাত

  মনির হোসেন ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্যোগপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বীমা খাতের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এ খাতের প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থার সংকটের কারণে সে সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বর্তমানে দেশের মোট জনশক্তির মধ্যে বীমার আওতায় আছে ৮ শতাংশেরও কম। জিডিপিতে এ খাতের অবদান মাত্র দশমিক ৫৫ শতাংশ। কিন্তু ভারতে তা ৪ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে বীমা কোম্পানিগুলোতে কর্মসংস্থান কমছে। স্বাভাবিক নিয়মে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কথা। কিন্তু এক বছরে উল্টো কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ৬ হাজার। বিশ্লেষকরা বলছেন, আস্থা সংকটের পাশাপাশি আরও কয়েকটি কারণে এই দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এরমধ্যে রয়েছে- গ্রাহকদের বীমা দাবি পূরণে অনীহা, দক্ষ জনবলের অভাব, কোম্পানিগুলোর পেশাদারিত্বে ঘাটতি, সামগ্রিকভাবে এ খাতের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন পণ্য না আসা, প্রযুক্তিগত দক্ষতায় পিছিয়ে থাকা, প্রয়োজনীয় আইন-কানুনে ঘাটতি এবং কোম্পানিগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা এ খাতের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এমনিতেই দেশের বীমা খাতের ভাবমূর্তি নেতিবাচক। তারা যথাসময়ে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ করে না। ফলে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। মানুষ বাধ্য না হলে বীমা কোম্পানির কাছে যেতে চায় না। এতে সামগ্রিকভাবে বীমা শিল্পের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি উপলব্ধি করে বীমা কোম্পানি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারকে কঠোর হতে হবে। বিশেষ করে কোনোভাবেই অপরাধীদের ছাড় দেয়া যাবে না।

তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে আশার দিকও কম নয়। সরকারসহ সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করছে, বীমা খাত বাদ দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্য সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এ সব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে অনেক অগ্রসর হবে। এতে জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান বাড়বে।

জানা গেছে, বর্তমানে দেশে বীমা কোম্পানির সংখ্যা ৭৮টি। এরমধ্যে সাধারণ ইন্স্যুরেন্স ৪৬টি এবং লাইফ ইন্সুরেন্স ৩২টি। উভয় খাতেই সরকারি একটি করে কোম্পানি রয়েছে। এ খাতে মোট গ্রাহক ১ কোটি ৩৩ লাখ ৭০ হাজার। এ হিসাবে দেশের মোট ৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ মানুষ বীমার আওতায় রয়েছে। এরমধ্যে সাধারণ বীমার গ্রাহক ২৪ লাখ ১৯ হাজার এবং লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ১ কোটি ১৯ লাখ ৮২ হাজার জন। আগের বছরের তুলনায় সামগ্রিকভাবে গ্রাহক বৃদ্ধির পেয়েছে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। এর মধ্যে লাইফ ইন্স্যুরেন্সে বেড়েছে ৯ শতাংশ এবং সাধারণ বীমা দশমিক ০৪ শতাংশ।

২০১৮ সাল শেষে বীমা খাতে মোট জনবল ছিল ৬ লাখ ৩৯ হাজার ২৬৫। এরমধ্যে সাধারণ বীমায় ১৯ হাজার ৬৪৬ এবং লাইফে ৬ লাখ ১৯ হাজার ৬১৯ জন। আগের বছরের তুলনায় ৫ হাজার ৯৫৬ জন কম। সামগ্রিকভাবে জনবল কমার হার দশমিক ৯২ শতাংশ। এরমধ্যে সাধারণ বীমায় ১ দশমিক ০৯ এবং লাইফে দশমিক ৯৮ শতাংশ। জানা গেছে, বিদ্যমান আইনে একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য বীমা বাধ্যতামূলক। এরমধ্যে রয়েছে অগ্নিবীমাসহ বিভিন্ন ঝুঁকি বীমা। আর এজন্য বীমা কোম্পানিকে মোটা অংকের প্রিমিয়াম দিতে হয়। এক্ষেত্রে কোম্পানিতে আগুন লাগাসহ অন্য কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বীমা কোম্পানির পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা। বিদ্যমান আইনে কোনো গ্রাহকের বীমা দাবি উত্থাপন হলে সার্ভে রিপোর্ট হাতে পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে ওই দাবি পরিশোধ করা বীমা কোম্পানির জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু গ্রাহকের দাবি পূরণের ক্ষেত্রে বীমা কোম্পানির হয়রানি ও প্রতারণা নিয়মিত ঘটনা। ক্ষতিপূরণের প্রাপ্য টাকা পরিশোধ না করে নানা রকম টালবাহানা করে কোম্পানিগুলো। নানা অজুহাতে গ্রাহকের পাওনা টাকা না দিয়ে বেশিরভাগ কোম্পানি হয়রানি ও প্রতারণা করে। বীমা খাতে ইতিমধ্যে এটি প্রতিষ্ঠিত। কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে শত শত অভিযোগ জমা আছে। জীবন বীমার অবস্থা আরও ভয়াবহ। পলিসি মেয়াদ শেষ হলেও প্রায় ২০ হাজার গ্রাহকের টাকা পাওনা রয়েছে। এরমধ্যে ৬ হাজার গ্রাহকের টাকা পরিশোধ করছে না ৫ জীবন বীমা কোম্পানি। গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স, বায়রা লাইফ, সানলাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ এবং সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এ কাজ করছে। টাকার দাবিতে গ্রাহকরা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থায় অভিযোগ করেছেন। জমানো টাকা ফিরে পেতে প্রতিদিনই তারা আইডিআরের অফিসে ভিড় করছেন। সর্বশেষ কোম্পানিগুলোকে টাকা পরিশোধের জন্য সর্বোচ্চ দুই মাস সময় দেয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোম্পানিগুলোর মালিকরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। মালিকপক্ষের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) নেতৃত্বেও আছেন এরা। তাই তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া যাচ্ছে না।

তবে আইডিআরএ বলছে, দাবি পূরণের সংখ্যা বাড়ছে। সংস্থাটির তথ্য অনুসারে সাধারণ ও জীবন বীমা মিলিয়ে ২০১৭ সালে মোট বীমা দাবির পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। এরমধ্যে ৬ হাজার ৫২০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। অর্থাৎ পরিশোধের হার ৬৮ দশমিক ৫২ শতাংশ। ২০১৮ সালে মোট বীমা দাবির পরিমাণ ৯ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। এরমধ্যে পরিশোধ হয়েছে ৭ হাজার ৪১২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ সময়ে পরিশোধের হার ৭৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এর মানে হল আইডিআরের পদক্ষেপের কারণে ২০১৮ সালে দাবি পরিশোধের হার ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়েছে। উল্লেখ্য, কিছু লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির বীমা দাবি পরিশোধে সক্ষমতা কমায় গ্রাহকদের বেশ কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

জানতে চাইলে আইডিআরের সদস্য গকুল চাঁদ দাস যুগান্তরকে বলেন, দাবি পূরণে সমস্যা আছে। তবে অগ্রগতি হচ্ছে। সাধারণ বীমার ক্ষেত্রে সমস্যা সার্ভেয়ার রিপোর্ট। সার্ভেয়াররা কী রিপোর্ট দিচ্ছে, তা আবেদনকারীরা জানে না। যখন রিপোর্ট দেয় তখন দাবির সঙ্গে তারা একমত হতে পারেন না। এতে সমস্যা তৈরি হয়। আর জীবন বীমার ক্ষেত্রে কয়েক কোম্পানির দাবি পূরণের সক্ষমতা নেই। এসব দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অর্থমন্ত্রী আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে যারা দাবি পূরণ করতে পারবে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান দশমিক ৫৫ শতাংশ। কিন্তু যুক্তরাজ্যের জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান ১১ দশমিক ৮ শতাংশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৮ দশমিক ১ শতাংশ, জাপানে ৮ দশমিক ১ শতাংশ, হংকং ১১ দশমিক ৪, ব্রাজিল ৩ দশমিক ২, চীনে ৩, ভারত ৪ দশমিক ১ এবং সিঙ্গাপুরের জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান ৭ শতাংশ।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×