নারীর অগ্রযাত্রায় নীতির বাস্তবায়ন জরুরি
jugantor
নারীর অগ্রযাত্রায় নীতির বাস্তবায়ন জরুরি
সরকারি খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করছেন ড. নাজনীন আহমেদ। তিনি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্য, শ্রমবাজার, জেন্ডারসহ অর্থনীতির নানা বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন। সম্প্রতি যুগান্তরের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে অর্থনীতিতে নারীর অবদান, নারী উদ্যোক্তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন -

  সাদ্দাম হোসেন ইমরান  

১৫ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুগান্তর : নারীর ক্ষমতায়নে সরকার বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে কম। এর কারণ কী?

ড. নাজনীন আহমেদ : ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রায় সব খাতেই নারী এগোচ্ছে। সরকার নারীর ক্ষমতায়নে বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। উচ্চশিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে স্কলারশিপ দিচ্ছে, নারী উদ্যোক্তাদের কম সুদে ও সহজ শর্তে ঋণের সুবিধা দিয়েছে। জনপ্রতিনিধি হিসেবে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আরও নানা সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন স্তরে নারীর ক্ষমতায়নের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এসব নীতির যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় নারীর উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না। যেমন- নারী উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়ার বিধান করেছে। ঋণের ক্ষেত্রে একজন জামিনদারের কথা বলা হয়েছে। এর চেয়ে কম ঋণ নিতে হলে গ্র“পভিত্তিক ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে, নারী উদ্যোক্তারা যত টাকা ঋণ চান, সে অনুযায়ী ব্যাংক তাকে ঋণ দেয় না। আবার জামিনদারের ক্ষেত্রেও দুইজন জামিনদার চায় ব্যাংক। তাই নারীর ব্যাংক ঋণ পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ছে। পর্যাপ্ত ঋণের অভাবে নারী উদ্যোক্তারা ব্যবসা বড় করতে পারছে না। ফলে তারা এসএমই’র গণ্ডিতেই ঘুরপাক খাচ্ছে। ব্যবসা বড় করার দিকে এগোতে পারছে না।

যুগান্তর : নারী উদ্যোক্তারা ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখী হয়। এগুলোর সমাধান কীভাবে করা যায় বলে মনে করেন?

ড. নাজনীন আহমেদ : ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট নিবন্ধন, টিআইএনসহ বিভিন্ন সংস্থার যাবতীয় সনদ নিতে হয়। একজন স্টার্টআপ নারী উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে এত নিয়মনীতি অনুসরণ করা দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এগুলো সংগ্রহ করাটাও ব্যয় সাপেক্ষ। ফলে এগুলো সংগ্রহ করতেই পুঁজির একটি অংশ ব্যয় হয়ে যায়। নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে শুরুর দিকে এসব বিধান কিছুটা শিথিল করা যেতে পারে। ভারতে একজন ব্যক্তি চাইলে তার এনআইডি কার্ড দিয়ে অনলাইনে ব্যবসা শুরুর যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারেন। বাংলাদেশেও এই পদ্ধতির প্রচলন করা গেলে নারী-পুরুষ উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু করা সহজসাধ্য হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে নারীদের জন্য এ পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। ব্যবসা বড় হওয়ার সঙ্গে আইনগত কাঠামোগুলো পরিপালন করা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

যুগান্তর : উৎপাদিত পণ্য বিপণন করা নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। এ ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে?

ড. নাজনীন আহমেদ : নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য বিপণন করা বড় একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। অনেক উদ্যোক্তা ভালো মানের পণ্য উৎপাদন করছেন, দামও কম। কিন্তু বিপণন দুর্বলতার কারণে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। মধ্যস্বত্বভোগীরা তাদের কাছ থেকে পণ্য কিনে নিয়ে চড়া দামে বিক্রি করছে। এতে নারী উদ্যোক্তারা মুনাফা পাচ্ছেন না। শিল্পনীতিতে নারীর পণ্য মার্কেটিংয়ের কথা বলা থাকলেও তার বাস্তবায়ন নেই। আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে, নারীর মার্কেট অ্যানালাইসিস করতে না পারা। অন্য নারীর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্যবসা শুরু করলেও সঠিক পণ্য সঠিক জায়গায় উৎপাদন ও বাজারজাত করতে না পেরে অনেকে সফল হতে পারছেন না। ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে খেলাপি হয়ে পড়ছেন। এ ধরনের দু-একটি কেস স্টাডির কারণেও ব্যাংক নারীদের ঋণ দিতে ভয় পায়।

যুগান্তর : অর্থনীতিতে নারীর অবদান বাড়াতে হলে করণীয় কী?

ড. নাজনীন আহমেদ : দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক প্রায় নারী। তাদের উৎপাদন কাজের বাইরে রেখে জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়ন হবে না। অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে বিদ্যমান নীতির সঠিক বাস্তবায়ন জরুরি। নারীকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, নারী অনেক প্রতিকূল সামাজিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করে কাজের জন্য সামনে এগোচ্ছে। ফলে তাদের জন্য সামাজিক সাপোর্ট যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সরকারি সাপোর্ট। একটি পরিবার থেকে শুরু করতে হবে। সে ব্যাপারে সরকারকে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে হবে।

নারীর অগ্রযাত্রায় নীতির বাস্তবায়ন জরুরি

সরকারি খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করছেন ড. নাজনীন আহমেদ। তিনি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্য, শ্রমবাজার, জেন্ডারসহ অর্থনীতির নানা বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন। সম্প্রতি যুগান্তরের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে অর্থনীতিতে নারীর অবদান, নারী উদ্যোক্তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন -
 সাদ্দাম হোসেন ইমরান 
১৫ মার্চ ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুগান্তর : নারীর ক্ষমতায়নে সরকার বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে কম। এর কারণ কী?

ড. নাজনীন আহমেদ : ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রায় সব খাতেই নারী এগোচ্ছে। সরকার নারীর ক্ষমতায়নে বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। উচ্চশিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে স্কলারশিপ দিচ্ছে, নারী উদ্যোক্তাদের কম সুদে ও সহজ শর্তে ঋণের সুবিধা দিয়েছে। জনপ্রতিনিধি হিসেবে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আরও নানা সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন স্তরে নারীর ক্ষমতায়নের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এসব নীতির যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় নারীর উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না। যেমন- নারী উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়ার বিধান করেছে। ঋণের ক্ষেত্রে একজন জামিনদারের কথা বলা হয়েছে। এর চেয়ে কম ঋণ নিতে হলে গ্র“পভিত্তিক ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে, নারী উদ্যোক্তারা যত টাকা ঋণ চান, সে অনুযায়ী ব্যাংক তাকে ঋণ দেয় না। আবার জামিনদারের ক্ষেত্রেও দুইজন জামিনদার চায় ব্যাংক। তাই নারীর ব্যাংক ঋণ পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ছে। পর্যাপ্ত ঋণের অভাবে নারী উদ্যোক্তারা ব্যবসা বড় করতে পারছে না। ফলে তারা এসএমই’র গণ্ডিতেই ঘুরপাক খাচ্ছে। ব্যবসা বড় করার দিকে এগোতে পারছে না।

যুগান্তর : নারী উদ্যোক্তারা ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখী হয়। এগুলোর সমাধান কীভাবে করা যায় বলে মনে করেন?

ড. নাজনীন আহমেদ : ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট নিবন্ধন, টিআইএনসহ বিভিন্ন সংস্থার যাবতীয় সনদ নিতে হয়। একজন স্টার্টআপ নারী উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে এত নিয়মনীতি অনুসরণ করা দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এগুলো সংগ্রহ করাটাও ব্যয় সাপেক্ষ। ফলে এগুলো সংগ্রহ করতেই পুঁজির একটি অংশ ব্যয় হয়ে যায়। নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে শুরুর দিকে এসব বিধান কিছুটা শিথিল করা যেতে পারে। ভারতে একজন ব্যক্তি চাইলে তার এনআইডি কার্ড দিয়ে অনলাইনে ব্যবসা শুরুর যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারেন। বাংলাদেশেও এই পদ্ধতির প্রচলন করা গেলে নারী-পুরুষ উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু করা সহজসাধ্য হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে নারীদের জন্য এ পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। ব্যবসা বড় হওয়ার সঙ্গে আইনগত কাঠামোগুলো পরিপালন করা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

যুগান্তর : উৎপাদিত পণ্য বিপণন করা নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। এ ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে?

ড. নাজনীন আহমেদ : নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য বিপণন করা বড় একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। অনেক উদ্যোক্তা ভালো মানের পণ্য উৎপাদন করছেন, দামও কম। কিন্তু বিপণন দুর্বলতার কারণে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। মধ্যস্বত্বভোগীরা তাদের কাছ থেকে পণ্য কিনে নিয়ে চড়া দামে বিক্রি করছে। এতে নারী উদ্যোক্তারা মুনাফা পাচ্ছেন না। শিল্পনীতিতে নারীর পণ্য মার্কেটিংয়ের কথা বলা থাকলেও তার বাস্তবায়ন নেই। আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে, নারীর মার্কেট অ্যানালাইসিস করতে না পারা। অন্য নারীর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্যবসা শুরু করলেও সঠিক পণ্য সঠিক জায়গায় উৎপাদন ও বাজারজাত করতে না পেরে অনেকে সফল হতে পারছেন না। ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে খেলাপি হয়ে পড়ছেন। এ ধরনের দু-একটি কেস স্টাডির কারণেও ব্যাংক নারীদের ঋণ দিতে ভয় পায়।

যুগান্তর : অর্থনীতিতে নারীর অবদান বাড়াতে হলে করণীয় কী?

ড. নাজনীন আহমেদ : দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক প্রায় নারী। তাদের উৎপাদন কাজের বাইরে রেখে জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়ন হবে না। অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে বিদ্যমান নীতির সঠিক বাস্তবায়ন জরুরি। নারীকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, নারী অনেক প্রতিকূল সামাজিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করে কাজের জন্য সামনে এগোচ্ছে। ফলে তাদের জন্য সামাজিক সাপোর্ট যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সরকারি সাপোর্ট। একটি পরিবার থেকে শুরু করতে হবে। সে ব্যাপারে সরকারকে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন