মুনাফালোভীদের অপতৎপরতা

পর্যাপ্ত মজুদ, উৎপাদন এবং মাত্রাতিরিক্ত আমদানির পর বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধির যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। তারপরও দফায় দফায় দাম বাড়ছে। ভোক্তা সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পণ্যমূল্য রোজাদারের জন্য স্বস্তিদায়ক থাকবে না। ঈদের কেনাকাটাও স্বস্তিদায়ক হবে না

  শাহ আলম খান ০৬ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রমজান নির্ভর পণ্যে প্রতিবছরের মতো এবারও মুনাফালোভী ব্যবসায়ী চক্রের অপতৎপরতা শুরু হয়েছে। আসন্ন ঈদকে সামনে রেখেও ভোক্তাদের পকেট কাটতে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আমদানিকারক থেকে শুরু করে পাইকারি বাজার এবং খুচরা বাজারের ব্যবসায়ীরাও সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। এসব তৎপরতায় ভোক্তারা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। সরকারের সব সতর্কতা উপেক্ষা করে নানা অজুহাতে পণ্য মূল্য বাড়ানোর অপকৌশল বাজারে প্রভাব ফেলছে। এ জন্যে রমজান আসার আগেই কিছু নিত্যপণ্যের দাম চড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে পেঁয়াজ, রসুন, খেজুর ও চিনির দামে এখনই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

যদিও পর্যাপ্ত মজুদ, উৎপাদন এবং মাত্রাতিরিক্ত আমদানির পর বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধির যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। তারপরও দফায় দফায় দাম বাড়ছে। ভোক্তা সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আসন্ন রমজানে পণ্যমূল্য রোজাদারের জন্য স্বস্তিদায়ক থাকবে না। ঈদের কেনাকাটাও স্বস্তিদায়ক হবে না। বরং পকেটের বাড়তি অর্থ খরচা করেই ভোক্তাকে এসব পণ্যের চাহিদা পূরণ করতে হবে। এ নিয়ে এখন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ নেই ভোক্তার।

বিশেষ করে নির্বাচনী বছর হওয়ায় আগের চেয়ে এবার সরকারি মহল তৎপর। পণ্য মূল্য বাড়লে ভোক্তাদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট পণ্যের ব্যবসায়ীদের ডেকে বৈঠক করে রমজানে পণ্যের দাম না বাড়াতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বাজার মনিটরিংও জোরদার করা হয়েছে। কিন্তু প্রতি বছর রমজানের আগে এভাবেই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের প্রতিনিধিদের দফায় দফায় বৈঠক হয়। দাম না বাড়ানোর অনুরোধ করা হয়। দেয়া হয় প্রশাসনিক হুমকি-ধামকিও। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সামলাতে দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন ব্যবসায়ীরাও। কিন্তু বৈঠক থেকে বের হওয়ার পর দেখা গেছে- বাজারের পরিস্থিতিতে খুব একটা হেরফের হয় না। বরং ক্ষেত্রভেদে বিশেষ কোনো পণ্যের দাম রমজানের আগে ও পরে আরও বাড়ে। যার দায় বাড়তি টাকায় ভোক্তাকেই মেটাতে হয়।

এর নেপথ্য কারণ হিসেবে বাজার বিশ্লেষকরা পাঁচটি সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছেন, যা বাজারে পণ্যের দামে প্রভাব ফেলতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। কারণগুলো হচ্ছে- ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফা প্রবণতা, বাজার সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধান কার্যকর না হওয়া, সরকারের দুর্বল মনিটরিং, পণ্যভিত্তিক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের উপস্থিতি, মুক্তবাজারের কথা বলে টিসিবিকে নিষ্ক্রিয় রাখা প্রভৃতি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসু যুগান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়ে। তবে পেঁয়াজ-রসুনের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কতটা বেড়েছে সেটা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অস্বাভাবিক মনে হলে জরুরিভিত্তিতে ব্যবসায়ীদের তলব করে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা নেয়া হবে। এজন্য সরকারের সব ধরনের মনিটরিং কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন দেশে প্রায় সব নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। কোনো কোনো পণ্যের মজুদ চাহিদার কয়েকগুণ বেশি আছে। সারা দেশে সরবরাহ ব্যবস্থাও স্বাভাবিক। কিন্তু এরপরও বাজারে এই গতিশীল মজুদ ও সরবরাহ ব্যবস্থার সুফল ভোক্তা পর্যায়ে গড়াচ্ছে না। কারণ কোনো উপলক্ষ সামনে আসা মাত্রই ব্যবসায়ীদের মধ্যে পণ্যভিত্তিক সিন্ডিকেট তৎপর হয়। বেশি চাহিদার পণ্যে এ প্রবণতা বেশি হচ্ছে। মৌসুম এলেই অজ্ঞাত স্থানের গুদামে সংশ্লিষ্ট পণ্যের মজুদ ধরে রাখা হয়। তৈরি করা হয় সরবরাহ চেইনের কৃত্রিম সংকট। যেসব পণ্য মজুদ করার সুযোগ নেই, সেসব পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক বাজার, ডলারের মূল্য, অতিবৃষ্টি, ঋণের উচ্চ সুদ, বন্দরে জট ও চাঁদাবাজির মতো নানা অজুহাত দাঁড় করানো হয়। এভাবে বাজারে সক্রিয় সিন্ডিকেটের কারসাজির মধ্য দিয়ে বাড়ে পণ্যের দাম।

সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, দেশে কয়েকটি নিত্যপণ্যের বাজার গুটিকয়েক মহাজনি প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি। সুযোগ পেলে প্রায়ই এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিক মুনাফা করার চেষ্টা করেন। কৌশল হিসেবে তারা কারখানায় ওভারহোলিং দেখিয়ে উৎপাদন বন্ধ রাখেন। এতেও সরবরাহ চেইনে ভাটা পড়ে। ফলে মিলগেটেই বেড়ে যায় সংশ্লিষ্ট পণ্যের দাম। এটা পাইকারি ও খুচরা সর্বত্রই দামের অস্থিরতা তৈরি করে, যা স্বাভাবিক হওয়ার আগেই মাত্র দিনকয়েকের ব্যবধানে কারসাজির মাধ্যমে বাজার থেকে হাতিয়ে নেন শতশত কোটি টাকা। যার পুরোটাই নেয়া হচ্ছে ভোক্তার পকেট কেটে।

বিগত কয়েকটি রমজানে চিনি নিয়ে এভাবেই দেশের শীর্ষ উৎপাদনকারী একাধিক কোম্পানি এমন নজির তৈরি করেছে। আসন্ন রমজানেও বহাল তবিয়তে আছেন সেই একই ব্যবসায়ীরা। তবে শুধু চিনি নয়, রমজানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছোলা, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, খেজুর ও ভোজ্যতেলসহ এমন অত্যাবশ্যকীয় ১৮টি নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে প্রতি বছরই কম-বেশি হইচই পড়ে। যদিও কোনোবারই মজুদ ও বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়নি। কিন্তু দাম বেড়েছে ব্যবসায়ীদের অসাধু তৎপরতার কারণে। কিন্তু চক্রটিকে সরকার চিহ্নিত করলেও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। ফলে রমজানকে এই অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার মৌসুম ও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি গোলাম রহমান যুগান্তরকে বলেন, কোন পণ্যে কারা দাম বাড়ায় সরকারের উচিত হবে তা চিহ্নিত করা। একইসঙ্গে কোন স্তর থেকে কতটা বাড়ানো হয় তার যৌক্তিক পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া। সরকার এখানে কতটা মনিটরিং করছে সেটি বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, ভোক্তাসাধারণকে মূল্যের নিরাপত্তা দিতে নিত্যপণ্যের মূল্য কারসাজির সঙ্গে জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। অবৈধ মুনাফাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়িক লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। নতুবা অকারণে অথবা রমজানের হুজুগে দাম বৃদ্ধির এ প্রতিযোগিতা কখনই রোধ করা যাবে না।

বাজারে ব্রয়লার মুরগির বর্তমান কেজিপ্রতি দাম ১৪৫-১৫৫ টাকা। এক সপ্তাহ আগে ছিল ১৩৫-১৪৫ টাকা। পেঁয়াজের বর্তমান মূল্য দেশি ৪০-৫০ টাকা এবং আমদানি ৩০-৩৫ টাকা। অথচ গত সপ্তাহে এর দাম ছিল যথাক্রমে ৩৫-৪০ টাকা ও ২৫-৩০ টাকা। আমদানিকৃত রসুনের মানভেদে দাম বর্তমানে ৯০-১১০ টাকা হলেও এক সপ্তাহ আগে ছিল ৮০-১১০ টাকা। এদিকে রমজান আসার আগেই এবার উল্লিখিত পণ্যগুলোর দাম বাড়তে শুরু করলেও এর নেপথ্য কারণ অনুসন্ধান করছে না সংশ্লিষ্টরা। দামবৃদ্ধির বিষয়ে দায়িত্বশীলদের তেমন কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখা যাচ্ছে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং টিম ও ভোক্তা অধিকার অধিদফতর নামমাত্র অভিযান নামলেও তাদের কার্যক্রম শুধুমাত্র জরিমানাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রমজানে পেঁয়াজের চাহিদা আছে মাত্র ৪ লাখ টন। অথচ মজুদ রয়েছে প্রায় ১৮ লাখ টন। রমজান আসতে বাকি আরও সপ্তাহ দেড়েক। তারপরও প্রতি কেজিতে বেড়েছে ১০-১৫ টাকা। একইভাবে প্রতি কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে রসুনেও। অন্যদিকে গরিবের আমিষ হিসেবে পরিচিত হচ্ছে ব্রয়লার মুরগি। গরুর মাংসের দাম অনেক আগেই সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় তাদের আমিষের চাহিদা পূরণের একমাত্র উৎস্য ছিল ব্রয়লার মুরগি। এখন সেটার দামও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ১০-১৫ টাকা এবং এক মাসের ব্যবধানে ২০ থেকে ২৫ টাকা বেড়েছে।

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.