রমজান ও ঈদকেন্দ্রিক টাকার প্রবাহ বাড়ছে

অর্থনীতিতে লেনদেন বাড়বে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা

  মনির হোসেন ০৬ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আসন্ন রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ছে। সুনির্দিষ্ট কয়েকটি খাত থেকেই আসছে অর্থের জোগান। যদিও ঈদের অর্থনীতির আকার নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই। তবে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হিসাব বলছে, রমজান ও ঈদ উপলক্ষে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হবে। এর মধ্যে উৎসবের প্রস্তুতি হিসেবে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স, ব্যাংকগুলোর স্বল্পমেয়াদি ঋণসহ বিভিন্নভাবে বাজারে আসছে টাকা। ফুটপাত থেকে শুরু করে দামি শপিংমল, অনলাইন বাজার সব জায়গায় চলছে প্রস্তুতি। এ ছাড়া এ বছরের উৎসবের গুরুত্ব আলাদা। কারণ চলতি বছরেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে দেশের জাতীয় নির্বাচন। আর এই নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের এলাকায় সরব উপস্থিতি এবং জাকাত ফিতরা বিতরণ বাড়বে। ইতিমধ্যে এর কিছুটা আমেজ শুরু হয়েছে।

পাইকারি ব্যবসায়ী সমিতি ও বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির নেতাদের দাবি, সারা বছরের ব্যবসায়ের জন্য রমজান মাস টার্নিং পয়েন্ট। এ সময়টিকে কোনো ব্যবসায়ীই হেলায় নষ্ট করতে চান না। তাই পাইকারি ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও অভ্যন্তরীণ উদ্যোক্তারা ব্যাংকের সঞ্চিত অর্থ, ঘরের জমানো টাকা ব্যয় করা ছাড়াও ঋণ করে, ধার করে কিংবা জমি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধক রেখে ঈদকেন্দ্রিক বিনিয়োগে খাটাচ্ছেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন যুগান্তরকে জানান, প্রতিবছর রমজানে ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বাজারে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বিনিয়োগ হয়। এ বছরও প্রস্তুতি একই রকম। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের শতভাগ প্রস্তুতি রয়েছে। ইতিমধ্যে আগাম একটি অংশ বিনিয়োগ করা হয়েছে। বাকি অংশ বিনিয়োগ চলছে। তিনি বলেন, বড় কোনো বিপর্যয় না হলে ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবে বিনিয়োগ করবে। রমজানে বিনিয়োগের অন্যতম একটি খাত হল ইফতার। রাজধানীতে ইফতারির বড় বাজার বসে চকবাজার ও বেইলী রোডে। এ ছাড়া পুরো রাজধানীতেই ছোট বড় ইফতার বাজার জমে ওঠে। ইতিমধ্যে রমজানকে কেন্দ্র করে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। পাশাপাশি অনলাইনের জন্য নেয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। সারা দেশে ৫ শতাধিক প্রতিষ্ঠান অনলাইনে পণ্য বেচাকেনা করছে। এ খাতে ২০ লাখের বেশি লোক কেনাকাটা করে। আর বাজারের আকার ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। রমজানকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা বলছেন, এ বছর অতিরিক্ত বর্ষার আশঙ্কা রয়েছে। মানুষ মার্কেট এড়িয়ে অনলাইনে ঝুঁকবে। এতে অনলাইনের কেনাকাটা বাড়বে।

জানা গেছে- চলতি অর্থবছরের হিসাবে দেশের মোট অর্থনীতির আকার হচ্ছে ২২ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা। রোজা ও ঈদ উৎসবের অর্থনীতি নিয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন তার নিজের একটি সমীক্ষা তুলে ধরে বলেন, রোজায় অতিরিক্ত ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন যোগ হচ্ছে। এর মধ্যে পোশাকের বাজারে ৩৫ হাজার ২শ’ কোটি টাকা, নিত্যপণ্যের বাজারে ২৭ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া জাকাত ও ফিতরা বাবদ আসছে ৬৭ হাজার কোটি টাকা। পরিবহন খাতে অতিরিক্ত যাচ্ছে ৬৬০ কোটি টাকা। ঈদকে কেন্দ্র করে ভ্রমণ ও বিনোদন বাবদ ব্যয় হয় ৪ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা। এর বাইরে আরও কয়েকটি খাতের কর্মকাণ্ড টাকার প্রবাহ বাড়বে। এর মধ্যে রয়েছে সাড়ে ১২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর, ৬০ লাখ দোকান কর্মচারী, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের ৭০ লাখ শ্রমিকের বোনাস। যা ঈদ অর্থনীতিতে আসছে। আরও রয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের টাকা। রমজান ও ঈদে টাকার অন্যতম একটি উৎস রেমিটেন্স (প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ)। ইতিমধ্যে রেমিটেন্স বাড়তে শুরু করেছে। প্রতিবছরই ঈদের সময়ে প্রবাসীরা তাদের আÍীয়স্বজনের কাছে বাড়তি ব্যয় মেটাতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে থাকেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. এমকে মুজেরী যুগান্তরকে বলেন, ঈদে সবচেয়ে টাকার প্রবাহ বাড়ে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এ টাকা পোশাক, ভোগ্যপণ্য, শৌখিনতা ও ভ্রমণসহ বিনোদনমুখী খাতে বেশি হচ্ছে। কাজেই এটা একটা বড় ভূমিকা রাখে অর্থনীতিতে। তিনি আরও বলেন, উৎসব অর্থনীতির আকার, ধরন ও ব্যাপ্তি আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। মানুষ এ উৎসব ঘিরে প্রচুর পরিমাণ অর্থ খরচ করেন। এতে উৎপাদনকারী, আমদানিকারক, ব্যবসায়ী প্রত্যেকে কিছু না কিছু লাভবান হচ্ছেন। সামগ্রিকভাবে পুরো অর্থনীতিতেই ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

জানা গেছে, ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় স্বাভাবিক সময়ে ফুটপাতে আড়াই লাখের মতো হকার থাকে। কিন্তু রমজান ও ঈদে মৌসুমি হকার আরও ২ লাখ বেড়ে যায়। এসব হকারদের মোট সংখ্যা ৪ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। এ ছাড়া ব্যস্ততা বেড়েছে অভ্যন্তরীণ বস্ত্র উৎপাদক প্রতিষ্ঠান, পাইকারি ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের। বেশিরভাগ ব্যবসায়ী রমজান ও ঈদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। বসে নেই দেশের নামিদামি শপিং মল, ফ্যাশন হাউস ও পাড়া-মহল্লার বুটিক-বাটিক দোকানগুলোও। শবেবরাতের পর থেকেই এসব উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ও পাইকারদের ঈদকেন্দ্রিক ব্যবসার জোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ঢাকায় ভিড় বেড়েছে রাজধানীর বাইরের (জেলা ও উপজেলা পর্যায়) ব্যবসায়ীদের। অধিকাংশ পাইকারি মার্কেট জমে উঠলেও খুচরা পর্যায়ের সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এখনও জমে ওঠেনি। ইতিমধ্যে ঢাকার পাইকারি মার্কেটে সারা দেশের ক্রেতাদের বিচরণ শুরু হয়েছে। সব ধরনের পাইকারি ব্যবসায়ী কম-বেশি অর্ডার সরবরাহ দিচ্ছেন। একই সঙ্গে ক্রেতাদের কাছ থেকে পাইকারি পর্যায়ের বিপুল অর্ডারও নিচ্ছেন। এসব বিনিয়োগকৃত অর্থের বেশিরভাগই ব্যবসায়ীরা নিজস্ব গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানে খাটিয়েছেন। অনেকে আবার আমদানির জন্য এলসি খুলেছেন। ফলে পাইকারি পোশাকের বাজার আর নামিদামি শপিং মলগুলোতে রমজান শুরু হওয়ার আগেই ঈদের বাতাস বইতে শুরু করেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এসে পোশাক ক্রয় করছেন। আর ক’দিন পরই এসব মার্কেট থেকে সরবরাহ করা তৈরি পোশাক সারা দেশের মার্কেট ও বিপণি বিতানগুলোতে শোভা পাবে। রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোয় অবস্থিত বিদেশি ব্র্যান্ড ও আউটলেটগুলোয়ও ঈদের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। প্রস্তুতি চলছে অনলাইনভিত্তিক পোশাক ও গিফট আইটেম বিক্রির প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদেরও। এমনকি যারা বুটিকসের কাজ করেন বা স্বল্প পরিসরে পোশাক নিয়ে কাজ করেন তারাও ঈদকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আর ডিজাইনার এবং ফ্যাশন হাউসগুলোর প্রচারণার জন্য মিডিয়াকেন্দ্রিক যোগাযোগ এবং কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে গেছে। এদিকে নিু আয়ের মানুষের জন্য বঙ্গবাজার ও ফুটপাতেও ঈদের জন্য বিশেষ আয়োজন চলছে।

 

 

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.