ভ্যাটের লক্ষ্য অটোমেশন

ফাঁকি হবে বন্ধ, বাড়বে আয়

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সাদ্দাম হোসেন ইমরান

অনলাইনে রিটার্ন দাখিল ও অটোমেশন- এ দুই ভিত্তির ওপর ভর করে মূল্য সংযোজন করের (মূসক বা ভ্যাট) বিশাল লক্ষ্য অর্জনের স্বপ্ন দেখছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

এর অংশ হিসেবে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রারের (ইসিআর) পরিবর্তে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এতে খুচরা ও বিপণন পর্যায়ে বিদ্যমান ভ্যাট ফাঁকি বন্ধ হবে। পাশাপাশি অনলাইনে রিটার্ন দাখিল পদ্ধতি চালু করতে বিধিমালা সংশোধন করা হচ্ছে। এ বিধিমালা কার্যকর হলে সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে হবে।

এনবিআর সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বর্তমানে যে পরিমাণ ভ্যাট আদায় হয়, তার দ্বিগুণেরও বেশি ফাঁকি হয়। অনলাইন ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে ভ্যাট ফাঁকি প্রায় বন্ধ করা সম্ভব।

এতে ব্যবসায়ীদের পুরো কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন হবে। ভুল ও অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য সফটওয়্যার ধরা পড়বে। প্রকৃত আয় ও উৎপাদন গোপন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। একজন ব্যবসায়ী কী পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করছে এবং এর ওপর ভিত্তি করে সঠিকভাবে পণ্য উৎপাদন এবং বাজারজাত হচ্ছে কিনা- তাও তদারকিতে আনা যাবে।

এছাড়া আইনে বাধ্যবাধকতা থাকলেও আজ পর্যন্ত ইলেকট্রনিক্স ক্যাশ রেজিস্ট্রার বা ইসিআর পদ্ধতি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে দোকান, সুপারসপ, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন সেবা খাতে যেসব খাতে ইসিআর মেশিন ব্যবহৃত হয়, তা থেকে সঠিক ভ্যাট পাওয়া যাচ্ছে না।

ইসিআর মেশিন অচল করে রাখা, মেশিন টেম্পারিং করে অসাধু ব্যবসায়ীরা জনগণের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করেও সরকারি কোষাগারে জমা দিচ্ছে না। লোকবলের অভাবে এনবিআর সেটি সঠিকভাবে মনিটরিং করতে পারছে না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ইএফডি মেশিন স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইসিআর মেশিন আছে, সেগুলোর পরিবর্তে ইএফডি মেশিন স্থাপন করা হবে। ইএফডি মেশিন সরাসরি ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

এতে পণ্যের কেনাবেচার রেকর্ড সরাসরি দেখতে পারবেন ভ্যাট কর্মকর্তারা। ইএফডি মেশিন সর্বত্র ব্যবহার নিশ্চিত করতে ইসিআর বিধিমালা সংশোধন করে ইএফডি মেশিনের স্পেসিফিকেশন অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আগামী মাস দুয়েকের মধ্যে বিধিমালাটি জারি করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের ভ্যাটনীতির সদস্য রেজাউল হাসান বলেন, ভ্যাট ব্যবস্থা অটোমেশন করতে পারলে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। এতে খুচরা ও বিপণন পর্যায়ে ভ্যাট ফাঁকি বন্ধ হবে। কারণ অটোমেশনে ব্যবসা প্রক্রিয়া সহজ হবে, স্বচ্ছতা আসবে। ভ্যাট আদায় বৃদ্ধিতে ইএফডি মেশিন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশাবাদী অর্থমন্ত্রীও।

তিনি তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, সারা দেশের বড় বড় রিসোর্ট হোটেল ও অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ইসিআর/পিওএস ব্যবহারের পরিবর্তে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে এনবিআরের সঙ্গে ইএফডি ব্যবহারকারীদের মধ্যে অনলাইন সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে। ফলে আইনানুগ রাজস্ব আদায় বাড়বে।

পাশাপাশি অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এজন্য পুরনো বিধিমালা সংশোধন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বিধিমালাটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ে আছে। ভেটিং শেষে এটি জারি করা হবে।

তখন সব প্রতিষ্ঠানকে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। যদিও প্রচলিত পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা থাকবে। তবে ১ জুলাই নতুন অর্থবছর থেকে মূল্য সংযোজন করা বৃহৎ করদাতা ইউনিটে অনলাইন কার্যক্রম পুরোপুরি চালু করা হচ্ছে।

এনবিআর সূত্র জানায়, অনলাইনে রিটার্ন দাখিল চালু করা গেলে একদিকে যেমন করদাতাদের হয়রানি কমবে, অন্যদিকে এনবিআরেরও মনিটরিং জোরদার হবে।

এতে মাঠপর্যায়ে ভ্যাট কর্মকর্তাদের কার্যক্রম অনেকাংশে কমে যাবে। বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতিতে জমা দেয়া রিটার্নের তথ্য ক্রস চেক করা সময়সাপেক্ষ। অনলাইন ব্যবস্থা চালু হলে প্রতিষ্ঠানে আমদানি তথ্য, বিক্রয়ের তথ্য, মুনাফার তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যাবে। এতে অডিটে তথ্য গোপন করা সম্ভব হবে না।

অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ইতিমধ্যেই বিধিমালায় সংশোধনী আনা হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে বৃহৎ করদাতা ইউনিটে (এলটিইউ-ভ্যাট) তা চালু করা হবে।

পাশাপাশি এ বছরে অনলাইনে কর পরিশোধ ব্যবস্থাও চালু করা হবে। অনলাইন রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়া পর্যাপ্ত পরিমার্জন শেষে সব করদাতার জন্য ব্যবহার উপযোগী করে তোলা হবে।

করদাতাদের সুবিধার্থে অনলাইন রিটার্ন দাখিলের পাশাপাশি যারা অনলাইন সুবিধা ব্যবহারে সমর্থ নন, তাদের জন্য প্রচলিত পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ অব্যাহত থাকবে।

পুরো ভ্যাট ব্যবস্থাকে অটোমেশন করা গেলে রাজস্ব আদায় বাড়বে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, রাজস্ব ভিত্তিতে সুদৃঢ় করতে সরকার ভ্যাট প্রশাসনকে ডিজিটাল করার অংশ হিসেবে ভ্যাট অনলাইন পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।

আইনি ও পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা দূর করে অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন কার্যক্রমকে বেগবান করা হয়েছে। ভ্যাট আদায়ে স্বচ্ছতা আনতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।