ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি গ্রাহক

গৃহঋণে অদৃশ্য ফি

উচ্চসুদের সঙ্গে আছে অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ ফি ও কমিশন * অসন্তোষের প্রতিকার নেই বিপাকে ঋণগ্রহীতারা

  হামিদ বিশ্বাস ১৯ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গৃহঋণের বিপরীতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত সুদ আদায় করছে। এর সঙ্গে রয়েছে নানা ধরনের অদৃশ্য ফি। একদিকে উচ্চসুদ, অন্যদিকে অদৃশ্যমান চড়া ফি, সার্ভিস চার্জ ও কমিশন। এসব মিলে গৃহঋণের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। গড়ে এ ক্ষেত্রে খরচের হার পড়ছে ২০-২৮ শতাংশ। প্রায় সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানেই খরচের হার কাছাকাছি বলে গ্রাহকদের কোনো বিকল্প নেই। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে গ্রাহকরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। এ খাতে মাত্রাতিরিক্ত সুদ ও চার্জের বিষয়ে গ্রাহকরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অভিযোগ করলেও তেমন কোনো প্রতিকার হচ্ছে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে গৃহঋণের সুদের হার ৯-১৮ শতাংশ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ১২-২২ শতাংশ। সুদহারের সঙ্গে গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা হয় আরও কমপক্ষে ৬ ধরনের সার্ভিস চার্জ, ফি ও কমিশন। এগুলোর মধ্যে আছে- ঋণ প্রসেসিং ফি, রেজিস্ট্রেশন ফি, যাচাই ফি, মনিটরিং ফি, হিসাব খোলা ও পরিচালনা ফি। কোনো কারণে কিস্তি পরিশোধে দেরি হলে বিলম্ব ফি, ঋণ আগাম পরিশোধ করে দিলেও তার ওপর ফি আরোপ করা হচ্ছে। ব্যাংকভেদে ঋণ মঞ্জুর প্রক্রিয়া ফি ০.৫০ থেকে ১.৫ শতাংশ। ঋণ তদারকির জন্য কোনো কোনো ব্যাংক ১ থেকে দেড় শতাংশ হারে কমিশন আদায় করে। এ কাজের জন্য ব্যাংকগুলো আলাদা এজেন্সি নিয়োগ করে। ঋণ দেয়ার আগে কোনো কোনো ব্যাংক জমি বা ফ্ল্যাটের ব্যাপারে আলাদা কোনো এজেন্সি দিয়ে খোঁজ করায়। এ ক্ষেত্রে মোট ঋণের বিপরীতে ১ থেকে দেড় শতাংশ হারে বাড়তি ফি আদায় করে। এ ছাড়া অ্যাকাউন্ট খোলা ও পরিচালনায় রয়েছে আলাদা ফি। এসব কারণে ঋণের খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

অর্থাৎ একজন গ্রাহক ১৪ শতাংশ সুদে ব্যাংক থেকে গৃহঋণ নিলে তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে আরও ৪-৬ শতাংশের বিভিন্ন সার্ভিস চার্জ। এতে সুদের হার অনায়াসে ২০ শতাংশে গিয়ে ঠেকছে। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেটা আরও বেশি। কোনো কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তা ২৮ শতাংশে পৌঁছে যায়। এভাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অদেখা সুদ কুরে কুরে খাচ্ছে গ্রাহকদের। ঋণ নিয়ে ঘরবাড়ি বানানো বা ফ্ল্যাট কেনা হলে ঋণের কিস্তি পরিশোধেই অনেকে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন।

এদিকে কয়েক মাস ধরে কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ করে গ্রাহকদের ঋণের সুদের হার ২-৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে ২ শতাংশ সুদ বাড়িয়ে গ্রাহকদের নোটিশ ধরিয়ে দিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। ডাচ্-বাংলা, ন্যাশনাল, প্রাইম ব্যাংকও একই এ ধরনের নোটিশ দিয়েছে গ্রাহকদের।

এদিকে একজন গ্রাহক মেয়াদ পূর্তির আগে একসঙ্গে পুরো টাকা পরিশোধ করতে চাইলে ব্র্যাক ব্যাংকের পক্ষ থেকে ২ শতাংশ চার্জ আরোপ করা হচ্ছে। অন্য ব্যাংকগুলোও এই ক্ষেত্রে ১ থেকে দেড় শতাংশ চার্জ আরোপ করছে। ফলে গ্রাহকরা আগাম ঋণ শোধ করতে গেলেও বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের জিম্মি করে গৃহঋণে উচ্চসুদ কাটছে। ২০-২২ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে অনেকেই টাকা পরিশোধ করতে পারবেন না। সে কারণে নিম্নমধ্য ও মধ্যবিত্তের শহরে বাড়ি করার স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সে বিবেচনায় নিুমধ্য ও মধ্যবিত্তের বাসস্থানকে অত্যাবশ্যকীয় ধরে তা বিনির্মাণে সরকারের উচিত হবে সহজ শর্তে ঋণ দেয়া।

এ প্রসঙ্গে আবাসন মালিকদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) প্রথম সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, বিশ্বের সব দেশে গৃহঋণ সহজ শর্তে দেয়া হয়। কিন্তু এখানে ব্যতিক্রম। এ ঋণে কোনো ঝুঁকি নেই। পর্যাপ্ত জামানত থাকে। তবুও কাটা হচ্ছে উচ্চসুদ। আমরা উচ্চসুদকে নিরুৎসাহিত করতে অনুরোধ করেছি। কিন্তু বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে গৃহঋণে সর্বোচ্চ সুদ কাটছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটি গত জুনে সুদ কেটেছে ১১-১৩ শতাংশ পর্যন্ত। এ ছাড়া জুনে বেসিক ১২ শতাংশ, বিডিবিএল ১০-১২ ও রূপালী ব্যাংক ৯-১১ শতাংশ সুদ কেটেছে। এর বাইরে রাষ্ট্রায়ত্ত আরও দুটি ব্যাংক গৃহঋণে সুদ কেটেছে ৯-১১ শতাংশ পর্যন্ত। গত জুলাই থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক এ খাতে ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। তবে এর বিপরীতে বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস চার্জ বহাল রয়েছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, বেসরকারি ৪০টি ব্যাংকের মধ্যে গৃহঋণে সর্বোচ্চ সুদ কাটছে ফারমার্স ব্যাংক। ব্যাংকটি গত জুনে সুদ কেটেছে ১৫-১৮ শতাংশ পর্যন্ত। একই সময়ে সীমান্ত ও ট্রাস্ট ব্যাংক সর্বনিু সুদ কেটেছে। এর মধ্যে সীমান্ত ৮ দশমিক ২৫ থেকে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ট্রাস্ট ৯-১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ কেটেছে। এ ছাড়া এনআরবি গ্লোবাল ১৬-১৭ শতাংশ, প্রিমিয়ার ব্যাংক ১৩-১৬, আল-আরাফাহ্ ১৩-১৬, মেঘনা ব্যাংক ১২ দশমিক ৫০ থেকে ১৫ দশমিক ৫০, ইউনিয়ন ব্যাংক ১৪-১৫, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক সাড়ে ১৫, ন্যাশনাল ব্যাংক ১২-১৫, এক্সিম ব্যাংক ১২-১৫, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ১২-১৫, ঢাকা ব্যাংক ১২-১৫ ও এবি ব্যাংক ১২-১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ কেটেছে। এর বাইরে বিদেশি ৯ ব্যাংকের মধ্যে ৪ ব্যাংক এ খাতে কোনো ঋণ দেয়নি। বাকি ৫ ব্যাংকের মধ্যে গৃহঋণে সর্বোচ্চ ১৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদ কেটেছে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। গত জুলাই থেকে এসব ব্যাংক সুদের হার সামান্য কমিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, গৃহঋণে উচ্চসুদ নেয়া অন্যায়। তবে এটি কমাতে হলে খেলাপি ঋণ কমানোর কোনো বিকল্প নেই। মূলত খেলাপি ঋণের বোঝা পরোক্ষভাবে সুদ আকারে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। এটা বন্ধ করতে হবে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৩৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গৃহঋণে সর্বোচ্চ সুদ কাটছে ফারইস্ট ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি গত জানুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত ১৫-২২ শতাংশ সুদ কেটেছে। এ ছাড়া ফাস ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ১৫-১৮ শতাংশ, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ১৪-১৭ শতাংশ এবং ফনিক্স ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ১৪-১৭ শতাংশ সুদ কেটেছে। এর বাইরে বেশিরভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠান গৃহঋণে সুদ কেটেছে ১৪-১৬ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে আইডিএলসি ফিন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আরিফ খান যুগান্তরকে বলেন, যারা উচ্চসুদে গৃহঋণ দিচ্ছে, তারা অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এটা বাজারের জন্য ক্ষতি। তিনি বলেন, কোনো ভালো প্রতিষ্ঠান উচ্চসুদে ঋণ দেয় না। যাদের খেলাপি ঋণ বেশি, তারাই গৃহঋণে উচ্চসুদ কাটছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর উদ্যোগ নেয়া দরকার।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter