চামড়াজাত পণ্যেই বাণিজ্য ২২ হাজার কোটি ডলার

চীন থেকে চামড়াজাত পণ্যের কারখানা স্থানান্তর, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, দেশেই পর্যাপ্ত কাঁচামালের প্রাপ্যতা মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন এবং শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা থাকায় বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছেন

  মিজান চৌধুরী ও ইয়াসিন রহমান ১৯ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ববাজারে প্রতি বছর চামড়াজাত পণ্যের বাণিজ্য হচ্ছে ২২ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের। এ বাণিজ্যে এককভাবে অধিপত্য ছিল চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর। সম্প্রতি চীনা কোম্পানিগুলো ধীরে ধীরে সেখান থেকে সরে আসছে। এ সুযোগে রফতানি বাণিজ্যে বড় হিস্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যে কারণে চামড়া থেকে চামড়াজাত পণ্যের রফতানির প্রবৃদ্ধি বাড়ছে।

বাংলাদেশে চামড়া খাতের আয়ের সিংহভাগ আসতো ফিনিশড চামড়া রফতানির মাধ্যমে। পরিস্থিতি পাল্টে এখন রফতানি আয়ের বড় অংশ আসছে চামড়াজাত পণ্য থেকে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে চামড়া রফতানি করে আয় হয় ৩৩ কোটি মার্কিন ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ আয় পর্যায়ক্রমে হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ১৮ কোটি ডলারে। অপর দিকে ২০১১-১২ অর্থবছরে চামড়াজাত পণ্য রফতানি আয় ছিল প্রায় ১০ কোটি ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪ কোটি ডলারে।

রফতানি আয়ের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ৭ বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্য রফতানি বেড়েছে ২৪ কোটি ডলার। একই সময়ে চামড়া রফতানি কমেছে ১৫ কোটি মার্কিন ডলার।

চামড়াজাত পণ্য রফতানি বৃদ্ধির নেপথ্যে পাঁচটি কারণে শনাক্ত করা হয়েছে। মূলত চীন থেকে চামড়াজাত পণ্যের কারখানা স্থানান্তর, উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধি, দেশেই পর্যাপ্ত কাঁচামালের প্রাপ্যতা, মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন এবং শুল্কমুক্ত বাজার-সুবিধা বহাল। এসব কারণে বিদেশি ক্রেতারা এখন বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যার্নাস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল সাখাওয়াত উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, এক সময় এ খাতের মোট আয়ের ৭০ শতাংশ চামড়া এবং ৩০ শতাংশ চামড়াজাত পণ্য রফতানি বাবদ অর্জন হতো। কিন্তু এখন এর বিপরীত চিত্রও পাওয়া যাচ্ছে। মোট আয়ের ৭০ শতাংশই আসছে চামড়াজাত পণ্য রফতানি বাবদ। এ জন্য এ শিল্পের উদ্যোক্তারা নতুন এ পরির্তনকে সামনে রেখে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন সরকার এ শিল্পের দিকে নজর দিলে রফতানি আয় আরও বাড়বে।

এদিকে সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলারে চামড়া খাতের রফতানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। চলতি অর্থবছরে এ খাত থেকে আয়ের লক্ষ্য ৪ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। ফলে আগামী দু’বছরে এ খাত থেকে আরও ৬০০ কোটি ডলার আয় বাড়াতে হবে।

উদ্যোক্তাদের মতে, এ খাতে বেশ কিছু সমস্যাও আছে। এসব সমাধান করতে পারলে সরকারের রফতানি আয়ের কৌশল অর্জন করা সম্ভব। বিশেষ করে চামড়া প্রক্রিয়াকরণে পরিবেশদূষণ রোধ করতে হবে। এক্ষেত্রে নতুন শিল্প নগরীতে দ্রুত বর্জ্য শোধনাগার সিইটিপি চালু করতে হবে। এছাড়া রফতানিতে লিডটাইম বা পণ্য তৈরি করে জাহাজীকরণ করতে সময় বেশি লাগে। এটি কমিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি রয়েছে পণ্য বৈচিত্র্যের অভাব, দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি, কারিগরি জ্ঞানের অভাব। এছাড়া অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও বন্ডসহ এ জায়গাগুলোতে সরকারকে বেশি নজর দিতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশের শীর্ষস্থানীয় পাদুকা উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা বলেন, নতুন বাজার ধরতে আমাদের প্রয়োজন কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষ শ্রমিক। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ইউরোপে রফতানি বাড়াতে হলে পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। সাধারণ জুতা তৈরি করে বাজার ধরা যাবে না। এ জন্য বাংলাদেশে পণ্য উন্নয়ন কেন্দ্র দরকার। তার মতে ইতিবাচক দিক হচ্ছে বিশ্বের নামিদামি নাইকি, অ্যাডিডাস, টিম্বারল্যান্ড, আলদো, সিয়ার্স, জেনেসকো, স্টিভ ম্যাডেন, হুগো বস, মেসি’জ, স্যান্ডারগারড, ডায়েচম্যান, এবিসি মার্ট, এইচঅ্যান্ডএম ব্র্যান্ডের কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে জুতা কেনা শুরু করেছে। এটি ধরে রাখতে হবে।

জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে মানিব্যাগ, নারীদের পার্টস, পুরুষদের অফিসিয়্যাল ব্যাগ, ট্রাভেল ব্যাগ, কার্ড হোল্ডার, ওয়ালেট, বেল্ট, চাবির রিং, জুতা, শীত নিবারণের জন্য জ্যাকেট, হাত ও পা মোজা, কলমদানিসহ অন্যন্যা চামড়াজাত পণ্য রফতানি হচ্ছে। এর সঙ্গে আরও নতুন পণ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বড় বাজার ইতালি। এর পরই রয়েছে যুক্তরাজ্য, আমেরিকা, কানাডা, স্পেন, ফ্রান্স। এর বাইরে সম্প্রতি জাপান, জামার্নি, সুইডেন, সুইজারল্যান্ডে সীমিত আকারে রফতানি হচ্ছে। এখন ভারত, নেপাল, চীন, অস্ট্রেলিয়ার পাইকারি ক্রেতারাও বাংলাদেশ থেকে চামড়াজাত পণ্য নিচ্ছেন। তবে উদ্যোক্তারা মনে করছেন ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্যের বাজার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ জন্য উল্লিখিত বাজারের বাইরে নিজস্ব উদ্যোগে নতুন বাজারের সম্ভাবনা হিসেবে উজবেকিস্তান, তাজাকিস্তান, রাশিয়া, চীন, মালয়েশিয়া, সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশে নতুন বাজার অনুসন্ধান করছেন বলে জানা গেছে।

ইপিবির সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ চামড়া রফতানি করেছে ১৮ কোটি মার্কিন ডলার, চামড়াজাত পণ্য রফতানি হয় প্রায় ৩৪ কোটি ডলার এবং জুতা রফতানি হয়েছে প্রায় ৫৭ কোটি ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চামড়া রফতানি হয়েছে ২৩ কোটি মার্কিন ডলার, চামড়াজাত পণ্য রফতানি হয় প্রায় ৪৬ কোটি ডলার এবং জুতা রফতানি হয়েছে প্রায় ৫৩ কোটি ডলার। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ চামড়া রফতানি করেছে ১৮ কোটি মার্কিন ডলারে, চামড়াজাত পণ্য রফতানি হয় প্রায় ৩৪ কোটি ডলার এবং জুতা রফতানি হয়েছে প্রায় ৫৭ কোটি ডলার।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter