বড় ঋণে বড় জালিয়াতি

প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  বিশেষ প্রতিনিধি

ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণে বড় ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যাংক কর্মকর্তা, গ্রাহক ও জামানতের সম্পদ মূল্যায়নকারী সংস্থার কর্মকর্তারা জড়িত।

এ ধরনের ঋণ বিতরণে জালিয়াতির প্রবণতা ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে ঋণ তদারকি করতে ড্যাশবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অনলাইনে তদারকি করা হচ্ছে। এরপরও ঋণ জালিয়াতি ঠেকানো যাচ্ছে না।

২০১১-১৭ সাল পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে আলোচিত কয়েকটি বড় ধরনের ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে- রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকে হলমার্ক গ্রুপ, জনতা ব্যাংকসহ ৫টি ব্যাংকে বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও জনতা ব্যাংকে ক্রিসেন্ট গ্রুপ।

এ ছাড়া ঋণ বিতরণের নামে দুটি ব্যাংকে জালিয়াতি হয়েছে। এগুলো হচ্ছে সরকারি খাতের বেসিক ব্যাংক এবং বেসরকারি খাতের ফারমার্স ব্যাংক। দুটি ব্যাংকের অবস্থাই এখন খারাপ।

হলমার্ক গ্রুপ সোনালী ব্যাংকের শেরাটন শাখা থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। দেশের ভেতরে এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানিতে পণ্য বিক্রির নামে ভুয়া অভ্যন্তরীণ বিল কেনাবেচা করে ২৬টি ব্যাংক থেকে এসব অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এমনকি সোনালী ব্যাংকের লন্ডন শাখা থেকেও অর্থ আত্মসাৎ করেছে হলমার্ক গ্রুপ। এ ঘটনায় হলমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভির মাহমুদ ও এক জিএম জেলে আটক রয়েছেন। এ ছাড়া সোনালী ব্যাংকের ৩৫ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এদের অনেকে এখনও জেলে রয়েছেন।

বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারি করেছে ৫টি ব্যাংকে। তারা ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পুরো অর্থই বিদেশে পাচার করেছে। এর মধ্যে জনতা ব্যাংক থেকে ৫২৭ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংক থেকে ৩২৭ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে ৬১ কোটি, যমুনা ব্যাংক থেকে ১৫৪ কোটি এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ১১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তারা এখন দুবাইয়ে পালিয়ে গেছেন। ওখানে তারা একটি অভিজাত হোটেলের ব্যবসা করছেন।

ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি হচ্ছে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি। এ ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ঘটনার পর ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে গেছে।

এমডিসহ ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা পলাতক ও জেলে রয়েছেন। ওইসব ঋণ আদায় না হওয়ায় এখন খেলাপি হয়ে গেছে। যে কারণে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি।

ফারমার্স ব্যাংকে ঘটেছে অভিনব এক ঋণ কেলেঙ্কারি। এই ব্যাংকে পরিচালকদের সহায়তায় বড় অঙ্কের ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এতে ব্যাংকটি চরম তারল্য সংকটে পড়ে গ্রাহকদের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয়।

ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো ব্যাংকিং খাতে। সম্প্রতি ধরা পড়েছে জনতা ব্যাংকে দুটি বড় ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা। এতে ব্যাংকের খোয়া গেছে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা।

এর মধ্যে ক্রিসেন্ট গ্রুপ নিয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। আরও একটি গ্রুপ নিয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। এ ঘটনায়ও ব্যাংকটি সংকটে পড়েছে। ঋণের টাকা আদায়ে জোরালো তৎপরতা শুরু হয়েছে।

এ ছাড়াও বিভিন্ন ব্যাংকে আরও কিছু বড় অঙ্কের ঋণে জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। সেগুলো বিচ্ছিন্নভাবে ঘটেছে বলে তেমন সাড়া ফেলেনি। এর মধ্যে ব্যাংকের পরিচালকরাও নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে টাকা আত্মসাৎ করছেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তারাই জড়িত থাকে। তারা নিজেরা বা কারও চাপে পড়ে দুর্নীতি না করলে কোনোভাবেই ঋণ জালিয়াতি ঘটতে পারে না।

এমনকি ঋণ নিয়ে ভিন্ন খাতে ব্যবহার করাও সম্ভব নয়। কেননা প্রতিটি ঋণগ্রহীতাকেই ব্যাংক কর্মকর্তারা চেনেন। তারা কি ব্যবসা করছেন সেগুলোর খবরও রাখেন। অন্যত্র অর্থ স্থানান্তর করলে প্রতিযোগী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই জানতে পারেন।

এদিকে বড় অঙ্কের ঋণ জালিয়াতি প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, এ ধরনের ঋণ জালিয়াতি ঠেকাতে পারলে ব্যাংকিং খাতে ক্ষতির প্রবণতা অনেক কমে যাবে। একই সঙ্গে কমবে খেলাপি ঋণের হারও। ব্যাংকিং খাতে একটি বড় অঙ্কের ঋণ জালিয়াতি হলে এর নেতিবাচক প্রভাব অনেক ব্যাংকেই পড়ে।

এ কারণে বড় ঋণের বিষয়ে তদারকি বাড়াতে হলমার্ক জালিয়াতির পরপরই ড্যাশবোর্ড স্থাপন করে। এর মাধ্যমে অনলাইনে বড় অঙ্কের ঋণ তদারকি শুরু করে। কিন্তু ব্যাংকগুলো বেনামে ঋণ দেয়ায় এই জালিয়াতি ধরা পড়ছে না।