পণ্য ও সেবায় এবার ইএফডি

অবহেলা, তদারকির অভাব, আইনের প্রয়োগ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণেই সব ক্ষেত্রে ইসিআর কার্যকর ব্যর্থ হয়েছে

  সাদ্দাম হোসেন ইমরান ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভ্যাট আদায় বাড়াতে ২০০৮ সালে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রার (ইসিআর) পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু আইনের এ বাধ্যবাধকতা কার্যকর হয়নি। আর এ সুযোগে শত শত কোটি টাকা ভোক্তার পকেট থেকে চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ীদের মুনাফায়। সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারালেও কর্মকর্তাদের মাসোহারা কমেনি। এ অবস্থায় অনেক কর্মপরিকল্পনা নিয়েও ইসিআর কার্যকরে ব্যর্থ হয় রাজস্ব প্রশাসন। এতে সার্বিক রাজস্ব আদায়ে বিরূপ প্রভাব পড়লেও ভ্যাট ফাঁকি কমানো যায়নি। এ অবস্থায় ইসিআর মেশিনের পরিবর্তে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। পর্যায়ক্রমে ছোট-বড় সব সেবাখাতে এ পদ্ধতি চালু হলে ভ্যাট ফাঁকি অনেকাংশেই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা, তদারকির অভাব, আইনের প্রয়োগ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতার পাশাপাশি ভ্যাট আদায়ে সংশ্লিষ্ট মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণেই সব ক্ষেত্রে ইসিআর কার্যকর ব্যর্থ হয়েছে। গত ১০ বছর ধরে এ নিয়ে অনেক সিদ্ধান্ত হয়েছে; কিন্তু মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অসহযোগিতায় আধুনিক এ প্রযুক্তিটি কাগজে-কলমেই থেকে যায়। আর এ সুযোগে পারস্পরিক যোগসাজশে ভ্যাট ফাঁকি বেড়ে যায়।

এ বিষয়ে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ইসিআরের ভুলভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে ইএফডি পদ্ধতির প্রবর্তন করা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন হলে ভ্যাট আদায়ে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যেই ইএফডি বিধিমালা জারি করা হয়েছে। এখন আগ্রহী আমদানিকারকরা বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ ইএফডি মেশিন আমদানি করতে পারবেন। শিগগিরই ভ্যাট কমিশনারদের নিজ নিজ কমিশনারেটের অধীনে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইএফডি মেশিন স্থাপন বা প্রতিস্থাপনে নির্দেশ দেয়া হবে।

জানা গেছে, ২০০৮ সালের ১৫ মে ১১টি সেবা ও ব্যবসা খাতে ইসিআর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে এনবিআর একটি আদেশ জারি করে। যেসব খাতে ইসিআর বাধ্যতামূলক করা হয় সেগুলো হচ্ছে হোটেল, রেস্তোরাঁ, মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, আসবাবপত্রের বিপণন কেন্দ্র, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, মেট্রোপলিটন এলাকার অভিজাত শপিং সেন্টারের সব ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, জেনারেল স্টোর, অন্যান্য বড়, মাঝারি, পাইকারি ও খুচরা প্রতিষ্ঠান, স্বর্ণকার ও রৌপ্যকার, স্বর্ণ ও রৌপ্যের দোকানদার।

বর্তমানে সারা দেশে কতগুলো ইসিআর মেশিন সচল আছে তার সঠিক পরিসংখ্যান এনবিআরে নেই। তবে ২০১৬ সালের নভেম্বরে এনবিআর থেকে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠনো হয়। যাতে বলা হয়েছিল, ১১টি ভ্যাট কমিশনারেটের আওতায় ৮ হাজার ৭টি ইসিআর ব্যবহারযোগ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো ইসিআর মেশিন ব্যবহার করছে না। এর দুই মাস আগে ভ্যাট গোয়েন্দা থেকে এনবিআরে একটি চিঠি দিয়ে ভ্যাট ফাঁকির ১০টি কৌশল তুলে ধরা হয়, যার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে নকল ভ্যাট চালান ব্যবহার, একই ভ্যাট চালান একাধিকবার ব্যবহার, বিক্রয়ের তথ্য রেজিস্টারে এন্ট্রি না করা, ইসিআর/পিওএস মেশিন ব্যবহার না করা, নষ্ট করে রাখা, ইসিআর বা পিওএস মেশিনে দুই ধরনের সফটওয়্যারের ব্যবহার অন্যতম।

যেভাবে দুঃখ ঘোচাবে ইএফডি : ইসিআরের পরিবর্তে ইএফডি চালু করা হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ভ্যাট কর্মকর্তাদের কারসাজি বন্ধ হবে। কারণ ইএফডি মেশিন সরাসরি ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। অর্থাৎ চাইলেই ব্যবসায়ীরা বিক্রয়ের তথ্য গোপন করতে পারবেন না। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতিদিনকার বেচাবিক্রির রেকর্ড সরাসরি এনবিআরের সার্ভারে চলে যাবে। আর নতুন মেশিন টেম্পারিংও করা যাবে না। মেশিন টেম্পারিং করলে তার তথ্যও ঘরে বসেই পেয়ে যাবেন ভ্যাট কর্মকর্তারা। সম্প্রতি ইএফডি মেশিনের ফিচারসংবলিত নতুন বিধিমালা জারি করেছে এনবিআর। এ বিধিমালা ইএফডি মেশিনের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, ইএফডি মেশিন ভ্যাট আদায়ে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। এতে ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ শূন্যের কোটায় নেমে আসবে। পণ্য ও সেবা খাতে ভ্যাট আদায়ের পরিমাণ উল্লেখ্যযোগ্য হারে বাড়বে। আগে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ইসিআর মেশিন মনিটরিং করায় মাঠ পর্যায়ের ভ্যাট কর্মকর্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যোগসাজশের মাধ্যমে ভ্যাট ফাঁকি দিতে পারতেন। ইএফডিতে সেটি সম্ভব নয়।

নতুন বিধিমালায় ইএফডি মেশিনের কলেবর বাড়ানো হয়েছে। ১১টির পরিবর্তে ১৩ ধরনের প্রতিষ্ঠানে ইএফডি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইএফডি ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ফাস্টফুড শপ, মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, আসবাবপত্রের বিক্রয় কেন্দ্র, পোশাক বিক্রির কেন্দ্র ও বুটিক শপ, বিউটি পার্লার, ইলেকট্রনিক ও ইলেকট্রিক্যাল গৃহস্থালি সামগ্রীর বিক্রয় কেন্দ্র, কমিউনিটি সেন্টার, অভিজাত শপিং সেন্টারের অন্তর্ভুক্ত সব ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, জেনারেল স্টোর ও সুপারশপ, বড় ও মাঝারি ব্যবসায়ী (পাইকারি ও খুচরা) প্রতিষ্ঠান, স্বর্ণকার ও রৌপ্যকার এবং স্বর্ণ-রৌপ্যের দোকানদার এবং স্বর্ণ পাইকারি।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter