মিউচুয়াল ফান্ডের দুর্দিন

৩২টির দাম অভিহিত মূল্যের নিচে, লোকসান ৩ হাজার কোটি টাকা, মেয়াদ বাড়ছে ১০ বছর

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মনির হোসেন

বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনার পরও শেয়ারবাজারে মিউচুয়াল ফান্ডের দুর্দিন কাটছে না। ৩৭টি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩২টির দাম অভিহিত মূল্যের নিচে।

কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম অভিহিত মূল্যের অর্ধেকের নিচে নেমেছে। ফলে ৫ হাজার ৩শ’ কোটি টাকার এ তহবিলের বাজারমূল্য ২ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। আর এখাতে বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা আটকে আছে। সর্বশেষ তথ্য অনুসারে এ বছরও বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ দেয়ার সক্ষমতা নেই।

সাম্প্রতিক সময়ে ১০ বছর মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের সময় আরও ১০ বছর বাড়ানো হয়েছে। এর আগেও মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ারের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন সংরক্ষণে বিশেষ ছাড় দেয়া হয়েছে।

কিন্তু বাজারে এর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মিউচুয়াল ফান্ডের এভাবে পতন অনাকাক্সিক্ষত। কারণ তারা কোম্পানির মৌল ভিত্তি বিবেচনা করে বিনিয়োগ করে।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, মিউচুয়াল ফান্ডের লোকসান অনাকাঙ্ক্ষিত। কারণ তাদের রিসার্চ টিম আছে। তারা দুর্বল কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে না। তবে রাজনৈতিক কারণে কোম্পানির শেয়ারে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে।

জানা গেছে- সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা পুঁজিবাজারে সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং উত্তরণের উপায় নিয়ে সরকারকে একটি গোপন প্রতিবেদন দেয়।

ওই প্রতিবেদনে ২০১১ সালে শেয়ারবাজারে ধসের পর গঠিত সব মিউচুয়াল ফান্ডের সময় আরও এক মেয়াদ অর্থাৎ ১০ বছর বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার জন্য শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রকসংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) চিঠি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

এ পর্যায়ে বিএসইসির চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীকে জানানো হয়, মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ ১০ বছর নির্ধারণ করে ২০১০ সালে একটি প্রজ্ঞাপন দেয়া হয়েছিল।

এরপর ১০টি মিউচুয়াল ফান্ড মেয়াদি থেকে বেমেয়াদি রূপান্তর হয়। এসব ফান্ডের আকার ছিল ৪৬৪ কোটি টাকা। এছাড়াও ৪টি মিউচুয়াল ফান্ড অবলুপ্ত হয়, যার আকার ছিল ৪১৯ কোটি টাকা। ফলে মেয়াদ বাড়ালে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে এক্ষেত্রে বিএসইসির মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। তহবিলগুলোর মেয়াদ ১০ বছর বাড়ানোর ব্যাপারে বিএসইসিকে তাগিদ দিয়েছে অর্থমন্ত্রণালয়। গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, বিপুল অংকের মিউচুয়াল ফান্ড বিলুপ্ত হলে বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এছাড়াও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ওই ফান্ডের ন্যায্যমূল্য পাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। অপরদিকে মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ বাড়ালে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সামগ্রিক অবস্থা : বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডের সংখ্যা ৩৭টি। এসব ফান্ডের পরিশোধিত মূলধন ৫ হাজার ৩০২ কোটি টাকা এবং বাজারমূলধন ২ হাজার কোটি টাকা।

কিন্তু ৩২টি মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদ মূল্য অভিহিত মূল্যের চেয়ে কম। ফলে এসব ফান্ডের বাজারমূল্যও অভিহিত মূল্যের চেয়ে কম। এসব ফান্ডে বিনিয়োগকারীদের কয়েকশ’ কোটি টাকা আটকে আছে।

মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ : উন্নত বেশি অনভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে বাজারে বিনিয়োগ করে। এসব ফান্ডগুলো বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে।

আর বাজার থেকে অর্জিত মুনাফা, বছর শেষে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ হিসেবে দেয়। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারী ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা হুজুগে বিনিয়োগ করে। ফলে তাদের লোকসানের আশঙ্কা বেশি। আর মিউচুয়াল ফান্ডের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে দক্ষ জনশক্তি।

বিভিন্ন কোম্পানির আর্থিক দিক তাদের জানা থাকে। ফলে তাদের লোকসানের আশঙ্কা কম। কিন্তু বতর্মানে ৩২টি ফান্ডের নেট অ্যাসেট ভ্যালু নেতিবাচক। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা যে টাকা দিয়ে ইউনিট কিনেছেন, বিপরীতে ওই পরিমাণ সম্পদ নেই।

মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা অনুযায়ী, মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ কেবল স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ, প্রাথমিক সিকিউরিটিজ এবং অর্থবাজারে হস্তান্তরযোগ্য সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা যাবে। এর মধ্যে তহবিলের ৭৫ শতাংশ অর্থ অবশ্যই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে হবে। এর মধ্যে অর্ধেকই বিনিয়োগ করতে হবে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে।

পেছনের কথা : ২০০৮ সালে আইন সংশোধন করে মিউচুয়াল ফান্ডের বোনাস এবং রাইট শেয়ার ইস্যু নিষিদ্ধ করে বিএসইসি। এ সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ৩ জন বিনিয়োগকারী হাইকোর্টে রিট করেন।

প্রায় দেড় বছর পর এসইসির আদেশের বিরুদ্ধে রায় দেয় হাইকোর্ট। অর্থাৎ মিউচুয়াল ফান্ড বোনাস ঘোষণার সুযোগ পায়। বর্তমানে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোকে ওই বছরের লাভের কমপক্ষে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ নগদ বা বোনাস শেয়ার লভ্যাংশ দেয়ার নিয়ম রয়েছে।