ভুলিনি, ভুলব না

  স্বপ্না রেজা ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধ

৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। বিকেলবেলা আচমকা আকাশে বিকট শব্দ করে উড়ে গেল ফাইটার প্লেন। খুব ছোট আমি। নিজের বোধ তখনও জাগেনি।

তবে কিছু ঘটনা সেই কচি চোখে লেগে গিয়েছিল, যা এখনও মুছে যায়নি। যাবেও না। খেলা করছিলাম মাঠে তৈরি করে রাখা বাংকারে।

প্রায় অন্ধকার মাটির নিচের এ ঘরটা যে জীবন বাঁচাতে তৈরি করা হয়েছে, সেই সময়ে এ বোধ ছিল না। খেলা যায়, এটুকুই হয়তো বুঝেছিলাম।

সঙ্গে ভাইবোন ও খেলার সাথীরাও ছিল। প্লেন বিকট শব্দ করে চলে যাওয়ার পরপরই কেমন একটা থমথমে পরিস্থিতি সৃষ্টি হল।

হঠাৎ একদল লোক চিৎকার করে ছুটে আসছে- গির গিয়া! গির গিয়া!

ছোট কাকা নান্নু হ্যাচকা টানে টেনে নিয়ে ঘরে তুললেন। যেন কিছুক্ষণ থাকলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমাদের বাসা তখন মতিঝিল পীরজঙ্গীশাহ্ মাজারের পাশেই রেলওয়ে কলোনিতে। মায়ের চাকরির সুবাদেই পাওয়া বাসা।

যারা বাইরে ছিল, নিমিষে তারা ঘরে প্রবেশ করল। ঘরভর্তি পরিবারের সদস্য। খালা, মামা, ফুপু, চাচা, কাজিনসহ অনেকেই। কিছুক্ষণের মধ্যে দরজায় আঘাতের শব্দ। কাঠের দরজায় একটা লোহার পাত আড়াআড়ি করে দেয়া থাকত নিরাপত্তার জন্য।

সেই লোহার পাত ছিটকে পড়ল দশ হাত দূরে। দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ল রাজাকার-আলবদররা। মানুষ হত্যার উন্মাদনা ওদের। কারও মুখে লাল মাফলার। হাতে রড, বন্দুক, বাঁশ। ঢুকেই ওরা আব্বাকে টেনেহিঁচড়ে বের করতে চাইল।

আমার নানি আব্বাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আব্বার পরনে শুধু লুঙ্গি। ওদের কেউ কেউ আব্বার সুঠাম শরীরে আঘাত করতে শুরু করেছে।

পরিষ্কার হয়ে গেছে, ওরা আব্বাকেই মানে সাংবাদিক আসফউদ দৌলা রেজাকেই ধরে নিতে এসেছে। তিনি তখন দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক।

নানি ছাড়ছেন না তার রেজাকে। আর আমার ছোট্ট দুটি হাত ওদের একজনের পা ধরে ফেলেছে। ছোট্ট মনটা কাঁদছে চিৎকার করে, আমার আব্বাকে তোমরা মেরো না! নিয়ে যেও না!

ধরে থাকা পায়ের প্রচণ্ড লাথিতে ছিটকে পড়লাম খানিক দূরে। তারপর আর কিছুই মনে নেই। পরিবারের সদস্যদের মুখ শুনেছিলাম, আমাদের মা রাজাকার-আলবদরদের মুখোমুখি হয়েছিলেন।

অনর্গল উর্দুতে কথা বলতে পারদর্শী মা আব্বাকে নিয়ে যাওয়ার কৈফিয়ত চাইছিলেন। মায়ের তীব্র অগ্নি প্রতিবাদে ওদের সঙ্গে আসা এক পাঞ্জাবি এগিয়ে এসে রাজাকার-আলবদরদের নিয়ে বের হয়ে যান। দু’জন রাজকার ছিল মায়ের পরিচিত।

আমি যার পা ধরেছিলাম আকুতি নিয়ে, তার নাম ছিল মুন্নাফ। ওরা চলে যেতে খানিক পর আসে স্থানীয় রাজাকার আশফাক। এসে আব্বাকে আশ্বস্ত করে ভয়ের কিছু নেই বলে। কিন্তু মা নাছোড়বান্দা।

কোনোভাবেই তিনি আব্বাকে নিয়ে এখানে আর থাকবেন না। সিদ্ধান্ত হল রাতেই এ বাসা ছেড়ে যাওয়া হবে। কিন্তু কোথায় যাওয়া হবে, কেউ জানতে পারল না। মা জায়গার নাম মুখে উচ্চারণ করলেন না একটিবারও।

পাশের বাসায় থাকতেন সুলতানা খালাম্মা। খালু রেলওয়ের অন্য ডিপার্টমেন্টে চাকরি করতেন। ভীষণ ভালোবাসতেন আমাদের।

তারাও সাথী হলেন আমাদের। রাতের অন্ধকারে জিপে করে দুটো পরিবার রওনা হল। কাকরাইলের একটি ফ্ল্যাটে ঠাঁই হল। এখানে নাকি মুক্তিযোদ্ধারা ভিন্ন বেশে পাহারা দেন। ভারতীয় হাইকমিশনের একটি অ্যাপার্টমেন্ট।

আব্বার প্রাণের বন্ধু ও সহকর্মী সিরাজ কাকা (শহীদ সাংবাদিক সিরাজ উদ্দীন হোসেন) ও কাকী ৮ ডিসেম্বর কাকরাইলের বাসায় ছুটে এলেন আব্বাকে দেখতে। খুব সাবধানে থাকতে বললেন।

আব্বাও কাকাকে সাবধানে থাকতে বললেন। কিন্তু সিরাজ কাকাকে ধরে নিয়ে গেল আলবদর-রাজাকাররা ১০ ডিসেম্বর।

আব্বা ছিলেন পাগলপ্রায় বন্ধুর এই দুঃসংবাদে। মা আব্বাকে বাইরে বেরুতে দেন না। নিজে বাইরের সব কাজ করেন।

বিজয় এলো ১৬ ডিসেম্বর। ফিরলাম আগের বাসা রেল কলোনিতে। মুসলিম মামা, বাহার মামা, কাশেম মামা সবাই তখন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা।

রক্তের কেউ নন তারা, আমাদের আত্মার মামা। ধরে আনলেন সেই রাজাকারদের কাউকে কাউকে, যারা আমার আব্বাকে ধরে নিতে এসেছিল, আঘাত করেছিল।

সেই মুন্নাকেও ধরে আনলেন, যে আমার ছোট্ট দেহটাকে লাথি দিয়ে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। অনেককিছুই মনে না থাকলেও স্পষ্ট মনে আছে আমার সেদিনের কথা।

রাজাকার-আলবদরদের পক্ষে যারা কথা বলেন, কাজ করেন, তারা এ স্বাধীন দেশের সব সুবিধা ভোগ করে কীভাবে তা করেন, তা তারাই ভালো জানেন। তবে আমি তাদেরকে সরাসরি নেমকহারাম বলি।

স্বপ্না রেজা : কথাসাহিত্যিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×