স্মরণ

শিক্ষাক্রমের গুরু

  ড. আবদুস সাত্তার মোল্লা ১৫ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষাক্রমের গুরু

শিক্ষাব্যবস্থায় ‘শিক্ষাক্রম’ একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ। শিক্ষার উদ্দেশ্য, সে উদ্দেশ্য অর্জনোপযোগী বিষয়বস্তু, শিখন-শেখানো প্রক্রিয়া এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির সমন্বয়ে সার্বিক শিক্ষা-পরিকল্পনার নাম শিক্ষাক্রম।

দেশে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের জাতীয় শিক্ষাক্রমের তিনটি আবর্তন সম্পন্ন হয়েছে। সব কটি আবর্তনের শিক্ষাক্রম তৈরি ও পরিমার্জনের নেতৃত্ব দিয়ে এ দেশের শিক্ষাক্রমের গুরু হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন প্রয়াত শিক্ষাবিদ মুহাম্মদ আবদুল জব্বার। বাংলাদেশ শিক্ষাক্রমের এই পথিকৃৎ ১৯৩১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০১৬ সালের ১৫ জানুয়ারি তিনি ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ তার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী।

এমএ জব্বার ময়মনসিংহ শহরে প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন শাস্ত্রে বিএসসি অনার্স এবং এমএসসি (১৯৫৩) করেন। কিন্তু শিক্ষাবিজ্ঞানের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ তাকে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিটি (ব্যাচেলর অব টিচিং) ট্রেনিং কোর্স করতে বাধ্য করে। শিক্ষাবিজ্ঞানের ভিত আরও মজবুত করার জন্যে ১৯৬০ সালে এমএ জব্বার চলে যান যুক্তরাষ্ট্রের নর্দার্ন কলরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ে; সেখান থেকে ১৯৬১ সালে তিনি শিক্ষায় এমএ ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। যশোর এমএম কলেজের প্রভাষক পদে ১৯৫৪ সালে কর্মজীবন শুরু করলেও শিক্ষানুরাগী এমএ জব্বারের পছন্দের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের Institute of Education and Research (IER)-এ প্রভাষক হিসেবে। ১৯৬৩ সালে তিনি সরকারের শিক্ষা পরামর্শক পদে নিযুক্ত হন। ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা পরামর্শক পদে নিয়োগ পান।

স্বাধীন দেশের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন কমিটির (১৯৭৬) সদস্য সচিব হিসেবে অধ্যাপক জব্বার সাত খণ্ডে প্রকাশিত দেশের প্রথম আবর্তনের শিক্ষাক্রম দলিল প্রস্তুতির মূল দায়িত্ব পালন করেন। দেশের শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা ও পরিমার্জনের জন্যে ১৯৮১ সালে National Curriculum Development Centre (NCDC) প্রতিষ্ঠিত হলে অধ্যাপক জব্বার এর পরিচালক নিযুক্ত হন। ১৯৮৪ সালে NCDC টেক্সটবুক বোর্ডের সঙ্গে একীভূত হয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (জাশিপাবো) রূপ লাভ করে। জাশিপাবোতে অধ্যাপক জব্বার প্রথম সদস্য (শিক্ষাক্রম) নিযুক্ত হয়ে ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত এ গুরুদায়িত্ব পালন করেন। জাশিপাবোর সদস্য (শিক্ষাক্রম) হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অধ্যাপক জব্বার ১৯৮৭ সালে নায়েমের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) নিযুক্ত হন। এ পদেই অধ্যাপক জব্বারের সরকারি কর্মজীবন শেষ হয় ১৯৮৮ সালে।

সরকারি কর্মজীবন শেষে অধ্যাপক জব্বার একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাক্রম-নির্মাতায় পরিণত হন। বাংলাদেশ শিক্ষাক্রম পরিমার্জনের দ্বিতীয় আবর্তন (১৯৮৬-১৯৯৬) চলার সময় তিনি শিক্ষাক্রম রিপোর্ট প্রণয়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে শিক্ষাক্রম পরিমার্জনে নেতৃত্ব দিয়ে তিন খণ্ডের (নিুমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক) বিশাল শিক্ষাক্রম রিপোর্ট প্রণয়ন করেন। ‘জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০’ প্রণীত হলে এর আলোকে ২০১১-১২ সালে দেশের শিক্ষাক্রম তৃতীয়বার পরিমার্জিত হয়। শিক্ষাক্রম পরিমার্জনের এই ধাপেও অধ্যাপক জব্বার শিক্ষাক্রমের কারিগরি (বিষয়ভিত্তিক) কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন।

অধ্যাপক জব্বারের পরিণত বয়সের কর্মজীবন কেটেছে জাশিপাবো ও নায়েমে। বাংলাদেশ শিক্ষাক্রমের প্রয়াত এই গুরুকে সম্মান জানিয়ে জাশিপাবো বা নায়েমের অন্তত একটির গ্রন্থাগার তার নামে উৎসর্গ করার জন্য আমি গত দু’বছর ধরে লেখার মাধ্যমে অনুরোধ করে আসছিলাম। গত ডিসেম্বরে জাশিপাবো কর্তৃপক্ষ এর গ্রন্থাগারসংলগ্ন অংশকে একটি মিলনায়তনে রূপদান করে এটির নাম রেখেছে ‘মুহাম্মদ আবদুল জব্বার মিলনায়তন’। দেরিতে হলেও জাশিপাবো দেশের শিক্ষাক্রমের এই পথিকৃৎকে সম্মান জানিয়ে জাতীয় কর্তব্য পালন করল। জাশিপাবোর চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা গত ২০ ডিসেম্বর এ মিলনায়তন উদ্বোধন করেন।

ড. আবদুস সাত্তার মোল্লা : শিক্ষাক্রম গবেষক এবং বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার সদস্য

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×