শ্রদ্ধাঞ্জলি

বয়সে প্রবীণ, প্রাণে তরুণ সাথীটিও চলে গেলেন

  কাজী ফারুক আহমেদ ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

শিক্ষক আন্দোলনে দীর্ঘদিনের সাথীদের একের পর এক জীবনাবসানের ধারায় সর্বশেষ নামটি যুক্ত হল আজিজ ভাইয়ের। রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলেন না তিনি।

চোখের পর্দায় তার চেহারা ভেসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অনুভব করি একরাশ বেদনা, ভাষায় ব্যক্ত করা যা দুঃসাধ্য। রবীন্দ্রনাথের ‘মানসী’ কাব্যের ‘প্রকাশ বেদনা’ কবিতা থেকে ধার করে বলতে হয়- ‘হৃদয়বেদনা হৃদয়েই থাকে, ভাষা থেকে যায় বাহিরে। শুধু কথার উপরে কথা, নিষ্ফল ব্যাকুলতা।’

আজিজুল ইসলামের সর্বশেষ কর্মস্থল ছিল ঢাকা মহানগরীর কমিউনিটি সেন্টার আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, যা এখন তেজগাঁও আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজ। শিক্ষকতার শুরু ১৯৬০ সালে, বর্তমান রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলায় রতনদীয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে। প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ১৯৬৮ সালে ওই এলাকার বিকয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা মহানগরীর কমিউনিটি সেন্টার আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। প্রতিষ্ঠানটির তখন নিজস্ব জায়গা-জমি বলতে কিছু ছিল না। কঠোর পরিশ্রম করে শিক্ষক-কর্মচারী সবাইকে নিয়ে গড়ে তোলেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর স্কুলের নামে এক বিঘা জমি রেজিস্ট্রি হয় তার হাত দিয়ে। তিনি স্কুলটিতে বিজ্ঞান শাখা চালু করেন। শিক্ষকতা জীবনে কখনও প্রাইভেট টিউশনি করেননি। তার স্পষ্ট কথা ছিল- ক্লাসে ঠিকমতো পড়াতে হবে। ঘোরতর বিপক্ষে ছিলেন কোচিংয়ের। পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে তার উদ্যোগ ছিল উল্লেখযোগ্য। মার্ক পদ্ধতি থেকে গ্রেডিং ব্যবস্থায় রূপান্তরে বিশেষ ভূমিকা ছিল তার। শিক্ষকরা মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস পড়াবেন না- সমিতি থেকে এ সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা দেন। শিক্ষক আন্দোলনে তার অবস্থান ছিল নীতিনিষ্ঠ। শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও দক্ষতা উন্নয়নের পক্ষে ছিলেন আমৃত্যু। মৃত্যুর দু’দিন আগেও হাসপাতালে বসে আমার কাছে জানতে চান, নতুন শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কী কথা হয়েছে আমার। শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা কীভাবে বাড়ানো যেতে পারে।

দেশ-বিদেশে নানা পেশায় সুপ্রতিষ্ঠিত তার ছাত্রছাত্রীরা তাকে কীভাবে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও সম্মানের চোখে দেখে, অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচনা করে, তা তার সঙ্গে থেকে দেখেছি, অনুভব করেছি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নিজ এলাকায়, পাংশায় পাকহানাদার বাহিনীর দোসরদের বিরুদ্ধে নাদের খানের সঙ্গে মিলে প্রতিরোধ রচনায় তার ভূমিকার কথা জেনেছি তার পরিবারের কাছ থেকে।

ছিমছাম গোছালো কিন্তু সাদাসিধে ছিলেন মানুষটি। আমি তাকে উপহাসছলে ‘তরুণ’ বলে ডাকতাম। ভাবী তা জানতেন। আমার সম্বোধনে হাসতেন। তার সাহচর্য থেকে বঞ্চনার ব্যথা কোথায় রাখি, কীভাবে রাখি! সময় অনেক কিছু ভুলিয়ে দেয় সত্য। তারপরও মনে হয় আজিজ ভাই আমৃত্যু আমার স্মৃতিতেই থাকবেন। বিস্মৃতিতে নয়। মনে তরুণ এমন সাথী, বন্ধুকে কীভাবে ভোলা যায়?

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : শিক্ষক আন্দোলনে প্রয়াত মোহাম্মদ আজিজুল ইসলামের অন্যতম সহযোদ্ধা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×