স্মরণ

আলোকিত মানুষের প্রতিরূপ

  এএম জিয়া হাবীব আহসান ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আলোকিত,

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকে ভালোবাসতেন আলহাজ বদিউল আলম। মুক্তিযুদ্ধের বিশিষ্ট সংগঠক, লেখক, আইনজীবী, সাদালাপী বদিউল আলমের মৃত্যুবার্ষিকী আজ ১০ ফেব্রুয়ারি। তিনি ২০০৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন।

মৃত্যুর আগের দিনও তিনি তার সাম্প্রতিক চীন সফর ও নেভাল একাডেমির একটি অনুষ্ঠান নিয়ে কিছু কথা, অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন। প্রায়ই তিনি আমাকে আদালত ভবনের চেম্বারে ডেকে তার ভাবনাগুলো শোনাতেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও ধৈর্য ধরে সেসব কথা শুনতাম। কারণ তার কথাগুলো ছিল খুবই মূল্যবান, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, দিকনির্দেশনাপূর্ণ ও পরিপক্ব।

মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান অনস্বীকার্য। তার জামালখানার ঠিকানা ছিল মুক্তিসংগ্রামীদের যোগাযোগের গোপন স্থান। তিনি চট্টগ্রামের বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পলে (আইন কলেজ) বছরাধিক অবৈতনিক শিক্ষকতার দায়িত্বও পালন করেছেন। তার সমাজসেবামূলক কাজের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে- ১৯৫৬ থেকে ’৬২ সাল পর্যন্ত পটিয়া কলেজ সাংগঠনিক কমিটির সদস্য, ১৯৭৪ থেকে ’৮২ সাল পর্যন্ত অপর্ণাচরণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সদস্য, চট্টগ্রাম শোলকবহর মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির সম্পাদক, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি, ১৯৪৩-৪৪ সালে জোয়ারা ইউনিয়ন রিলিফ কমিটির সম্পাদক, ১৯৫৯ থেকে ’৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন।

বদিউল আলম তার অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধ সহজ-সরলভাবে লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তিনি মানুষের অধিকার রক্ষা, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ এবং রাজনৈতিক দিকনির্দেশনামূলক অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ’, ‘রাজনীতির সেকাল-একাল : প্রসঙ্গ বাংলাদেশের রাজনীতি’, ‘যা কিছু মনে আছে’, ‘আইন ও সমকালীন প্রসঙ্গ’, ‘বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ’, ‘যৌতুক একটি সামজিক অভিশাপ’, ‘রক্তের আখরে বালাকোঠ’, ‘দেশ হতে দেশান্তরে’, ‘উপমহাদেশের বিভক্তি ও আজকের বাংলাদেশ’ ইত্যাদি।

বিভিন্ন জাতীয়, স্থানীয় দৈনিক ও ম্যাগাজিনে তার বিপুলসংখ্যক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে তিনি লেখনীর মাধ্যমে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

একজন অভিজ্ঞ পেশাজীবী ও সমাজদরদি চিন্তাবিদ হিসেবে তার মধ্যে ত্রিমুখী দায়িত্ববোধের সমাবেশ ঘটেছিল। দীর্ঘদিন আইন ব্যবসায় নিয়োজিত থেকে এর জনস্বার্থবিরোধী দিকগুলো চিহ্নিত করে আইনের সংস্কারের দাবি জানিয়ে এসেছেন লেখনীর মাধ্যমে। তিনি আজীবন যৌতুক প্রথা, নারী নির্যাতন, বেকারত্ব, ভিক্ষাবৃত্তি, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার, যুবসমাজের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রকোপ, নগরবাসীর গ্রামবিমুখতা, সামাজিক অনুষ্ঠানে অপচয় ইত্যাদির বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদী ছিলেন এবং এসবের সমাধানে ইসলামী শিক্ষা ও ঐতিহ্য গ্রহণে জাতির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন সফল ফৌজদারি বিশেষজ্ঞ আইনজীবী। তার জেরার কৌশল ছিল অতুলনীয়। বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর মামলায় তার জেরার কৌশলগুলো পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করা গেলে দেশের আইনের জগৎটি সমৃদ্ধ হবে। তিনি জুনিয়রদের স্নেহ করতেন, সিনিয়রদের ও বিচারকদের সম্মান করতেন। বিভক্তি নয়, জাতীয় ইস্যুতে ঐকমত্য তার অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল। স্বাধীন, স্বনির্ভর শোষণমুক্ত বাংলাদেশ ছিল তার স্বপ্ন। অসহিষ্ণু রাজনীতির তিনি ঘোরবিরোধী ছিলেন। তিনি রেখে গেছেন অগণিত ভক্ত, অনুরাগী ও তার লেখনী। এসবের মাঝেই তিনি বেঁচে থাকবেন অনাদিকাল পর্যন্ত। সার্বিক বিবেচনায় তিনি ছিলেন একজন সফল মানুষের প্রতিরূপ।

এএম জিয়া হাবীব আহসান : আইনজীবী

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×